১৯৭৭ সাল থেকে ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব মিউজিয়ামস (আইকম) সারা বিশ্বের জাদুঘরবিদদের সঙ্গে জাদুঘরের উন্নয়ন ও সমসাময়িক সমস্যা নিয়ে প্রতিবছর একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে ১৮ মে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস পালন করে আসছে।
২০২৬ সালের প্রতিপাদ্যে বলা হয়েছে, ‘মিউজিয়ামস ইউনাইটিং আ ডিভাইডেড ওয়ার্ল্ড’, আইকম বাংলাদেশ যার বাংলা করেছে ‘বিভক্ত বিশ্বে মেলবন্ধনে জাদুঘর’। এবারের প্রতিপাদ্যে এসডিজির গোল নম্বর ১০: বৈষম্যের মাত্রা হ্রাসকরণ; গোল নম্বর ১৬: শান্তি, ন্যায়বিচার ও টেকসই প্রতিষ্ঠান এবং গোল নম্বর ১৭: অংশীদারত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
জাদুঘর ও এর কাজ সম্পর্কে একটু ধারণা দেওয়া প্রয়োজন। গ্রিক শব্দ Mouses থেকে জাদুঘর; এর আক্ষরিক প্রতিশব্দ Museum শব্দটির উদ্ভব। Museum–এর বাংলা ‘জাদুঘর’ বা ‘সংগ্রহশালা’। জাদুঘর সমাজসেবামূলক অলাভজনক ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বস্তুগত ও অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংগ্রহ, যত্ন করা, শনাক্তকরণ, নথিবদ্ধকরণ, সংরক্ষণ, গুদামজাতকরণ ও প্রদর্শন এবং গবেষণা ও প্রকাশনা দ্বারা শিক্ষা ও বিনোদনের খোরাক জোগায়।
দেশের প্রথম জাদুঘর বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠিত হয় রাজশাহীতে ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে। ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন সচিবালয় তথা আজকের ঢাকা মেডিকেল কলেজের এক ক্ষুদ্র পরিসরের কক্ষে ঢাকা জাদুঘরের প্রতিষ্ঠা হয়, যা বর্তমানে শাহবাগে অবস্থিত বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর। অভূতপূর্ব উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় এগিয়ে যাওয়া বিশ্ব বর্তমানে সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও ভূরাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। এ বিভক্তির কারণ খুঁজে বের করা ও বিভক্ত বিশ্বের মেলবন্ধনে জাদুঘর যেসব কাজ করে থাকে এবং নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে, সে সম্পর্কে আলোকপাত করা।
বিশ্বে বিভক্তির কারণ হিসেবে দেখা যায়, পারিবারিক-সামাজিক-প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য, একতা ও অংশীজনদের অনুপস্থিতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতায় আসক্তি, নৈতিকতার স্খলন, মানবিক মূল্যবোধের অভাব, একে অপরের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও সহযোগিতার অভাব, বিশ্বাসের অভাব, একক পরিবার, বড়দের শ্রদ্ধা ও ছোটদের স্নেহ না করা, অন্যের মতামত ও ছোটদের প্রাধান্য না দেওয়া, ভালো কাজে উৎসাহ ও ধ্বংসাত্মক কাজে বাধা না দেওয়া, ধৈর্য ধরে কারও কথা না শোনা প্রভৃতি।
সমাজব্যবস্থায় প্রায়ই মানুষের মধ্যে হিংসা, লোভ, অস্থিরতা বিরাজ করছে। ফলে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে বিশেষ করে বর্তমান প্রজন্মের। শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির কারণ পরিবার তথা সমাজে বৈষম্য, বিভিন্ন দেশে চলমান যুদ্ধ, অতিরিক্ত কার্বন, জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, অতি উচ্চমাত্রায় হর্ন বাজানো এবং অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহারে মানুষের নানাবিধ রোগ সৃষ্টি হচ্ছে যেমন উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসকষ্ট, হিটস্ট্রোক, মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা ইত্যাদি।
ডিজিটালাইজেশনের যুগে প্রবেশ করে মোবাইল গেম, ফেসবুক, ইউটিউবসহ নানাবিধ ডিজিটাল আসক্তির ফলে মানুষ পারিবারিক ও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
বিচ্ছিন্নতার প্রভাবে পরিবার, সমাজ, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, দেশ তথা বিশ্বে বিভক্তি বাড়ছে। রাজনৈতিক সহিংসতা বিভক্তির অন্যতম কারণ, যা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে সহমর্মিতা ও সংযমী আচরণের অভাবে ঘটছে, যেমন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। যুদ্ধের ফলে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, অর্থনীতি, জনজীবন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, পর্যটনশিল্প প্রভৃতি হুমকিতে রয়েছে, যা মহাবিপর্যয়ের সৃষ্টি করতে পারে। এ থেকে উত্তরণের জন্য দেশ তথা বিশ্ব নেতানেত্রীদের প্রতিহিংসা, ভেদাভেদ ভুলে যুদ্ধ বন্ধ করা এবং রাজনৈতিক সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ, ভালো কাজে মনোযোগ দেওয়া ও দৃষ্টান্ত স্থাপন করা দরকার।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যচর্চার মাধ্যমে দর্শকদের গ্যালারি পরিদর্শন, বিনোদনসহ অতীত ঐতিহ্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করে থাকে জাদুঘর। যেমন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর নিয়মিত দর্শক/বিভিন্ন স্কুল–কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত ছাত্র-ছাত্রী, পথশিশু থেকে শুরু করে দেশি-বিদেশি ভিআইপি প্রভৃতি পর্যায়ে নিয়মিত গাইডসেবা প্রদানসহ বিভিন্ন দিবসকে কেন্দ্র করে স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিভিন্ন কুইজ প্রতিযোগিতা (বিতর্ক, সুন্দর হাতের লেখা, ছবি আঁকা ইত্যাদি) এবং বিজয়ীদের পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখছে। পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, সামাজিক মূল্যবোধ তৈরিতে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে।
জাদুঘর নিদর্শনের গবেষণা ও প্রকাশনা দ্বারা অতীত ইতিহাসকে জনসমক্ষে তুলে ধরে। বর্তমান প্রজন্মকে শিক্ষানুরাগী ও বই পড়ার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টির লক্ষ্যে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর শিশুদের জন্য শিশু লাইব্রেরি করেছে, যা শিশুদের ডিজিটাল আসক্তি থেকে ফিরিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। সমাজব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করতে জ্ঞান অর্জন অপরিহার্য। বই পড়ার গুরুত্ব ও আনন্দ সম্পর্কে এবং বিখ্যাত মনীষীদের বাণী গ্যালারির ফাঁকে ফাঁকে দেওয়া যেতে পারে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বরেণ্য ব্যক্তিদের নিয়ে স্মরণসভার আয়োজন করছে, যা অংশীজনদের (ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ববিদ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গবেষক, সাংবাদিক ও জাদুঘরবিদ) সঙ্গে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মেলবন্ধন করার সুযোগ করে দিচ্ছে, যা তাদের অনুপ্রাণিত করাসহ কর্মস্থলে কাজের গতিশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশে এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা দূরীকরণে সব শ্রেণির দর্শকদের (বয়োবৃদ্ধ, স্বল্প অসুস্থ, বিশেষভাবে চলাচলে অক্ষম ব্যক্তি, ডিজিটাল আসক্তি, মাদকাসক্ত, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, সুবিধাবঞ্চিত পথশিশু, প্রতিটি পর্যায়ের শিক্ষার্থী) জাদুঘর পরিদর্শনে আসার আহ্বান জানানো, ঐতিহ্য সংরক্ষণে সচেতনতা সৃষ্টি করা, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম করে পূর্বপুরুষদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়াসহ জ্ঞান আদান-প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র প্রতিটি পর্যায় থেকে বৈষম্য হ্রাস করা, শান্তি, ন্যায়বিচার ও টেকসই প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। এসব কাজ করতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন মানুষের মধ্যে মেলবন্ধন।
বিভিন্ন দেশে চলমান যুদ্ধ বন্ধে জাদুঘরবিদেরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে বিশ্বনেতাদের জাদুঘর ভ্রমণে আমন্ত্রণ জানানোর ফলে এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের নেতাদের সরাসরি দেখা হওয়া, কথা বলার সুযোগ, যোগাযোগ ও হৃদ্যতা বৃদ্ধি পাবে এবং মেলবন্ধনের সৃষ্টি হবে। এ ছাড়া জাদুঘর ভ্রমণে দীর্ঘদিনের কোনো পরিচিত বন্ধু, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা হওয়া, যা মেলবন্ধনে সহায়ক হবে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ সামরিক সংঘাত, ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধের ফলে ইরান ও ইউক্রেনের বহু প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও জাদুঘর ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অমূল্যবান নিদর্শন লুট হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশেও ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান ও ৫ আগস্টের সরকার পতনের পর বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক নিদর্শন, ভাস্কর্য, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর, গণভবন ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, যা নিয়ে আইকম বাংলাদেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যদিও বর্তমান বিশ্ব জলবায়ু–সংকট মোকাবিলায় কাজ করছে, তথাপি অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ না করলে মানবজীবন তথা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হুমকিতে পড়বে। আমাদের আত্মপরিচয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠান জাদুঘর। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করি, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দর, মানবিক বোধসম্পন্ন পরিবার, সমাজ, দেশ, রাষ্ট্র তথা বিশ্ব গড়ে তুলি।
ড. আছিয়া খানম সাবেক কিউরেটর, ঢাকা জাদুঘর
মতামত লেখকের নিজস্ব