>
default-image
চীনের রোগ প্রতিরোধবিষয়ক সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ চায়নিজ সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) মহাপরিচালক জর্জ গাও সম্প্রতি সায়েন্স ম্যাগাজিনকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় চীনের যেসব বিজ্ঞানী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, জর্জ গাও তাঁদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সায়েন্স ম্যাগাজিন–এর পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জন কোহেন

প্রশ্ন: চীন যেভাবে কোভিড-১৯ মোকাবিলা করছে, তা থেকে অন্য দেশগুলোর শেখার কী আছে বলে মনে করেন?

উত্তর: যেকোনো সংক্রামক ব্যাধি থেকে বাঁচার প্রধান উপায় হলো সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, বিশেষ করে যাঁদের শ্বসনযন্ত্রে আগে থেকেই সংক্রমণ আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এটি অনস্বীকার্য। প্রথম কথা হলো যেহেতু আমাদের হাতে এই ভাইরাস দমনের কোনো ওষুধ বা টিকা নেই, সেহেতু আমাদের ‘নন–ফার্মাসিউটিক্যাল’ কৌশল বেছে নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, আপনাকে যে করেই হোক অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হবে। তৃতীয়ত, একজনের সঙ্গে আরেকজনের সংস্পর্শ এড়াতেই হবে। এটি নিশ্চিত করতে আমাদের ভীষণ বেগ পেতে হয়েছে। চতুর্থত, সব ধরনের জনসমাগম বন্ধ করে দিতে হবে। পঞ্চমত, অবস্থা বুঝে সম্পূর্ণ লকডাউনে চলে যেতে হবে। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট এলাকা ঘেরাও করে সিল্ড করে দিতে হবে।

প্রশ্ন: চীনের উহানে লকডাউন শুরু হয়েছিল ২৩ জানুয়ারি এবং হুবেই প্রদেশের অন্য এলাকাতেও এই লকডাউন সম্প্রসারিত করা হয়েছে। চীনের অন্য প্রদেশগুলোতে অপেক্ষাকৃত কম মাত্রায় শাটডাউন করা হয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়া কীভাবে সমন্বয় করা হয়েছে এবং কীভাবে এত বড় এলাকার ওপর নজরদারি করা সম্ভব হয়েছে?

উত্তর: আপনাকে আগে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে হবে। এরপর আপনার স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে শক্তিশালী ও কড়া নেতৃত্ব দরকার। সমন্বয় এবং নজরদারির সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেককেই জনগণের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত হতে হবে। সুপারভাইজারদের ভালো করে জানা থাকতে হবে, কারা কারা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মধ্যে আছে, কাদের কাদের আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। প্রত্যেক কমিউনিটির সুপারভাইজারদের সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকতে হবে। সংক্রমণ ঠেকানোর এটিই মূল শর্ত।

প্রশ্ন: অন্য দেশগুলো কী কী ভুল করছে বলে আপনার মনে হচ্ছে?

উত্তর: যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের মানুষ সবচেয়ে বড় ভুল করছে বলে আমি মনে করছি। সেখানে তাঁরা সবাই মাস্ক পরছেন না। এই ভাইরাস মূলত ছড়ায় ঘনিষ্ঠ হওয়া ও ড্রপলেটের মাধ্যমে। ড্রপলেট সংক্রমণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। আপনি যখন কথা বলেন, তখন সার্বক্ষণিকভাবে আপনার মুখ থেকে ড্রপলেট ছড়াতে থাকে। ফলে মাস্ক আপনাকে পরতেই হবে। বহু লোকের শ্বাসকষ্টজনিত বা প্রিসিম্পটোম্যাটিক সংক্রমণ আছে। যদি তাঁরা মাস্ক পরেন তাহলে তাঁদের মুখ থেকে ভাইরাসযুক্ত ড্রপলেট নিঃসৃত হবে না, এতে তাঁর আশপাশের লোক বিপদের ঝুঁকি থেকে বাঁচতে পারবে। মাস্ক না পরা অমার্জনীয় ভুল।

প্রশ্ন: এই ভাইরাস সামাল দেওয়ার অন্য আর কী কী পন্থা আছে? চীন তো বিভিন্ন স্টোর, বিল্ডিং এবং গণপরিবহন স্টেশনের ফটকে কড়াকড়িভাবে থার্মোমিটার ব্যবহার করেছে।

উত্তর: হ্যাঁ, এখন আপনি চীনের যেখানেই যাবেন, সেখানে আপনাকে থার্মোমিটারের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। অস্বাভাবিক তাপমাত্রাওয়ালা লোকদের আলাদা করতেই হবে। জ্বর আছে এমন সব লোককেই আপনাকে বেছে বেছে আলাদা জায়গায় রাখতে হবে।

এই ভাইরাস সাধারণ পরিবেশে কতক্ষণ বেঁচে থাকে, সেটি একটি বড় বিষয়। মনে রাখা দরকার, এটি একটি ‘এনভেলপড ভাইরাস’। লোকে ভাবে, এটি খুবই ক্ষণায়ু এবং তাপমাত্রা বেশি আছে এমন জায়গায় এটি বেশিক্ষণ টেকে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন—দুই জায়গার গবেষণাতেই দেখা গেছে, ভূপৃষ্ঠে এটি যেকোনো পরিবেশে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে খুবই পারঙ্গম। নানা ধরনের পরিবেশ-প্রতিবেশে এটি নিজেকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম।

প্রশ্ন: চীনে এই ভাইরাসের উদ্ভব নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন উঠছে। চীনের গবেষকেরা বলেছেন, এর একেবারে শুরু হয়েছে ২০১৯ সালের ১ ডিসেম্বরেরও আগে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাস প্রথম সংক্রমিত করেছিল ২০১৯ সালের ১৭ নভেম্বর। ওই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মত কী?

উত্তর: নভেম্বরেই যে রোগটি সংক্রমিত হয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আমরা এর উৎপত্তির আদি উৎস জানার চেষ্টা করছি।

প্রশ্ন: উহানের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বড় সংক্রমণের সঙ্গে হিউনান সি-ফুড মার্কেটের যোগসাজশ আছে বলে মনে করেছিলেন এবং গত ১ জানুয়ারি মার্কেটটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাঁরা ধারণা করেছিলেন, ওই মার্কেটের একটি কসাইখানা থেকে একটি পশুর শরীর থেকে ভাইরাসটি মানুষের দেহে সংক্রমিত হয়েছে। কিন্তু আপনার তৈরি করা প্রতিবেদনে আপনি বলেছেন, শুরুর দিকে সংক্রমণের শিকার হওয়া পাঁচজন লোকের চারজনেরই ওই সি-ফুড মার্কেটের সঙ্গে কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। আপনি কি মনে করেন ওই সি ফুড মার্কেটটি ভাইরাসটির আঁতুড়ঘর কিংবা সেখান থেকেই এটি সবচেয়ে বেশি বেশি বিস্তার লাভ করেছে?

উত্তর: এটা খুবই ভালো প্রশ্ন। আপনি গোয়েন্দার মতো উৎস খুঁজছেন। একেবারে শুরুতে সবাই ভেবেছিল ওই মার্কেট থেকেই ভাইরাসটির উৎপত্তি। কিন্তু এখন আমি মনে করি, ওই মার্কেটটি ভাইরাসটির প্রাথমিক বসত ছিল কিংবা বলা যায়, এখান থেকেই এটি বিশদ মাত্রায় ছড়িয়েছে। সুতরাং এটি একটি বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশ্ন। এ ক্ষেত্রে দুটি ব্যাপারই ঘটে থাকতে পারে।

প্রশ্ন: ভাইরাসটি দ্রুত সংক্রমিত হওয়ার পরপরই সে খবর সবাইকে না জানানোর জন্য চীনের অনেক সমালোচনা করা হয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল–এ গত ৮ জানুয়ারি প্রথম নতুন এই করোনাভাইরাস নিয়ে একটি প্রতিবেদন বের হয়। চীন সরকারের বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে খবরটি প্রথম আসেনি। কেন আসেনি?

উত্তর: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল–এর প্রতিবেদনটি খুবই ভালো ছিল। চীনের পক্ষ থেকে এই অবস্থা সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে জানানো হয়েছিল এবং আমার মনে হয়, আমাদের পক্ষ থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে জানানো এবং ওয়াল স্ট্রিট–এর প্রতিবেদন প্রকাশের সময়ের ব্যবধান ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টা। আমার মনে হয়, এই সময়ের ব্যবধান এক দিনের বেশি হবে না।

প্রশ্ন: কিন্তু সরকারি উপাত্ত অনুযায়ী চীনের গবেষকেরা করোনা আক্রান্ত রোগী সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রথম জমা দিয়েছিলেন ৫ জানুয়ারি। তার মানে এর কমপক্ষে তিন দিন আগে নিশ্চয়ই আপনারা জেনেছিলেন যে নতুন একটি ভাইরাস এসেছে। হয়তো আপনারা তখন বুঝতে পারেননি যে এটি মহামারি ঘটিয়ে দেবে, কিন্তু সত্যি বলতে কি, আগেভাগে তা সবাইকে জানালে নিশ্চয়ই ভালো কিছু হতে পারত।

উত্তর: আমার তা মনে হয় না। আমরা আমাদের বৈজ্ঞানিক সহকর্মীদের দ্রুত জানিয়েছিলাম। কিন্তু যেহেতু এর সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের বিষয় জড়িত, সেহেতু আমরা জনসমক্ষে ঘোষণা করার জন্য নীতিনির্ধারকদের অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করেছি।

প্রশ্ন: ২০ জানুয়ারির আগে চীনা বিজ্ঞানীরা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেননি যে এটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানোর স্পষ্ট প্রমাণ তাঁরা পেয়েছেন। এটি যে মানবদেহ থেকে মানবদেহে ছড়াতে সক্ষম ভাইরাস, তা বুঝতে চীনের এপিডোমিলোজিস্টদের এত সময় কেন লাগল বলে আপনি মনে করেন?

উত্তর: মহামারির বিশদ তথ্য তখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া প্রথম থেকেই আমরা ভাইরাসটিকে তীব্র বেপরোয়া চরিত্রে পাচ্ছিলাম। ঠিক একই ঘটনা আমরা ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে দেখছি। সবখানেই বিজ্ঞানীরা ভেবেছেন, ‘ও আচ্ছা, এটা তো একটা মামুলি ভাইরাসই!’

প্রশ্ন: চীনে ভাইরাসটির দৌড় এখন হামাগুড়িতে নেমে এসেছে এবং এখানে নতুন করে যাঁদের সংক্রমণের শিকার হতে দেখা যাচ্ছে, তঁারা প্রধানত বাইরের দেশ থেকে চীনে ঢোকা লোক। আমি ঠিক বলছি?

উত্তর: হ্যাঁ, ঠিক। এ মুহূর্তে আমাদের স্থানীয় সংক্রমণ একেবারে নেই বলা যায়। তবে সমস্যা হলো বাইরে থেকে সংক্রমণের শিকার হয়ে চীনে বহু লোক আসছে।

প্রশ্ন: কিন্তু চীনে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এলে কী ঘটবে? মানে বলতে চাইছি আপনি কি মনে করেন যে পরিমাণ লোক সংক্রমিত হলে একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রাকৃতিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মায়, সে পরিমাণ লোক ইতিমধ্যে চীনে সংক্রমণের শিকার হয়েছে?

উত্তর: আপনি হার্ড ইমিউনিটি বা গৌষ্ঠিক প্রতিরোধ ক্ষমতার কথা বলছেন তো! নিশ্চিতভাবে সেটি আমরা এখনো অর্জন করতে পারিনি। তবে বিভিন্ন অ্যান্টিবডি টেস্টের মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছি, ঠিক কী পরিমাণ লোক এ পর্যন্ত সংক্রমণের শিকার হয়েছে।

প্রশ্ন: তাহলে এখন আপনাদের মূল্য কর্মকৌশল কী? কার্যকর ওষুধের খোঁজে সময় দেওয়া?

উত্তর: হ্যাঁ। আমাদের বিজ্ঞানীরা এই রোগের ভ্যাকসিন এবং ওষুধ দুটোই আবিষ্কারের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

প্রশ্ন: অনেক বিজ্ঞানীই রেমডিসিভিরকে সবচেয়ে আশাজাগানিয়া ওষুধ বলে মনে করছেন। পরীক্ষামূলকভাবে চীনে প্রয়োগ করা এই ওষুধের কার্যকারিতার বিষয়ে কবে নাগাদ তথ্য–উপাত্ত পাওয়া যেতে পারে?

উত্তর: এপ্রিলেই।

প্রশ্ন: প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প করোনাভাইরাসকে ‘চায়না ভাইরাস’ অথবা ‘চায়নিজ ভাইরাস’ বলে উল্লেখ করেছেন। এ নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?

উত্তর: এটিকে ‘চায়নিজ ভাইরাস’ বলা মোটেও ভালো কথা নয়। এই ভাইরাস পৃথিবী থেকে উদ্‌গত। এটি আমাদের সবার শত্রু। এটি কোনো ব্যক্তি বা দেশের শত্রু নয়।

অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন