বিজ্ঞাপন

এরপর রোজিনা ইসলামের লেখা আরও দুটি প্রতিবেদন পড়েছিলাম ২০ ও ৩০ এপ্রিল। আগের লেখাটির মতো এই দুটি প্রতিবেদনেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভেতরের অনিয়ম ও সমন্বয়হীনতার চিত্র ফুটে উঠেছে। তাঁর সংবাদের সূত্র স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভেতরের কর্মকর্তারা, যাঁরা তাঁকে তথ্য ও নথিপত্র দিয়ে সাহায্য করেছেন। রোজিনা ইসলাম এবং তাঁর সংবাদের সূত্র কর্মকর্তারা জনস্বার্থ সুরক্ষার লক্ষ্যেই কাজ করেছেন, নিজের বা গুটিকতক লোকের লাভের জন্য নয়। আমি আশান্বিত হলাম এই ভেবে যে বহু কষ্ট করে রোজিনা ইসলাম যেসব সমস্যার ওপর আলোকপাত করেছেন, সেগুলোর সমাধান হবে শিগগিরই।

এর দুই সপ্তাহ পরে ১৭ মে রাতে টেলিভিশনের সংবাদে দেখলাম, যে সাংবাদিককে আমি তাঁর দক্ষতা ও সাহসিকতার জন্য মনে মনে পুলিৎজার পুরস্কার দিতে চেয়েছিলাম, তিনিই পাঁচ–ছয় ঘণ্টা ধরে লাঞ্ছিত হয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে, তারপর তিনি সারা রাত কাটিয়েছেন শাহবাগ থানায়, তাঁর বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। পরদিন তাঁকে নেওয়া হলো আদালতে, এরপর পাঠানো হলো কারাগারে এবং এর পরের দিন শুনানির পরও তাঁকে জামিন দেওয়া হলো না। তাঁর বিরুদ্ধে ডিবির তদন্ত শুরু হলো। আমি স্তম্ভিত হয়ে পড়লাম। বুঝতে পারছিলাম না, দেশে আসলে এসব কী হচ্ছে। যে সাংবাদিক বহু কষ্ট করে দুর্নীতির খবর প্রকাশ করেছেন, তিনি কেন রাষ্ট্র কর্তৃক পুরস্কৃত না হয়ে জামিন না পেয়ে কারাবাস করছেন?

রোজিনা ইসলামের সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। তাঁর সম্পর্কে গবেষণা করে দেখলাম, তিনি এর আগেও এ ধরনের বেশ কয়েকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছেন, যেগুলোর মাধ্যমে তিনি কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির ঘটনা উন্মোচন করেছেন। প্রতিটি প্রতিবেদনেই তিনি পরিচয় দিয়েছেন পেশাদারি দক্ষতার। পেয়েছেন বেশ কয়েকটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার।

রোজিনা ইসলামের যেসব প্রতিবেদন আমি পড়েছি, তাতে দেখেছি, তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ভেতর থেকেই খবর সংগ্রহ করেছেন। খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে বিশেষ করে নারী সাংবাদিক হিসেবে তাঁকে কত প্রতিকূলতা পার হতে হয়েছে, সেগুলোর বিবরণ আছে ১৪ নভেম্বর ২০১৪ সালের একটি লেখায়, যার নাম ‘অনুসন্ধান: খুঁড়তে খুঁড়তে গরম খবর’। তিনি কেমন করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দুটি চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন, লেখাটিতে সেই বিবরণ আছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের কাজ কত কঠিন এবং এসব প্রতিবেদন সংবাদপত্রের সম্পাদকেরা কত খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করে তারপর প্রকাশ করেন, তাঁর স্বচ্ছ বিবরণ আছে এই লেখায়। আমাদের দেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকের সংখ্যা সীমিত। আরও বেশি সীমিত সে ধরনের সংবাদপত্র, যারা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নিয়মিতভাবে বহু বছর ধরে প্রকাশ করে আসছে। প্রথম আলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এই সংবাদপত্র বহু বছর ধরে উচ্চমানের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করছে। সংগত কারণেই এটি হতে পেরেছে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংবাদপত্র।

রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে সরকারি নথিপত্র ‘চুরির’ অপরাধে। যেকোনো সাংবাদিক বা গবেষকই জানেন, তাঁদের প্রধান কাজ তথ্য সংগ্রহ করা। মনে পড়ে, ১৯৬৮ সালে আমি যখন পিএইচডি ডিগ্রির থিসিসের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের কাজে ঢাকায় এসেছিলাম, তখন অনেক সরকারি কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। কিছু সাহসী কর্মকর্তা আমাকে তদানীন্তন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভেতরকার বৈষম্যের তথ্যসংবলিত অনেক সরকারি ‘গোপনীয়’ সিলমারা নথিপত্র দিয়েছিলেন। সে তথ্যের ভিত্তিতে আমি আমার থিসিস রচনা করতে পেরেছিলাম। দেখাতে পেরেছিলাম পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভেতরের বৈষম্যের চিত্র। কখনো মনে হয়নি গোপনীয় তথ্য চুরি করছি। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অনেক সরকারি নথিপত্রের ওপর বিভিন্ন সময় ‘গোপনীয়’ সিল মারা হয় নথিটির গুরুত্ব বোঝানোর জন্য, কিন্তু তার ভেতর যে তথ্য থাকে, তা সাংবাদিক বা গবেষকদের দিলে তাতে দেশের স্বার্থের কোনো ক্ষতি হয় না। কোন তথ্য সাংবাদিক বা গবেষককে দেওয়া যায়, তা নিয়ে সরকারি কর্মকর্তারাও অনেক সময় একমত হতে পারেন না।

১৯৭০–এর দশকে যখন নির্বাচন নিয়ে গবেষণা করছিলাম, তখন এক সরকারি কর্মকর্তা বলেছিলেন যে আমার বিরুদ্ধে পুলিশের এক লম্বা অভিযোগের নথি তাঁর কাছে এসেছিল। এর কোনো মূল্য নেই বলে তিনি সেটা বিবেচনায় নেননি। আমাকে তিনি জানানোর প্রয়োজনও বোধ করেননি। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে তথ্য চেয়েও আমার মিশ্র অভিজ্ঞতা হয়েছে। একই ধরনের তথ্য এক কমিশনার আমাকে দিয়েছেন, কিন্তু পরবর্তী কমিশনার আমাকে দেননি। এতে আমার গবেষণা ব্যাহত হয়েছে। পরে দেখেছি, অন্য গবেষক অন্য সূত্র থেকে সেই তথ্য পেয়েছেন। অতএব সরকারি কর্মকর্তারা অনেক সময় নিজ বিবেচনায় ঠিক করেন, কোন তথ্য প্রকাশ করলে জনস্বার্থ বা দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে।

আজ (২৩ মে) রোজিনা ইসলামের জামিনের খবর পেয়ে কিছুটা স্বস্তি পেলাম। আশা করব, তাঁর বিরুদ্ধে যে মামলা করা হয়েছে, তা দ্রুত প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে, যাতে মামলার খড়্গ অনিশ্চিতকালের জন্য তাঁর মাথার ওপর ঝুলিয়ে রাখা না হয়, এখনো অনেক সম্পাদক বা সাংবাদিকের মাথার ওপরে যেমন আছে।

আদালত মন্তব্য করেছেন, ‘অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল আচরণ করার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে সংবাদপত্র।’ এই মন্তব্যকে আমি একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছি। অবশ্যই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে রোজিনা ইসলামকে পাঁচ–ছয় ঘণ্টা আটকে রাখা এবং পরবর্তীকালে তাঁর কারাবাস একটি ভিন্ন বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। তাঁকে সহায়কের ভূমিকায় দেখা হয়নি। যে সাংবাদিক সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কয়েকটি দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনা উন্মোচন করেছেন, তাঁকে যদি সেই মন্ত্রণালয়ে তথ্য চুরির অপরাধে আটকে রাখা হয়, তখন জনসাধারণ স্বাভাবিকভাবেই মনে করতে পারে যে তিনি নিশ্চয়ই ১৭ মে আরও কিছু অনিয়মের তথ্য সংগ্রহ করছিলেন।

যে সাংবাদিক বহু বছর ধরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর প্রকাশ করছেন, তাঁকে পেশাদারি কর্তব্য পালনের সময় আটকে রাখা, কারাগারে পাঠানো সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বার্তার বিপক্ষে একটি অবস্থান।

সরকারের সব কর্মকর্তাকে বুঝতে হবে যে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়ন করতে হলে তাঁদের প্রয়োজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক। শুধু সরকারি চ্যানেলের মাধ্যমে তাঁরা দুর্নীতি ও অনিয়মের সংবাদ পাবেন না; কারণ, এসব তথ্য গোপন করাটাই সরকারি কর্মকর্তাদের বহুদিনের ধারা। তথ্যপ্রবাহ যতটা স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত করা যায়, ততটাই সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য মঙ্গল এবং দুর্নীতি দমনে সহায়ক।

আমার প্রত্যাশা, সরকার এবং সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ আলোচনার মাধ্যমে অচিরেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকের সুরক্ষা আইন করা এবং নাগরিকের বাক স্বাধীনতার পরিপন্থী বলে বিবেচিত বর্তমানে প্রচলিত বিভিন্ন আইন বা আইনের ধারা বিলোপ করার ব্যাপারে একটা ঐকমত্যে আসতে সক্ষম হবে এবং সরকার সে ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।

কোভিড–১৯ আমাদের সবার মনে একটি অনিশ্চয়তার ছায়া এনে দিয়েছে। এই সময়ে সব নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো সুনিশ্চিত করতে সরকার আরও উদ্যোগী হবে, এটাও আমাদের প্রত্যাশা।

রওনক জাহান: রাষ্ট্রবিজ্ঞানী; সম্মানীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন