পার্বতী কেন শিবের সমকক্ষ হতে চেয়েছিলেন

বিদ্বেষের কারণেই পুরুষ নারীর স্বাধিকার কেড়ে নিতে চায়, তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, রোধ করতে চায় নারীকণ্ঠ, সীমিত করতে চায় তার স্বাধীন সত্তা এবং আত্মপরিচয়।ছবি : প্রথম আলো

প্রতিবছর নারী দিবসে আমরা নারীর শক্তি, স্থিতিস্থাপকতা ও কৃতিত্ব উদ্‌যাপন করি। তবু বক্তৃতা ও স্লোগানের আড়ালে একটি নীরব, অস্বস্তিকর সত্য লুকিয়ে আছে: নারীদের এখনো নিজেদের এমনভাবে প্রমাণ করার আশা করা হয়, যেভাবে পুরুষেরা তা করে না। সম্ভবত এই প্রত্যাশার প্রাচীনতম রূপকগুলোর মধ্যে একটি আমাদের নিজস্ব পৌরাণিক কাহিনিতে রয়েছে—পার্বতী ও শিবের গল্পে।

বিস্ময় লাগে যখন দেখি প্রাচীন ভারতের শিব-পার্বতী উপাখ্যানেও গভীর তপস্যার মধ্য দিয়ে পার্বতী স্বীয় পতি শিবের সমকক্ষ হওয়ার চেষ্টা করেন। হিন্দু পুরাণে শিব স্বয়ং ঈশ্বরের এক অংশ—সংহারকর্তা, মহাপরাক্রমশালী, আবার ধ্যানী-তপস্বী ও অনেক গুণের অধিকারী।

পর্বতরাজ দক্ষের কন্যা পার্বতী শিবের গুণমুগ্ধ, প্রেমপ্রত্যাশী, কিন্তু জানেন যে তিনি শিবের যোগ্য নন। তাই তাঁর প্রেম জয় করার জন্য, শিবের মতোই আরাম-আয়েশ, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য পেছনে ফেলে গৃহ ত্যাগ করে হিমালয়ের গুহায় দিন–রাত উপবাসসহযোগে গভীর ধ্যানে ও কঠোর তপস্যায় মগ্ন হয়ে যান হিমালয়–কন্যা। পার্বতীর এ তপস্যা এতই কঠোর, তীব্র ও নিরবচ্ছিন্ন ছিল যে এতে শিবের ধ্যান ভেঙে যায়। তাঁর মধ্যে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পার্বতীকে তখন আর তপস্যার পথে কাঁটা মনে হয় না শিবের; বরং মনে হয় যাত্রাপথের সহযাত্রী।

গভীর আনন্দের সঙ্গে শিব পার্বতীর পাণি গ্রহণ করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। শিব-পার্বতীর বিয়ে হয়, যা পৌরাণিক সাহিত্যে এক অনন্য প্রেমের গল্প হিসেবে স্থান পায়। কিন্তু সে গল্প আদতে প্রেম, ভালোবাসা, ত্যাগের মহিমার পাশাপাশি ঈর্ষা, প্রতিযোগিতা এবং একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার গল্পও বটে।

আখ্যানটি এমন একটি সামাজিক ধরনকে প্রতিফলিত করে, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। নারীরা প্রায়ই আরও কঠোর পরিশ্রম করতে, আরও ত্যাগ স্বীকার করতে, দীর্ঘ সময় ধরে সহ্য করতে বাধ্য বোধ করেন—সমান বিবেচিত হতে। শিক্ষাক্ষেত্রে, গুরুত্বসহকারে গ্রহণের জন্য তাঁদের আরও প্রকাশ করতে হবে।

বিয়ের পরপরই পার্বতী উপলব্ধি করেন, তিনি স্বামীকে পুরোপুরি পাচ্ছেন না। কোথায় যেন একটি অসংগতি। কোথায় যেন একটা অসমতার ভাব, যা তাঁকে সারাক্ষণ তাড়িয়ে ফেরে। পার্বতী আরও উপলব্ধি করেন যে জ্ঞানে-গরিমায়, ধ্যানে-তপস্যায়, ঐশ্বর্যে-ঔৎকর্ষে তিনি এখনো শিবের উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেননি এবং এ জন্যই এই অসংগতি ও অসমতার ভাব।

পরম ভালোবাসার মানুষকেও আপনার করে পেতে হলে একই সমতলে অবস্থান করতে হয়—পার্বতীর এমন উপলব্ধি তাঁকে আবার গুহাবাসী করে, তপস্যায় নিমগ্ন করে। জ্ঞানে-গরিমায়, ঐশ্বর্যে-ঔৎকর্ষে একদিন তিনি শিবের উচ্চতায় পৌঁছাবেন এবং পতিকে আপনার করে পাবেন—এ আশায় বুক বাঁধেন।

শিব-পার্বতী উপাখ্যান বহুযুগ আগের হলেও এর শিক্ষা আজও ক্রিয়াশীল। সম্পর্ক ভাঙার প্রধান কারণ আবেগনির্ভরতা। প্রেমের প্রধান উপাদান আবেগ, কিন্তু আবেগ ক্ষণস্থায়ী। একসঙ্গে বসবাস শুরু করলে আবেগ উবে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং আবেগ উবে গেলে সম্পর্ক ছিন্ন হতে পারে। এ জন্যই প্রেমের সম্পর্কের মধ্যেও বুদ্ধির প্রয়োগ দরকার। প্রেমিক-প্রেমিকাকে একে অপরকে বুঝতে হবে যুক্তির নিরিখে, জ্ঞান দিয়ে। সঙ্গীর দোষ-গুণ বিচার করার জন্যই দরকার হয় যুক্তি-বুদ্ধির।

জ্ঞানে-গরিমায়, ঐশ্বর্যে-ঔৎকর্ষে একই সমতলে না থাকলে প্রেমের সার্থক পরিণতি হয় না, এ দর্শন আমরা পাই রবিঠাকুরের প্রেমের উপন্যাস ‘শেষের কবিতা’য়। লাবণ্য অমিতকে বলছে, ‘আমার ভয় হয়, পথ চলতে গিয়ে আমি এক সময় তোমার থেকে পিছিয়ে পড়বো...’ এবং এমন আশঙ্কা থেকেই অমিতকে বিয়ে করতে লাবণ্যর মধ্যে এত দ্বিধা।

আরও পড়ুন

শিব-পার্বতীর উপাখ্যানের দুটি দিক। প্রথমত, ঐতিহ্যগতভাবে, গল্পটি ভক্তি ও আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলার বিজয় হিসেবে বলা হয়। অর্থাৎ একদিকে এর শিক্ষা হলো প্রেমের পরাকাষ্ঠায় ‘এক দেহ এক প্রাণ’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা জ্ঞানের ঐক্য ছাড়া পূরণ হওয়ার নয়; অন্যদিকে নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, কেন পার্বতীকে নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করতে হবে? কেন রূপান্তরের ভার তাঁর ওপর বর্তায়? স্বীকৃতি পেতে তাঁকে কেন কষ্ট সহ্য করতে হবে? কেন শিবকে পরিবর্তন করতে হবে না? অর্থাৎ পুরুষের সমকক্ষ হওয়ার চেষ্টাটা শুধু নারীকেই কেন করতে হবে? আজ নারী দিবসে এই প্রশ্নগুলো আমাদের অস্বস্তির কারণ।

আখ্যানটি এমন একটি সামাজিক ধরনকে প্রতিফলিত করে, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। নারীরা প্রায়ই আরও কঠোর পরিশ্রম করতে, আরও ত্যাগ স্বীকার করতে, দীর্ঘ সময় ধরে সহ্য করতে বাধ্য বোধ করেন—সমান বিবেচিত হতে। শিক্ষাক্ষেত্রে, গুরুত্বসহকারে গ্রহণের জন্য তাঁদের আরও প্রকাশ করতে হবে।

কর্মক্ষেত্রে, পদোন্নতির জন্য তাঁদের অবশ্যই সেরা হতে হবে। জনজীবনে, সন্দেহের ঊর্ধ্বে দক্ষতা প্রদর্শন করতে হবে, যাতে সন্দেহের অবসান ঘটে। আধুনিক নারীর ‘তপস্যা’ হিমালয়ের গুহায় না–ও থাকতে পারে, তবে তা বিদ্যমান—বোর্ডরুম, শ্রেণিকক্ষ, পরীক্ষাগার ও বাড়িতে।

তবু একই পৌরাণিক কাহিনি আরও গভীর, আরও মৌলিক অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।
হিন্দু দর্শনে, শক্তি ছাড়া শিব জড়। শক্তি ছাড়া চেতনা গতিহীন। সৃষ্টির উভয়েরই প্রয়োজন। এই সত্য তার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীকী প্রকাশ খুঁজে পায় অর্ধনারীশ্বরের আকারে—দেবতা যিনি অর্ধেক শিব, অর্ধেক পার্বতী। এক দেহ। সমান অর্ধেক। অধস্তনও নয়। উচ্চতরও নয়।

বস্তুত, সমতাই নারীবাদের মূল কথা। এই সমতার নীতিই ঘোষিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কাব্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’য়। নারীবাদী কবি রবীন্দ্রনাথ চিত্রাঙ্গদার মুখ দিয়ে যে সংলাপ বের করে আনেন, তা এ রকম:
‘...
নহি দেবী, নহি সামান্যা নারী।
পূজা করি মোরে রাখিবে ঊর্ধ্বে
সে নহি নহি,
হেলা করি মোরে রাখিবে পিছে
সে নহি নহি।
যদি পার্শ্বে রাখ মোরে
সংকটে সম্পদে,
সম্মতি দাও যদি কঠিন ব্রতে
সহায় হতে,
পাবে তবে তুমি চিনিতে মোরে।’


যদি তা–ই হয়, তাহলে পার্বতীর তপস্যা সমান হওয়ার বিষয়ে ছিল না। তিনি সর্বদা সমান ছিলেন। তাঁর তপস্যা আত্মসমর্পণ ছিল না, এটি ছিল দৃঢ়তা। এটি ছিল ইচ্ছার প্রকাশ, কর্তৃত্বের ঘোষণা। তিনি তাঁর ভাগ্য বেছে নিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি নিষ্ক্রিয়তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি স্বীকৃতি দিতে বাধ্য করেছিলেন।

সমান অধিকার বলা হলেও কাজের মজুরিসহ নানা ক্ষেত্রে নারীদের বঞ্চিত হওয়ার খবর মেলে। অথচ দেশের সব কাজে নারীদের রয়েছে বিশেষ অবদান। চারদিক সবুজ ধানখেত। তেমনি ধানখেতে আগাছা পরিষ্কার করছেন এক নারী কৃষিশ্রমিক। বনপাড়া, শ্রীবরদী, শেরপুর
ছবি: তাইয়েবুর রাহমান রিয়াদ

আমাদের সামাজিক কাঠামোর ট্র্যাজেডি হলো, আমরা প্রায়ই তপস্যা স্মরণ করি কিন্তু সমতা ভুলে যাই। আমরা নারীদের সহনশীলতা উদ্‌যাপন করি কিন্তু নারীদের কর্তৃত্ব প্রদানে দ্বিধা করি। আমরা ত্যাগের প্রশংসা করি কিন্তু ক্ষমতার পুনর্বণ্টনের বিরোধিতা করি। আমরা স্থিতিস্থাপকতাকে রোমান্টিক ভাবি কিন্তু স্বায়ত্তশাসনে অস্বস্তি বোধ করি।
হয়তো নারী দিবস কেবল সংগ্রামকে সম্মান জানানোর জন্য নয়। এটি অপ্রয়োজনীয় সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা দূর করার জন্য হওয়া উচিত।

আধুনিক সমাজের সামনে প্রশ্নটি সহজ: নারীদের কি স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য তপস্যা চালিয়ে যেতে হবে? নাকি আমরা স্বীকার করতে প্রস্তুত যে সমতা কষ্টের মাধ্যমে অর্জিত কিছু নয়; বরং সহজাত কিছু? পার্বতীর গল্প দুটি উপায়ে পড়া যেতে পারে। একভাবে, একজন নারী ত্যাগের মাধ্যমে তাঁর যোগ্যতা প্রমাণ করেন।

অন্যটিতে, একজন নারী এত গভীরভাবে কর্তৃত্ব প্রয়োগ করেন যে সর্বশ্রেষ্ঠ তপস্বীকেও প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়।
আমরা কোন সংস্কারের ওপর জোর দেব, তা নির্ধারণ করবে আমরা কী ধরনের সমাজ গড়ে তুলব। এই নারী দিবসে, পার্বতীর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা তাঁর তপস্যাকে প্রশংসা করা নয়। এটি তাঁর শক্তির স্বীকৃতি—প্রথমে তপস্যা দাবি না করে।

সে জন্যই নারীবাদী আন্দোলনের প্রধান কাজ হলো নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করা। নারী যাতে পুরুষের চেয়ে পিছিয়ে না পড়েন, সে ব্যবস্থা নির্মাণ করাই আসল কাজ। কী সেই ব্যবস্থা? এমন এক রাজনৈতিক-সামাজিক বন্দোবস্ত, যা সমাজের খোলনলচে পাল্টে দেবে, রাষ্ট্রের নতুন কাঠামো নির্মাণ করবে। ব্যক্তির মননে পরিবর্তন না হলে সমাজের পরিবর্তন হয় না।

আবার সমাজের পরিবর্তন ছাড়া রাষ্ট্রের পরিবর্তন হয় না। এ জন্যই কৃত্রিমভাবে রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তন করে মানুষের জীবনে কোনো পরিবর্তন আনা যায় না। একইভাবে, নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে রাষ্ট্রের আইনে পরিবর্তন এনে নারী-পুরুষে সমতা নিশ্চিত করা যাবে না।

  • এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। [email protected]
    (মতামত লেখকের নিজস্ব)