শাহেদ আলীকে যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল

শাহেদ আলী
শাহেদ আলী

অভিনেতা শাহেদ আলীকে অনেকেই চেনেন। অভিনেত্রী দীপা খন্দকারের সঙ্গে জীবনের জুটি বেঁধেছেন। দুই শিশুসন্তান তাঁদের। এটুকু বলে নিতে হলো শাহেদ আলী ও তাঁর বোনের অসম্ভব মনের জোর আর ভালোবাসার গল্পটা বলার জন্য। তাঁরা যা করেছেন, তা সাধারণ মানুষ সাধারণত করে না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি অসাধারণ, অসাধারণ মানুষদেরই এখন এগিয়ে আসার সময়।

সব ঠিক ছিল শাহেদ আলীর। ‘বধূ শুয়ে ছিল পাশে—শিশুটিও ছিল; প্রেম ছিল, আশা ছিল—জ্যোৎস্নায়—তবু সে দেখিল কোন ভূত?’ সব ঠিক থাকার পরও তিনি হাসপাতালে দৌড়ালেন। কারণ, তাঁকে ভালোবাসার ভূতে কামড়েছে। তিনি একা নন, সঙ্গে তাঁর বোন।

তাঁদের মামা অসুস্থ। মামার সন্তানেরা ছোট বলে দুই ভাগনে–ভাগনিই সব করেছেন। এই মামা ছোটবেলা থেকে তাঁদের পড়িয়েছেন। তাঁদের কাছে অসাধারণ আদর্শ মানুষ তিনি। তাঁকে নিয়তির হাতে ছেড়ে দিতে পারেননি। অনেকে পারেন, তাঁরা পারেননি। চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য সংগ্রাম করেছেন।

এক শব্দে বলা ‘সংগ্রাম’ দিয়ে কিছুই বোঝায় না। এই ভয়ের জঙ্গল হয়ে থাকা নিস্তেজ শহরে অসুস্থ স্বজনকে হাতপাতালে ভর্তি করানো, তাঁর সেবা–চিকিৎসা যাতে হয়, তার জন্য হাসপাতালের স্তরে স্তরে মাথা কোটা, প্রাণের ঝুঁকি পেছনে সরিয়ে মানুষটাকে বাঁচানোর কোনো কাজে পিছপা না হওয়া, আর প্রতিমুহূর্তে নিজের স্ত্রী–সন্তানের মুখ মনে পড়া—কোনো বর্ণনাই এর জন্য যথেষ্ট না, যদি না কারও নিজের সেই অভিজ্ঞতা হয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিউমোনিয়ার লক্ষণ নিয়ে তাঁকে ভর্তি করানো হয়। ১০ তারিখ সন্ধ্যায় তাঁর থেকে করোনা টেস্টের স্যাম্পল নেওয়া হয়। পরদিন দুপুরে তিনি মারা যান। রিপোর্টের ফল জানতে জানতে পরদিন সকাল হয়ে যায়। জানা যায় মানুষটার করোনা হয়েছিল। এই পুরো সময় মামার সঙ্গে ছিলেন শাহেদ ও তাঁর বোন। সাবধানতা যতটা পারা যায়, করেছেন। বোনের স্বামী–সন্তান আছেন। নিজের দুই সন্তানের সঙ্গে তাঁরা থাকছেন এক বাসায়। আর ভাইবোনে লড়ছেন মামাকে বাঁচাতে।

পরিণাম আমরা জানি না। যা ছিল স্বাভাবিক, যা ছিল মানুষের মানুষ থাকার শর্ত—সেটাও চোখের পলকে কতটা কঠিন, তা আজকের শিশুরাও মনে হয় বুঝে গেছে। এই দুই ভাইবোনও সেটা জানতেন। শাহেদ আলীর স্ত্রী অভিনেত্রী দীপা খন্দকারও জানতেন। যে মা এখন দুই ছেলেমেয়ের কোয়ারেন্টিনে খাবার–সঙ্গ সবকিছু দিচ্ছেন, ঝুঁকি নিয়ে, তিনিও জানতেন। যে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন, সেই কঠিন সিদ্ধান্তটি তবু তাঁরা নিতে পেরেছেন।

পরিণাম আমরা জানি না। যা ছিল স্বাভাবিক, যা ছিল মানুষের মানুষ থাকার শর্ত—সেটাও চোখের পলকে কতটা কঠিন, তা আজকের শিশুরাও মনে হয় বুঝে গেছে। শাহেদ বলছিলেন ফোনে, ‘মৃত্যুর ঘটনার চাইতে, জানেন, সবাই টেস্টের ফল জানতে বেশি আগ্রহী।’


তাঁরা হয়তো জানতে চান, জীবিত ও মৃত অবস্থায় ওই মানুষটি নিরাপদ কি না। তাঁরা তাঁদের জীবনের ঝুঁকি পরিমাপ করতে চান। খুবই যৌক্তিক ও মানবিক। কিন্তু এ রকম যুক্তির শাসন মানলে কোনো দিন সভ্যতা এগোত না, মুক্তিযুদ্ধ করা সম্ভব হতো না, সমাজ টিকে থাকত না। সাবধানতা মানে মানুষকে নিয়তির করুণ কঠিন হাতে সোপর্দ করা নয়—শাহেদেরা ভেবেছেন।

সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত আসতে আরও অপেক্ষা করতে হয়েছিল। মানুষটি মরে গেলেও এক রাত মর্গে পড়ে থাকেন, কারণ ছাড়পত্র আসেনি। ছাড়পত্র আসেনি, কারণ করোনা পরীক্ষার ফল হাতে আসেনি। যখন এল, তখনো অনেক কাজের মধ্যে এ কাজটি জরুরি মনে হয়নি কর্তৃপক্ষের।

সবশেষে যখন লাশ হাতে পেলেন, তখন কোথায় যাবেন? এলাকায় নেওয়া যাবে না, তাহলে? মারকাজুল ইসলামের স্বেচ্ছাসেবীরা দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁরা হয়তো জুরাইন গোরস্থানের কোনো অচিহ্নিত স্থানে তাঁকে কবর দিয়ে আসবেন। পরে কেউ জানবে না, কোথায় শায়িত আছেন মানুষটি! কী করবেন তিনি?

কঠিন সিদ্ধান্তটি তখন নিলেন শাহেদ। মারকাজুলের আটজনের সঙ্গে নবম ব্যক্তি হয়ে মরদেহ নিয়ে গোরস্থানমুখী যাত্রা করলেন। স্বেচ্ছাসেবীরাও তাঁকে সাবধান করেন। কিন্তু তিনি সময়ের এই শবযাত্রায় না–থাকার মানসিক কষ্ট নিতে চাননি। 'ক্ষতি হলে পরে মেনে নেব'—এই মন নিয়ে তিনি মামাকে কবর দিতে যান।

না গেলে কী হতো? করোনা রোগীর সেবা করায় ঝুঁকি, লাশ দাফনেও ঝুঁকি। নিজের স্ত্রী–সন্তান আছে না?

তবু গেলেন। তাঁর ভাষায়, ‘এত আপন, এত মহৎ একটা মানুষ, তাঁর জানাজা হবে না? পরিবারের কেউ সেখানে থাকবে না? কবরটা চিনবার উপায় থাকবে না?’

যুদ্ধের সময়, বন্যা বা ভূমিকম্পের সময় এমন সাহসকে বীরত্বের মর্যাদা দেওয়া হতো, এমন মানুষকে মহাপ্রাণ ভাবা হতো। কিন্তু এখন করোনাভাইরাসের সঙ্গী হয়েছে ভয়ের ভাইরাস, মজ্জাগতভাবে যা অমানবিক ও অসামাজিক। এই ভয়ের কারণে, করোনা–বিপন্ন মানুষের পাশে মানুষ দাঁড়াতে পারছে কম। তাতে করোনাই বরং ফাঁকা মাঠ পেয়ে যাচ্ছে। শাহেদরা এভাবে মাঠ ছাড়তে পারেননি।

কিন্তু সমাজ? এই সমাজের ভয়ে অসুস্থ মাকে পিকআপে তুলে কোথাও রাখার জায়গা খুঁজতে বের হন সন্তানেরা। এই সমাজের ভয়ে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরতে বাধা পান চিকিৎসক। এই সমাজের ভয়ে প্রবাসীদের বাড়িতে হামলা হয়। সমাজ কোথায়, 'এলাকাবাসী'। এলাকাবাসীর বাধায় করোনা হাসপাতালের কাজ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। অন্য সমাজ হলে হোম কোয়ারেন্টিনে কলঙ্ক জড়িত করা হতো না। সুরক্ষা পোশাক, সাবধানতার মধ্যেও মানুষ মানুষকে অন্যভাবে সাহায্য করত। চীনে তা হয়েছে, ইতালিতে তা হচ্ছে। কারণ, তারা তাদের সমাজটাকে রক্ষা করতে পেরেছে, তাদের রাষ্ট্র সমাজকে বাঁচাতে যথাসাধ্য করছে। কিন্তু যে জীবন চীনের বা ইতালির বা কিউবার; তার সঙ্গে আমাদের হয়নিকো দেখা।

তারপরও শাহেদরা আছেন। সদ্য মৃত ডা. মঈন উদ্দিনের মতো অজস্র চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী আছেন, ত্রাণ বিতরণ করে যাওয়া অজস্র তরুণ আছেন।

মানুষের সহজাত কিংবা জন্মগত প্রবৃত্তি অন্য প্রাণীর মতোই—আপন অস্তিত্বের সুরক্ষা। এর পরের প্রবৃত্তি হলো নিজের প্রজাতির সুরক্ষা। নিজের বাঁচার শর্ত হলো অন্যের বাঁচা। তেমনি অন্যের জীবনের শর্ত হলো নিজের জীবনের সুরক্ষা। বৈষম্য ও হিংসার সমাজে 'নিজ' ও 'প্রজাতি' তথা ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যে বিরোধ লাগিয়ে রাখা হয়। নিয়মটা হয়ে যায় উল্টা। 'নিজে বাঁচলে বাপের নাম' সেই সমাজেরই প্রবাদ। অথচ ঘটনাটা আগুন লাগার মতোই, প্রতিবেশীর বাড়ির আগুন নেভানো গেলে নিজের বাড়িটাও বাঁচে। তেমনি এই সময়ে আপনি যদি একজনকে রক্ষায় এগোলেন—যে পথে এগোলেন, সেই পথটা তখন বড় হয়, আরও অনেকে সেই পথে হাঁটে, আরও অনেকের সুরক্ষার শর্ত তখন জোরদার হয়। অনেক 'এক' মিলে তখন অসংখ্য হয়।

অনেক সময় বুঝে বা না বুঝে, প্রজাতির সুরক্ষাকে নিজের সুরক্ষার শর্ত ভাবি না। আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা ব্যক্তিকেন্দ্রিক, বাহির কেন্দ্রিক, বাজার ও বিনোদনকেন্দ্রিক। তাই এখন যখন ঘর, সমাজ ও দুঃখ বড় হয়ে গেছে, তখন দেখি ঘর যথেষ্ঠ না, একা একা থাকা যায় না, দুঃখ দূর করার ব্যবস্থা নেই। সব মানুষ আমরা একই প্রজাতির, একই ভাইরাস আমাদের হুমকি, একসঙ্গে মোকাবিলা করেই আমরা বাঁচতে পারি—করোনা বুঝিয়ে যাচ্ছে। করোনা মোকাবিলায় আমাদের হাত ধুতে হয়, মনটা ধুয়ে নিলে বোঝা যেত কিছু ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ৯৯ ভাগ মানুষকে বাঁচানোর শর্ত আমাদের হাতেই, যদি আমরা যার যার জায়গা থেকে সামান্য করে হলেও অবদান রাখি।

আর শাহেদ ও তাঁর বোনের হোম কোয়ারেন্টিনের সময়টা যেন ভাল কাটে, তাঁরা যেন নিরাপদ থাকেন, সেই কামনা করি।

ফারুক ওয়াসিফ: লেখক ও সাংবাদিক