পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান এবং আসামে দলটির অবস্থান সুদৃঢ় হওয়া ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশী অঞ্চলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে এক বিরল রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। একই সময়ে ঢাকা ও কাঠমান্ডুতে নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ভারতের আঞ্চলিক নীতি নতুনভাবে পর্যালোচনার সুযোগ দিচ্ছে। বহু বছরের মধ্যে এবারই প্রথম ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভূগোল এবং তার পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশী পরিসরের পরিস্থিতি একটি উচ্চাভিলাষী আঞ্চলিক এজেন্ডার পক্ষে অনুকূল হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রভাব থাকে; আর যখন সেই নির্বাচন সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে হয়, তখন তার পররাষ্ট্রনীতিগত প্রভাবও তৈরি হয়। কেন্দ্রীয় সরকার ও সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের প্রতিবেশী নীতিকে জটিল করে তুলেছে। এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ দেখা গেছে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও তামিলনাড়ুতে, যেখানে স্থানীয় রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ প্রায়ই জাতীয় পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে। সময়ের সঙ্গে সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর আঞ্চলিক নেতারা প্রায়ই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ‘স্পয়লার’ বা বাধা হয়ে উঠেছেন; প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কের ওপর কার্যত তাঁদের একধরনের ভেটো ক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
গত এক দশকে মোদি যে বৃহত্তর আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গির কথা তুলে ধরেছেন, তা এখনো প্রাসঙ্গিক। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা কিছুটা শিথিল হওয়া এবং অঞ্চলে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে দিল্লির সামনে এখন পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে আরও সুসংহত, দীর্ঘমেয়াদি ও ফলপ্রসূ সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, কেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতার এই সামঞ্জস্য স্থানীয় ও জাতীয় স্বার্থের মধ্যে আরও ভালো সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি করছে। কিন্তু সমস্যাটি কেবল রাজনৈতিক নয়; এর শিকড় ভূগোলে নিহিত। দূরবর্তী শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের তুলনায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কূটনীতি সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ফলে স্থানীয় ও জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। এই টানাপোড়েন সামাল দিতে দিল্লির পক্ষ থেকে সীমান্ত অঞ্চলের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক মনোযোগ এবং জাতীয় কৌশলের মধ্যে রাজ্যভিত্তিক উদ্বেগগুলোর আরও গভীর অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন।
ইউনাইটেড প্রগেসিভ অ্যালায়েন্স (ইউপিএ) সরকার গুরুতর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ভুগেছিল। ২০০৪ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে কংগ্রেস আন্তর্জাতিক সুযোগগুলো কাজে লাগাতে হিমশিম খেয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে নিজ দল ও জোটের মধ্যেই তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েন। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে একটি পররাষ্ট্রনীতি–বিষয়ক ইস্যুতে তাঁকে সংসদে নজিরবিহীন আস্থা ভোটে জয়ী হতে হয়েছিল।
প্রতিবেশী কূটনীতিও কম বিতর্কিত ছিল না। তামিলনাড়ুতে রাজ্য কংগ্রেস নেতারা নির্বাচনী বিবেচনায় শ্রীলঙ্কার সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ককে সীমিত করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে আসামের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে মনমোহন সিং শেখ হাসিনার সঙ্গে অংশীদারত্বে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ নেন। এই এজেন্ডা ছিল বিস্তৃত—স্থলসীমান্ত সমস্যার সমাধান, সন্ত্রাসবাদের মতো নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলা, পানিবণ্টন বিরোধ নিষ্পত্তি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দেশভাগ-পূর্ব যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার।
তবে এই উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এসে থমকে যায়। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি শেষ পর্যন্ত স্বাক্ষরিত হয়নি। কারণ, শেষ মুহূর্তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর রাজনৈতিক সম্মতি প্রত্যাহার করে নেন। অথচ তিস্তা নিয়ে আলোচনায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। তবু বাস্তবতা হলো, মমতার খামখেয়ালি অবস্থান ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীর সঙ্গে দিল্লির কূটনৈতিক বিকল্পগুলোকে তীব্রভাবে সীমিত করে দেয়।
বাংলাদেশের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তি (এলবিএ) অনুমোদনের ক্ষেত্রেও ইউপিএ সরকার বিজেপির প্রতিরোধের মুখে পড়ে। একসময় মনে হচ্ছিল, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে দেশভাগ-পরবর্তী দীর্ঘদিনের বিতর্কিত সীমান্ত সমস্যার এই ঐতিহাসিক সমাধান অনির্দিষ্টকালের জন্য বিলম্বিত হয়ে পড়বে।
এই অচলাবস্থার অবসান ঘটে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর। বিজেপির অভ্যন্তরে আগের বিরোধিতা উপেক্ষা করে মোদি ঘোষণা দেন যে বাংলাদেশের সঙ্গে স্থায়ী সীমান্ত নিষ্পত্তি ভারতের জাতীয় স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এরপর তিনি স্থলসীমান্ত চুক্তি (এলবিএ) অনুমোদন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে সামুদ্রিক সীমান্ত বিষয়ে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতের রায়ও মেনে নেন।
এই পদক্ষেপগুলো ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের এমন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে, যাকে মোদি নিজেই ‘স্বর্ণালি অধ্যায়’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। ২০১৪ সালের পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যে অসাধারণ গতি তৈরি হয়েছিল, তা ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির ঘটনায় ব্যাহত হয়। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আগের দশকের নীতিগত ধারার তুলনায় উল্লেখযোগ্য ভিন্নতার ইঙ্গিত দেয়। তবে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক সরকার ভারতের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের স্পষ্ট আগ্রহ দেখিয়েছে।
দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের পাশাপাশি ২০১৪ সালে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন ব্যর্থ হওয়ার পর মোদি বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালকে নিয়ে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ নেন। বর্তমানে উত্তর-পূর্ব ভারতে বিজেপির উত্থান এবং ঢাকা ও কাঠমান্ডুতে নতুন নেতৃত্বের আবির্ভাব উপ-আঞ্চলিকতার নতুন প্রচেষ্টার ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে আঞ্চলিক সহযোগিতা পুনর্গঠনের পুরো দায়িত্ব শুধু দিল্লির ওপর নির্ভর করতে পারে না। ঢাকা ও কাঠমান্ডুর নতুন সরকারকেও পূর্ব উপমহাদেশে আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে হবে।
সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফলের আগেই দিল্লি ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার ইঙ্গিত দিতে শুরু করেছিল। সম্প্রতি ভারতীয় দূতদের এক সম্মেলনে মোদি ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন, যেখানে বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থার ওপর আরও বেশি জোর দেওয়া হয়। তবে চ্যালেঞ্জগুলো এখনো অত্যন্ত জটিল। অভিবাসন, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন, আন্তসীমান্ত অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদ, বাণিজ্য বাধা এবং নদীর পানি বণ্টনের মতো বিষয়গুলো শুধু ভারত ও তার প্রতিবেশীদের মধ্যেই নয়, কেন্দ্র ও রাজ্যগুলোর মধ্যেও জটিল আলোচনার দাবি রাখে। কেবল রাজনৈতিক সমন্বয়ের মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান সহজ নয়।
তবু গত এক দশকে মোদি যে বৃহত্তর আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গির কথা তুলে ধরেছেন, তা এখনো প্রাসঙ্গিক। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা কিছুটা শিথিল হওয়া এবং অঞ্চলে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে দিল্লির সামনে এখন পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে আরও সুসংহত, দীর্ঘমেয়াদি ও ফলপ্রসূ সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সি. রাজা মোহন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের আন্তর্জাতিক–বিষয়ক সহযোগী সম্পাদক
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ।