পার্লামেন্ট নির্বাচন ঘিরে তেহরানে উদ্বেগ

রয়টার্স ফাইল ছবি।
রয়টার্স ফাইল ছবি।

ইরানে ২০২০ সালে অনুষ্ঠেয় পার্লামেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতি ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি এ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ করা হবে। প্রায় ১৬ হাজার মানুষ পার্লামেন্টের ২৯০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য নিবন্ধন করেছেন।

আসন্ন নির্বাচন ইরানের শাসনকালের ভবিষ্যতের জন্য একান্ত গুরুত্ব বহন করে। যদিও অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের বলছে যে এই নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে না। ইরানের নেতৃত্ব তাদের প্রতি অভিজাতদের আনুগত্য প্রমাণ করার এবং জনসাধারণের সমর্থন ও গণতান্ত্রিক বৈধতার বিভ্রম তৈরির জন্য দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। এবং এই সময়ে ইরানের শাসকেরা আগের চেয়ে আরও বেপরোয়া দেশে ও বিদেশে তাঁদের নিন্দুকদের এটা দেখানোর জন্য যে তাঁরা ইরানি জনগণের ইচ্ছাকে প্রতিনিধিত্ব করেন।

গত ১৫ নভেম্বর ইরানের সরকার জ্বালানির দাম ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধির ঘোষণা দেয়, কারণ, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি তীব্র মন্দায় পড়েছে। এর প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। ইরানের ৩১টি প্রদেশের মধ্যে ২৯টিতে এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা নেতাদের অবিলম্বে পদত্যাগ করার দাবি জানান। বিক্ষোভকারীদের বিষয়ে সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল নির্মম। তারা সহিংস উপায়ে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা করেছে। সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা উল্লেখ করেনি, তবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে যে তারা কমপক্ষে ৩০৪ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত করেছে।

দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার আগেই কট্টরপন্থী এবং তথাকথিত মধ্যপন্থী নেতাদের কর্মকাণ্ডে হতাশ হয়ে বহু ইরানি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে সহিংসভাবে দমন করার প্রশাসনের প্রচেষ্টা, আরও বেশি মানুষকে ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। ফলে ২১ ফেব্রুয়ারিতে ব্যতিক্রমীভাবে কম ভোটার হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

এটি ইরানের বর্তমান সরকারের জন্য একটি প্রধান উদ্বেগের বিষয়, বিশেষত এমন সময়ে, যখন এর জনপ্রিয়তা হ্রাস পাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে একটি নজিরবিহীন চাপের মুখে রয়েছে। এমনকি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সাপ্তাহিক পত্রিকা সুভ-ই সাদিক তার সর্বশেষ সংস্করণে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে যে নির্বাচনে বেশিসংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সর্বোচ্চ চাপের কৌশলের বিরুদ্ধে এই সরকারকে জয়ী করতে সহায়তা করতে পারে।

ভোটারদের আকৃষ্ট করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা, যেখানে ইরানের নাগরিকেরা দেশ পরিচালনকারী অভিজাতদের চেয়ে তাদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী প্রার্থীদের ভোট দিতে পারবে। যদিও একটি নিপীড়নমূলক শাসনব্যবস্থার পক্ষে ভোটারদের একটি ভাঁওতাবাজির নির্বাচনে আনাটা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ, তবে ইরানের নেতাদের কাছে এখনো কিছু বিকল্প রয়েছে।

তাঁরা ভোটার সংখ্যা বাড়ানোর জন্য বাসিজ মিলিশিয়া সদস্যদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আদেশ দিতে পারে। বাসিজ মিলিশিয়া ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের একটি বাহিনী, যা বর্তমান শাসকদের প্রতি অনুগত তরুণ স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বয়ে গঠিত। এ ছাড়া তাঁরা তাঁদের প্রচার যন্ত্রগুলোকে ব্যবহার করে বিশ্বকে এটা বোঝানোর চেষ্টা করতে পারেন যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরানি নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। বিভ্রান্ত ভোটারদের আকৃষ্ট করতে শাসকেরা একটি নতুন কৌশল প্রবর্তন করতে যাচ্ছে: ইরানিদের কাছে কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই—এমন পুরোনো ও প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদদের পরিবর্তে তরুণ, স্বল্প পরিচিত সমর্থকদের নির্বাচনে মনোনয়ন দিচ্ছে।

১ ডিসেম্বর, ইরানের কট্টরপন্থীদের মূল সংগঠন রেভল্যুশনস সাপোর্টারস কোয়ালিশন কাউন্সিল তার তরুণ সমর্থকদের ২০২০ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে নিবন্ধন করতে নির্দেশ দিয়েছে। আইআরজিসির সাবেক কমান্ডার ও তেহরানের সাবেক মেয়র জেনারেল মোহাম্মদ কালিবাফও তাঁর তরুণ সমর্থকদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য উত্সাহিত করেছেন। তিনি নিজেও আসন্ন নির্বাচনের একজন প্রার্থী। তাঁর তরুণ সমর্থকেরা তাঁর আহ্বানে দ্রুত সাড়া দিয়েছেন এবং নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছেন।

জনগণের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ আড়াল করার জন্য তরুণদের উদ্বুদ্ধ করার ধারণাটি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির কাছ থেকেই এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের ৪০তম বার্ষিকী উপলক্ষে খামেনি ‘বিপ্লবের দ্বিতীয় পর্ব’ শিরোনামে একটি নতুন ইশতেহার জারি করেন। এতে তিনি ‘বিপ্লবী যুবকদের’ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন এবং জোর দিয়ে বলেন, কেবল তরুণ ইরানিরা বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।

কয়েক মাস পর মে মাসে শাসকপন্থী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের সঙ্গে বৈঠককালে তিনি আবারও রাজনীতিতে যুবকদের অংশগ্রহণের গুরুত্বকে তুলে ধরেন এবং তাঁর তরুণ সমর্থকদের ‘একটি তরুণ ও ধার্মিক সরকার গঠনের ভিত্তি প্রস্তুত করতে’ বলেন।

অবশ্যই, ইরানের যুবকদের রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ নেতার আহ্বান সব তরুণের জন্য নয়।

গার্ডিং কাউন্সিল নামে ১২ সদস্যের একটি কমিটি ইরানের নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী যাচাই করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। এই কাউন্সিল বছরের পর বছর ধরে পার্লামেন্টের ওপর শাসকদের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে, শাসকদের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন এমন কাউকে প্রার্থী হতে দেয়নি। এবারও কাউন্সিল তা–ই করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

তবে কৃত্রিমভাবে ভোটারের সংখ্যা বাড়ানো এবং ইরানিদের এমন একটি নির্বাচনে অংশ নিতে রাজি করানোর জন্য এই প্রশাসনের কৌশলগুলো কাজ না–ও করতে পারে।

গত চার দশকে জনগণ ও সরকারের মধ্যে ব্যবধান ধীরে ধীরে আরও বেড়েছে এবং ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটি তার বেশির ভাগ সমর্থন ভিত্তিকে হারিয়েছে। বিপ্লবের পরপরই ইরানের শাসনব্যবস্থা উচ্চবিত্ত শ্রেণিকে চটিয়ে দেয়। পরে মধ্যবিত্তরাও সরকার থেকে দূরে সরে যায়। ২০১৭ সাল থেকে নিম্নবিত্ত শ্রেণি, যারা ঐতিহ্যগতভাবে ইরানের শাসনব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য সমর্থন ভিত্তি গঠন করেছিল, তারাও এই ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। যত দিন যায় ততই ইরানিরা বুঝতে পারে যে সরকার তাদের প্রতিনিধিত্ব করে না।

ইরানি জনগণ এমন নেতৃত্ব চায়, যারা কিনা তাদের ইচ্ছাকে সম্মান করবে এবং তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে। যতক্ষণ না ইরানি নেতারা এ বিষয়টি বুঝবেন এবং অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন না করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত ইরানি জনগণ এবং শাসকদের মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়তে থাকবে, বিক্ষোভ অব্যাহত থাকবে এবং আসল ভোটারের সংখ্যা কমই থাকবে।

আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত
সাঈদ গোলকার: নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির প্রভাষক