বীণা-রঞ্জিত পুস্তক হস্তে সরস্বতী দেবী

মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে জ্ঞান, বিদ্যা ও ললিতকলার দেবী সরস্বতীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।ফাইল ছবি

সরস্বতী শব্দের দুই অর্থ—একটি ত্রিলোক্যব্যাপিনী সূর্যাগ্নি, অন্যটি নদী।

সরস+বতী=সরস্বতী, অর্থ জ্যোতির্ময়ী। ঋগ্বেদে আছে, ‘অম্বিতমে নদীতমে দেবীতমে সরস্বতী’, সম্ভবত সরস্বতী নদীর তীরেই বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির উদ্ভব। সরস্বতী মূলত বৈদিক দেবী। বেদে সরস্বতী প্রধানত নদীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী। সরস শব্দের অর্থ জল। অতএব সরস্বতী শব্দের আদি অর্থ হলো জলবতী, অর্থাৎ নদী। তিনি বিদ্যার দেবী, জ্ঞানদায়িনী, বীণাপাণি, কুলপ্রিয়া, পলাশপ্রিয়া প্রভৃতি নামে অভিহিত। তাঁর এক হাতে বীণা, অন্য হাতে পুস্তক।

সরস্বতী ‘সতত রসে সমৃদ্ধা’। তিনি শুক্লবর্ণা, শুভ্র হংসবাহনা, ‘বীণা-রঞ্জিত পুস্তক হস্তে’, অর্থাৎ এক হাতে বীণা ও অন্য হাতে পুস্তক। মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে জ্ঞান, বিদ্যা ও ললিতকলার দেবী সরস্বতীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি বাড়িতে সরস্বতীপূজার উৎসবের আয়োজন করা হয়।

বৃহস্পতি হচ্ছেন জ্ঞানের দেবতা, বৃহস্পতি-পত্নী সরস্বতীও জ্ঞানের দেবী। সরস্বতী নদীর তীরে যজ্ঞের আগুন জ্বেলে সেখানেই ঋষি লাভ করেছিলেন বেদ বা ঋগ্‌মন্ত্র। সুতরাং সরস্বতী জ্ঞানের দেবী হিসেবেই পরিচিত হয়েছিলেন এ ধরায়। কালের বিবর্তনে সরস্বতী তাঁর অন্য বৈশিষ্ট্যগুলো হারিয়ে কেবল বিদ্যার দেবী, অর্থাৎ জ্ঞান ও ললিতকলার দেবীতে পরিণত হলেন।

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, ‘শিক্ষা হচ্ছে মানুষের ভিতর যে পূর্ণতা প্রথম হতেই বর্তমান, তারই প্রকাশ।’ আমাদের প্রত্যকের ভেতরে অনন্ত জ্ঞানের ভান্ডার রয়েছে। জ্ঞান সততই বর্তমান রয়েছে, মানুষ কেবল সেটা আবিষ্কার করে। এই জ্ঞান আবার মানুষের অন্তর্নিহিত।

ভাগবত পুরাণ অনুসারে, দেবী আদ্য প্রকৃতির তৃতীয় অংশে দেবী সরস্বতীর জন্ম। তিনি কৃষ্ণর জিহ্বাগ্র থেকে উৎপন্ন হয়েছেন। সরস্বতী দেবী বাক্য, বুদ্ধি, বিদ্যা ও জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী। সব সংশয় ছেদকারিণী ও সর্বসিদ্ধি প্রদায়িনী এবং বিশ্বের উপজীবিকা স্বরূপিণী। ব্রহ্মা প্রথম তাঁকে পূজা করেন। পরে জগতে তাঁর পূজা প্রতিষ্ঠিত হয়। সরস্বতী শুক্লবর্ণা, পীত বস্ত্রধারিণী এবং বীণা ও পুস্তকহস্তা। তিনি নারায়ণের অন্যতম পত্নী হয়েছিলেন। এরপর শ্রীকৃষ্ণ জগতে তাঁর পূজা প্রবর্তন করেন মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে।

সরস্বতীর বাহন হাঁস। তিনি এই বাহন ব্রহ্মার কাছ থেকে লাভ করেছিলেন। তবে বৈদিক সাক্ষ্য থেকেই জানা যায়, সিংহ ও মেষ সরস্বতী দেবীর আদি বাহন ছিল। সরস্বতীর হংস বাহন সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয়—জলে, স্থলে, অন্তরিক্ষে সর্বত্রই তাঁর সমান গতি, ঠিক যেমনভাবে জ্ঞানময় পরমাত্মা সব জায়গায় বিদ্যমান। হংস জল ও দুধের পার্থক্য করতে সক্ষম। জল ও দুগ্ধ মিশ্রিত থাকলে হাঁস শুধু সারবস্তু দুগ্ধ বা ক্ষীরটুকুই গ্রহণ করে, জল পড়ে থাকে। জ্ঞানসাধনার ক্ষেত্রেও হংসের এ স্বভাব তাৎপর্য বহন করে।

শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, শ্রীপঞ্চমীর দিন সকালেই সরস্বতীপূজা সম্পন্ন করা হয় সাধারণ পূজার আচারাদি মেনে। তবে এই পূজায় কয়েকটি বিশেষ উপচার বা সামগ্রীর প্রয়োজন হয়, যেমন অভ্র-আবির, আমের মুকুল, দোয়াত-কলম ও যবের শিষ, বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে পাঠশালায় প্রতি মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে ধোয়া চৌকির ওপর তালপাতার তাড়ি ও দোয়াত-কলম রেখে পূজা করার প্রথা ছিল। গ্রামাঞ্চলে এই প্রথা বিংশ শতাব্দীতেও প্রচলিত ছিল। শহরে ধনাঢ্য ব্যক্তিরাই সরস্বতীর প্রতিমা নির্মাণ করে পূজা করতেন। আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরস্বতীপূজার প্রচলন হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে।

বর্তমানে সরস্বতী প্রায় সব জায়গায়ই দ্বিভুজা। তাঁর হাতে বীণা অপরিহার্য। বীণা অবশ্যই সংগীত ও অন্যান্য কলাবিদ্যার প্রতীক। অক্ষরমালা বা জপমালাও আধ্যাত্মবিদ্যার প্রতীক। শুকপাখিও বিদ্যা বা বাক্যের প্রতীক হিসেবেই সরস্বতীর হাতে শোভা বাড়াচ্ছে। সরস্বতীর প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত রয়েছে সূর্যাগ্নির জ্যোতিতে। সূর্যাগ্নির তেজ, তাপ ও চৈতন্যরূপে জীবদেহে বিরাজ করায় চেতনা ও জ্ঞানের প্রকৃত কর্ত্রী তো দেবী সরস্বতী। সরস্বতী দেবীর রূপান্তর হয়েছে পৃথিবীতে নদীরূপে এবং সরস্বতীই অগ্নি-ইন্দ্র-মরুৎ অশ্বিদ্বয়ের সংস্পর্শে শত্রুঘাতিনী, ধনদাত্রী এবং বৃহস্পতি-ব্রহ্মাণস্পতির বিদ্যাবত্তার সংযোগে নদী সরস্বতীর সঙ্গে অভিন্নরূপে সরস্বতীতীরে উচ্চারিত বৈদিক মন্ত্রে সংশ্লিষ্ট হয়ে পুরাণে বিদ্যা ও জ্ঞান ভিন্ন অপর জ্ঞানগুলো অন্যত্র স্থাপন করে হলেন বিদ্যাধিষ্ঠাত্রী।

সরস্বতীর অঞ্জলিমন্ত্রে বলা হয়েছে, ‘ভদ্রকালীকে নিত্য নমস্কার, দেবী সরস্বতীকে নমস্কার, বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্তাদি বিদ্যাস্থানকে নমস্কার করি।’

আলো হলো শিক্ষা, জ্ঞান। হৃদয়ে শিক্ষার আলো থাকলে সাবলীল হয় যাপিত জীবন, উদার হয় মন, মানবতা জাগ্রত হয়। তাই শিক্ষাকে মানুষের মেরুদণ্ডের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। ঘুণে ধরা সমাজব্যবস্থায় মেরুদণ্ডহীন মানুষ কখনোই সফলতার মুখ দেখতে পারেন না। মানুষ তাই শিক্ষার জন্য, জ্ঞানের জন্য নিরন্তর পরিশ্রম করে।

বৈদিক জ্যোতিরূপা সরস্বতী ও নদী সরস্বতী সম্মিলিতভাবে জ্ঞানের দেবীরূপে পুরাণতন্ত্র ও সাহিত্যে বিপুল শ্রদ্ধা ও ভক্তির অধিকারিণী হয়েছেন। বেদে সরস্বতী প্রধানত নদীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী। পুরাণ অনুযায়ী, শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতেই ব্রহ্মার মুখ থেকে বিদ্যা ও বুদ্ধির দেবী সরস্বতীর উৎপত্তি। পুরাণে আরও বলা হয়েছে, দেবী সরস্বতী আদ্যা প্রকৃতির তৃতীয় অংশজাত।

সরস্বতী বাক্য, বুদ্ধি, জ্ঞান, বিদ্যা ইত্যাদির অধিষ্ঠাত্রী দেবী। ওই গ্রন্থমতে, সরস্বতীপূজার প্রবর্তক ব্রহ্মা ও শ্রীকৃষ্ণ। তবে পণ্ডিতদের অনেকেই মনে করেন, সরস্বতী প্রথমে ছিলেন নদী, পরে হলেন দেবী। রমেশচন্দ্র দত্ত লিখেছেন, ‘আর্যাবর্তে সরস্বতী নামে যে নদী আছে, তা-ই প্রথমে দেবী বলে পূজিত হয়েছিলেন।’

বর্তমানে গঙ্গা যেমন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপাস্য দেবী হিসেবে পূজিত হয়ে থাকেন, তেমনি বিবর্তনের ধারায় সরস্বতী হলেন জ্ঞানের দেবী। সরস্বতীর বাহন হংস। বেদ ও উপনিষদে হংস শব্দের অর্থ সূর্য।

সরস্বতীর প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত রয়েছে সূর্যাগ্নির জ্যোতিতে। সূর্যাগ্নির তেজ, তাপ ও চৈতন্যরূপে জীবদেহে বিরাজ করায় চেতনা, জ্ঞানের প্রকৃত কর্ত্রী তো দেবী সরস্বতী। সরস্বতী দেবীর রূপান্তর হয়েছে পৃথিবীতে নদীরূপে এবং সরস্বতীই অগ্নি-ইন্দ্র-মরুৎ অশ্বিদ্বয়ের সংস্পর্শে শত্রুঘাতিনী, ধনদাত্রী এবং বৃহস্পতি-ব্রহ্মাণস্পতির বিদ্যাবত্তার সংযোগে নদী সরস্বতীর সঙ্গে অভিন্নরূপে সরস্বতীতীরে উচ্চারিত বৈদিক মন্ত্রে সংশ্লিষ্ট হয়ে পুরাণে বিদ্যা ও জ্ঞান ভিন্ন অপর জ্ঞানগুলো অন্যত্র স্থাপন করে হলেন বিদ্যাধিষ্ঠাত্রী।

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, ‘শিক্ষা হচ্ছে মানুষের ভিতর যে পূর্ণতা প্রথম হতেই বর্তমান, তারই প্রকাশ।’ আমাদের প্রত্যকের ভেতরে অনন্ত জ্ঞানের ভাণ্ডার রয়েছে। জ্ঞান সততই বর্তমান রয়েছে, মানুষ কেবল সেটা আবিষ্কার করে। এই জ্ঞান আবার মানুষের অন্তর্নিহিত।

  • তারাপদ আচার্য্য সাধারণ সম্পাদক, সাধুনাগ মহাশয় আশ্রম, দেওভোগ, নারায়ণগঞ্জ