
রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো কাজ করছে না। জুলাইয়ের ২৯ তারিখের পর থেকে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে মাঠে নেমে যে অভিনব কাজগুলো করেছে, তা আমাদের এই জানা কথাকে দিনের আলোর মতো আরও পরিষ্কার করে দিয়েছিল। স্মার্টফোন আর ভিডিওর যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেগুলো ছড়িয়ে পড়ার ফলে অচল ব্যবস্থার চিত্র সবার সামনে উন্মোচিত হচ্ছিল।
যে ঘটনা থেকে শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলনে নেমেছিল, তা ছিল ছুটির পর দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর বাস উঠে যাওয়ার ফলে দুজনের মৃত্যু। সহপাঠীদের এই করুণ মৃত্যুতে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রথম প্রতিবাদে পথে নেমে আসে। পুলিশ বল প্রয়োগ করে তাদের পথ থেকে সরিয়ে দিতে চায়। পরদিন নেমে আসে আরও অন্যান্য স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের এই বিক্ষোভ-আন্দোলন চলে ছয় দিন।
আন্দোলনের ষষ্ঠ দিনে পুলিশ ও পুলিশের সহযোগী হেলমেট বাহিনী শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিসোঁটা ও পিস্তল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আক্রমণের প্রমাণ নিশ্চিহ্ন করতে ফটোসাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ করা হয়। উপস্থিত কাউকে মুঠোফোনে ছবি তুলতে দেওয়া হয়নি, তাঁদের আঘাত করা হয়েছে, কারও কারও ক্যামেরা ও ফোন কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে। দায়িত্বরত নারী সাংবাদিকদের যৌন হয়রানি করা হয়েছে। প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোর বড় অংশ আন্দোলনের সংবাদ প্রচার করেনি।
স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনকালে সরকারি গাড়ি, পুলিশের গাড়ির কাগজপত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা করে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখতে পায় যে গাড়িগুলোর কাগজপত্র নেই এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সও নেই। একই সঙ্গে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে ইমার্জেন্সি লেন তৈরি করে এবং গাড়ি, রিকশাকে আলাদা আলাদা লাইনে নিয়ে এসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করে। অভিভাবক ও শিক্ষকদের অনেকে তাদের সঙ্গে এসে যোগ দেন।
সরকার একদিকে আন্দোলনটির যৌক্তিকতা স্বীকার করেছে, অন্যদিকে যেকোনোভাবে আন্দোলনটি থামাতে চেয়েছে। ফলে তারা আগস্টের ২ তারিখে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েছিল, কিন্তু সরকারের কথা ও কাজে অসংগতি দেখে শিক্ষার্থীরা ওই দিনও পথে নেমে আসে। ওই দিন মিরপুরে পুলিশসহ সরকারি দলের লোকজন শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেন। পরদিন জিগাতলার কাছে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস ক্যাম্পাসে একদল লোক হামলা করে।
এই সব হামলার ঘটনায় আমরা দেখিনি সরকার কাউকে গ্রেপ্তার করেছে। উল্টো দেখা যায়, যাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের পক্ষে কথা বলেছেন বা ৪ তারিখে জিগাতলায় হতাহত ব্যক্তিদের সাহায্যের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন, তেমন ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে, পরে জেলখানায় পাঠানো হয়েছে। এমনকি অন্তঃস্বত্তা নারীও এ থেকে বাদ যাননি। অনেক শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়।
৫ ও ৬ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পথে নেমে আসে। ৫ তারিখ রাত ১০টায় সাদাপোশাকে ২৫-৩০ জন লোক খ্যাতিমান আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে তাঁর বাসা থেকে তুলে নিয়ে যান। তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় সিসি ক্যামেরায় কালো টেপ মেরে দেন এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত হার্ডড্রাইভ নিয়ে যান। এই সব দেখে প্রশ্ন জাগে, তাঁকে কি অপহরণ করার পরিকল্পনা ছিল? উল্লেখ্য, শহিদুল আলম ৫ আগস্ট আল-জাজিরায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রসঙ্গে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করেছিলেন।
পরদিন ৬ আগস্ট শহিদুল আলমকে নিম্ন আদালতে হাজির করা হয় এবং ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা করা হয়। অভিযোগ করা হয়, তিনি ফেসবুকে গুজব ছড়িয়ে আন্দোলনে উসকানি দিয়েছেন। এর প্রমাণস্বরূপ মামলার এফআইআরে ৫টি ওয়েব লিংক দেওয়া হয়। তবে ফেসবুকে তাঁর দেওয়া বক্তব্য হিসেবে এফআইআরে যা উদ্ধৃত হয়েছে, তা হুবহু শহিদুল ফেসবুকে তো নয়ই, এমনকি আল-জাজিরার সাক্ষাৎকারেও বলেননি।
একজন সাংবাদিক ও শিক্ষক হিসেবে শহিদুল আলম সরকারের সমালোচনা করার এখতিয়ার রাখেন। এই সমালোচনাকে কোন যুক্তিতে গুজব ছড়িয়ে উসকানি দেওয়া বলা হচ্ছে, তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে, শহিদুল আলম ৪ আগস্ট বিকেল পাঁচটার আগে ফেসবুকে কোনো পোস্ট দেননি। মনে রাখা প্রয়োজন, ৪ আগস্ট জিগাতলার ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল বেলা দুইটা নাগাদ।
কিন্তু বিকেল পাঁচটার পরের পোস্ট ও লাইভ স্ট্রিম থেকে কীভাবে আগের সময় দুপুরের ঘটনার উসকানি দেওয়া সম্ভব, সেই প্রশ্ন ইতিমধ্যেই সাংবাদিকেরা তুলেছেন। তিনি ৪ আগস্ট ১০ বার লাইভ স্ট্রিমে এসেছিলেন আর ওই লাইভ স্ট্রিমগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আসলে শহিদুল আলম সেখানে ওই দিনের বিকেল পাঁচটার পরের ঘটনাবলির চাক্ষুষ সাক্ষ্যপ্রমাণ রেখেছিলেন। ওই লাইভ স্ট্রিমগুলো ও পরদিনের পোস্টগুলো সাক্ষ্য দেয় যে সরকার-সমর্থিত ছাত্র ও যুব সংগঠনের কর্মীরা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বলে ও স্কুলড্রেস পরে সহিংসতার জন্য জড়ো হয়েছিলেন এবং হেলমেট পরে রামদা, লাঠি হাতে আক্রমণ করেছিলেন।
শহিদুল আলমকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরদিন ৬ তারিখ যখন তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়, তখন আমরা দেখলাম, তিনি খালি পায়ে, কয়েকজন মিলে তাঁকে ধরে আনছেন এবং তিনি খুঁড়িয়ে হাঁটছেন। তিনি সাহসের সঙ্গে ক্যামেরায় চোখ রেখে বলতে থাকেন যে তাঁকে আহত করা হয়েছে, তাঁর রক্তমাখা পাঞ্জাবি ধুয়ে আবার পরতে বাধ্য করা হয়েছে। তিনি যখন এই সব বলছিলেন, তখন তাঁর মুখ চেপে ধরা হয় এবং কয়েকজন চাপাচাপি করে তাঁকে গাড়িতে ঢুকিয়ে দেন। এই সবকিছুরই ধারণকৃত ভিডিও আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছি।
আইন-আদালত ও রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে শহিদুল আলমকে আদালতে যথাযথভাবে হাজির না করেই এবং তাঁর আইনজীবীদের না জানিয়ে যেদিন আদালতে হাজির করার কথা, তার আগের দিনই জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। শুধু কথা বলার অপরাধে তাঁকে সাত দিনের জন্য রিমান্ডে দেওয়া হয়, দৈহিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয় এবং জেলে পুরে রাখা হয়। অথচ আসল অপরাধীরা, আন্দোলনকারীদের ওপর হেলমেট পরে আক্রমণকারীরা ও কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর হাতুড়ি নিয়ে আক্রমণকারীরা, সংঘবদ্ধভাবে যৌন হয়রানি বা আক্রমণকারীরা নিরাপদে, নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে সরকার কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়নি। দেখে-শুনে প্রশ্নের উদ্রেক হয়, আইন-আদালত বলে কি কিছু আছে এখানে?
বিশ্বব্যাপী শহিদুল আলমের মুক্তির জন্য আওয়াজ উঠেছে। অনেক স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি শহিদুল আলমসহ আন্দোলনকারীদের মুক্তির দাবি তুলেছেন। গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র বাক্স্বাধীনতার পক্ষে যখন বিশ্বব্যাপী সবাই সোচ্চার, তখনো সরকারের কোনো ভাবান্তর দেখা যাচ্ছে না। বরং প্রতিহিংসা ও একগুঁয়েমির আলামতই প্রকট। আমরা অবিলম্বে শহিদুল আলমসহ আটক আন্দোলনকারীদের মুক্তি এবং সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানাই। আমরা দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ চাই।
আনু মুহাম্মদ, নাসিম আখতার হোসাইন, রায়হান রাইন, মির্জা তাসলিমা, আইনুন নাহার, সাঈদ ফেরদৌস, স্বাধীন সেন, মানস চৌধুরী, মাহমুদুল সুমন, রায়হান শরীফ, পারভীন জলী, নাসরিন খন্দকার, শরমিন্দ নিলোর্মী, সীমা হক, সায়েমা খাতুন, সাহিদ সুমন, ফাহিমা আল ফারাবী, হিমেল বরকত, শামীমা সুলতানা, মোজাম্মেল হক, মাসউদ ইমরান, খন্দকার হালিমা আখতার, সাজ্জাদ সুমন, আনোয়ারুল্লাহ ভূঁইয়া, মো. মোজাহিদুল ইসলাম
লেখকবৃন্দ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক