‘অভিবাসী কূটনীতি’ নিয়ে এগোনোর যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গণযোগাযোগ বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের জন্য কেস স্টাডি হিসেবে পড়ানো হতে পারে।

‘অভিবাসী কূটনীতি’ নামকরণের বিষয়ে আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অভিবাসী মনে করবেন, সরকার তাঁদের জন্য নতুন কোনো কাজ করবে। কিন্তু যখন তাঁরা বুঝতে পারবেন সরকারের আসল উদ্দেশ্য তা নয়, তাঁদের মনে নেতিবাচক চিন্তা ভর করবে। তাই ‘অভিবাসী কূটনীতি’ নামকরণ একটি কৌশলগত অসতর্কতা বলেই মনে হয়েছে।
আরেকটি কৌশলগত অসতর্কতা হচ্ছে, অধিশাখা গঠনের খবরটি যেন গণমাধ্যমে প্রকাশ না পায়, সে চেষ্টা করার প্রয়োজন ছিল।

বিশ্বের প্রায় সব দেশেই এমন দপ্তর আছে, যেগুলো সরকারের গুণগান দেশে ও দেশের বাইরে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আড়ালে থেকে কাজ করে। আমেরিকা তার এক বড় উদাহরণ। এ খবর জনসমক্ষে প্রচারিত হওয়ার পর থেকে যেসব ইতিবাচক খবর বা লেখা প্রকাশিত হবে, জনমনে সেগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা না পাওয়ার ঝুঁকি রয়ে যেতে পারে। উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বিষয়টির গোপনীয়তা প্রয়োজন ছিল।

ইতিবাচক প্রচারণার বিষয় নিয়ে অনেক বেশি চিন্তা করার সুযোগ আছে বলে মনে করি। যোগাযোগ পেশায় ‘ভাবমূর্তি ব্যবস্থাপনা’ (রেপুটেশন ম্যানেজমেন্ট) বলে একটি দিক আছে, যা খ্যাতি আহরণের যাত্রায় ঝুঁকিগুলো শনাক্ত করে, সেগুলো কেন ও কীভাবে নেতিবাচক প্রচারণা হয়ে উঠতে পারে, তা মনে নিয়ে কাজ করা। ভাবমূর্তি ব্যবস্থাপনা একটি বড় কাজ। এটি একটি ছোট্ট অধিশাখার কাজ নয়। এ কাজ দেশ বা সরকার বা দলের সামগ্রিক ব্র্যান্ডিংয়ের কাজ।

একটি দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা বা দেশটিকে ব্র্যান্ডিং করা ১০০ বা ২০০ খবর বা উপসম্পাদকীয় দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করলেই ঘটে না; এর জন্য লেগে থাকতে হয় দিনের পর দিন এবং ঢের বেশি কাজ করতে হয়।

কী করতে হয়? সবার আগে সমীক্ষা করতে হয়। রাষ্ট্রকে যদি একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে বোঝা যেতে পারে। শ্রম, স্বরাষ্ট্র ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় একটি কোম্পানির মানবসম্পদ বিভাগ। এমন তুলনা সব মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

সমীক্ষাটি হতে হবে একটি বাজার গবেষণার (মার্কেট রিসার্চ) মতো। এটিকে আমরা ব্র্যান্ড ইকুইটিও বলতে পারি। সমীক্ষার মাধ্যমে এ গবেষণা করলে বোঝা যাবে, দেশের জনগণ সরকারকে নিয়ে কী ভাবছে। বোঝা যাবে, সরকারের সেবায় তারা খুশি বা সুখী কি না। বোঝা যাবে, মানুষ দেশে কেমন সরকার চায়। সরকারের আচরণ কেমন হওয়া প্রয়োজন। সরকারের কোন কোন বিষয়ে দুর্বলতা রয়েছে এবং সেগুলো কেমন করে দূর করা যেতে পারে। এককথায় বলতে গেলে জনগণের মনস্তত্ত্ব বোঝা যাবে।

এসব গবেষণা করাতে হবে পেশাদারদের দিয়ে—সরকারি কর্মকর্তারা এমনভাবে চিন্তা করেন না। বিশ্বের নানা দেশেই এমন গবেষণা করা হয় এবং তা করার জন্য বাজার নিয়ে গবেষণা করে—এমন কোম্পানিকে নিয়োগ দিয়ে, সততার সঙ্গে গবেষণার ফলাফলকে গ্রহণ করে, মনোযোগসহ ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা বা কৌশলপত্র ঠিক করা হয়।

আমরা যদি জনগণের প্রকৃত চিন্তাভাবনা ও ধারণা বুঝতে না চাই, তাহলে সেটি ভিন্ন আলাপ। তাহলে যেমন চলছে, তেমনিই চলতে পারে এবং আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘অভিবাসী কূটনীতি’র মাধ্যমে ভালো কলামিস্ট খুঁজে একটা কাউন্টার ন্যারেটিভের আয়োজন করতে পারে। তবে মনে রাখা ভালো, বিদেশ থেকে যারা সরকারবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছে, তাদের অতি অভিনয়সমৃদ্ধ লেখা বা কথা মানুষ বিশ্বাস করছে কি না, তা-ও বোঝা যাবে একটা সমীক্ষা করলে। বিদেশ থেকে নেতিবাচক প্রচারণা দেশ ও সরকারের ভাবমূর্তি ধ্বংস করছে কি না, তা ভালো করে বোঝা যাবে।

সমীক্ষা আসলে করতেই হবে, যদি আমাদের দূরদৃষ্টি থাকে। তার কারণ, ভোটের ফলাফলের অর্থ এই নয় যে মানুষ আমাকে পছন্দ করে। ভোটের রাজনীতির মাধ্যমে ভোটে জেতা যায়, কিন্তু জনগণের মনস্তত্ত্ব বোঝা যায় না। গণমাধ্যমে গণমানুষের যেসব চিন্তা প্রকাশিত হয়, তা একটি পণ্যায়িত রূপ (প্যাকেজিং)। খবর সংকলন করে মানুষের প্রকৃত ভাবনা জানা যায় না।

ভালো কলামিস্ট খুঁজে পেলেও তাঁদের লেখা কাজে আসবে না, যত দিন আমরা বাস্তবতাকে আমলে না নিয়ে এগোব। কোনো রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সব কাজ বা সেবা শতভাগ ইতিবাচক হয় না। ভুল রয়েই যায়, সজ্ঞানে বা অবচেতন মনে। আমাদের ভালো কাজ ও ভুলগুলো চিহ্নিত করাই হচ্ছে ভাবমূর্তি ব্যবস্থাপনার প্রথম পদক্ষেপ। এটি একটি সাধারণ জ্ঞান যে গাছের মূলে পুষ্টির অভাব থাকলে ফলন ভালো হয় না।

একজন ব্যক্তির কথাই উদাহরণ হিসেবে দেওয়া যায়। আমি নামের ব্যক্তি আমার আশপাশে, সমাজে যোগাযোগমাধ্যমে কী ব্যক্ত করি? আমি যা চিন্তা করি, তারই বাহ্যিক প্রকাশ ঘটে। আমার চিন্তা ইতিবাচক হলে প্রকাশিত হয় ইতিবাচক এবং নেতিবাচক হলে প্রকাশিত হয় ঠিক তেমন। প্রচারণার মাধ্যমে ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা একটি মনের খেলা। এ খেলা অর্থপূর্ণভাবে তখনই খেলা যায়, যখন গোড়ায় নজর থাকে। ভিত্তি শক্ত থাকলে কোনো আরোপিত নেতিবাচক প্রচারণা ক্ষতি করতে পারে না।

গোড়া শক্ত করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ পরিকল্পনা অত্যন্ত স্বল্পমেয়াদি ও আবেগনির্ভর সিদ্ধান্ত। ‘অভিবাসী কূটনীতি’ নিয়ে এগোনোর যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গণযোগাযোগ বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের জন্য কেস স্টাডি হিসেবে পড়ানো হতে পারে।

  • ইকরাম কবীর গল্পকার এবং যোগাযোগ পেশায় নিয়োজিত

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন