হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা

শনিবার পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮২; মারা গেছে ৩০ জন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হয়ে গেছে। সরকারি তথ্য বলছে, ঢাকার বাইরে ২২টি জেলায় সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। ফেলে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাই শুধু গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েনি, অর্থনীতিসহ জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রই বিরাট সংকটের মুখে পড়ে গেছে।

তাই এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য হোল গভর্নমেন্ট অ্যাপ্রোচ বা পুরো সরকারের সমন্বিত তৎপরতার সঙ্গে সঙ্গে বেসরকারি খাত, এনজিওসহ পুরো সমাজেরও সক্রিয়তা জরুরি। এই মুহূর্তের এবং সামনের দিনগুলোর প্রধান অগ্রাধিকার যেহেতু মানুষ বাঁচানো, সেহেতু সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করার দিকে প্রধান মনোযোগ নিবদ্ধ করতে হবে।

খবর আসছে, করোনা রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ বাড়তে শুরু করেছে। কিন্তু এসব রোগীর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য দেশব্যাপী প্রস্তুতি এখনো সম্পন্ন হয়নি। পৃথক হাসপাতালের ব্যবস্থা করা হয়েছে বটে, কিন্তু সেগুলো শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ। ঢাকার বাইরে সরকারি হাসপাতালগুলোতে যেসব আইসোলেশন ইউনিট খোলা হয়েছে, সেগুলোতে করোনা রোগীর কার্যকর চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। তাহলে ঢাকার বাইরে সারা দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার কী হবে?

ঢাকায় যে ৯টি হাসপাতাল শুধু করোনা রোগী চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে, সেগুলোর মোট শয্যাসংখ্যা ১ হাজার ৩৩০। বস্তুত এটাই এখন পর্যন্ত গোটা বাংলাদেশের করোনা রোগী চিকিৎসার সক্ষমতা। এটা একেবারেই অপ্রতুল; হাসপাতালের সংখ্যা অবশ্যই আরও বাড়াতে হবে। করোনা সংক্রমণ যেহেতু জাতীয় দুর্যোগে পরিণত হয়েছে, তাই দেশের চিকিৎসা খাতের পুরো সক্ষমতাকে এক করা জরুরি হয়ে পড়েছে। সিএমএইচ, পুলিশ হাসপাতালসহ বিভিন্ন বাহিনীর যে চিকিৎসা সামর্থ্য রয়েছে, তা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও করোনা সংক্রমিতদের চিকিৎসায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার ইনটেনসিভ কেয়ার বা নিবিড় পরিচর্যা ব্যবস্থাও বাড়াতে হবে; বাড়াতে হবে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস যন্ত্রের (ভেন্টিলেটর) সংখ্যা। করোনা রোগীদের গুরুতর অবস্থায় ভেন্টিলেটর ছাড়া জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয় না।

হাসপাতালগুলোর অবকাঠামো ও লজিস্টিকসের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে চিকিৎসক ও নার্সদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সুরক্ষার ঘাটতিও আমলে নেওয়া জরুরি। কেননা, ইতিমধ্যে চিকিৎসকদের মধ্যে এটা নিয়ে অসন্তোষ লক্ষ করা গেছে। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা বলছে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে অন্তত ১০০ জন চিকিৎসক ও নার্সের মৃত্যু ঘটেছে, শুধু ইতালিতেই সংখ্যাটি ৬০। ইন্দোনেশিয়ায় মারা গেছেন ১৮ জন চিকিৎসক। সুতরাং আমাদের চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ করতে হবে, এর কোনো বিকল্পই নেই। করোনা হাসপাতালগুলোকে এক বিশেষ জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে; তাই এগুলোর সার্বিক সুব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

করোনা হাসপাতালগুলোর ওপর সম্ভাব্য অতিরিক্ত চাপ এড়ানোর একটা উপায় এই রোগের বিস্তার ঠেকানো। সে জন্য সঙ্গনিরোধ ও সামাজিক দূরত্ব বজায় ও বিচ্ছিন্নকরণের ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে। এসব ব্যবস্থা জোরদার করলে সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে পারবে না। ফলে হাসপাতালগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে না।