বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কিন্তু মামলাটির কজ অব অ্যাকশন ছিল না বলে কেউ কেউ মনে করেন। তার মূল কারণ—আমরা যদি বাংলাদেশের দণ্ডবিধি আইন, ১৮৬০–এর ৪৯৯ ধারা লক্ষ করি, এবং তা পড়ে বা দেখে যা বোঝা যায়। মানহানির মামলা দায়ের করতে হয় সেই ব্যক্তির দ্বারা আসামির কোনো লেখন বা বচনে প্রকৃত অর্থেই যার সম্মানহানি ঘটেছে। অর্থাৎ সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মানহানির মামলা করার অধিকার রাখে। তবে কিছু ব্যতিক্রম আছে যদি কোনো কোম্পানি বা বিশেষ শ্রেণির ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যেমন ডাক্তার বা আইনজীবী কিংবা প্রকৌশলী হন, সে ক্ষেত্রে কেউ যদি মানহানির বক্তব্য প্রদান করেন। অর্থাৎ তাঁদের পক্ষে যে কেউ মানহানির মামলা দায়ের করতে পারেন।

‘হাই প্রেশার টু’ নাটকে মোশাররফ করিম ও তাঁর সহ-অভিনেতারা আইনজীবী ও তাঁদের পেশা নিয়ে কটাক্ষ করার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। যেহেতু এটি একটি নাটক ছিল এবং নাটকের চরিত্রটি ছিল কমেডি, তাই কোনো ব্যক্তিবিশেষকে কটাক্ষ করা হয়নি। বিশ্বের অনেক দায়ের করা মামলা ও বিচারকদের রায় যদি লক্ষ করি, তাহলে এ ধরনের মানহানির মামলা করার কোনো ভিত্তি নেই। তাহলে এই মর্মে আসা যায় যে কোনো নাটক বা বই-পুস্তক—যা–ই হোক না কেন, কোনো ব্যক্তি টার্গেট না করা হলে মানহানির মামলা করা হালকা হয়ে যায়।

অকারণে কোর্টে বা থানায় মামলা করা থেকে আমাদের সবারই বিরত থাকতে হবে। অন্যথায় অযাচিত এসব মামলার জন্য আদালতে গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো জমে থাকবে এবং অকারণে করা মামলার ফাইল ভারী হবে। নষ্ট হবে আদালতের মূল্যবান সময় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভুক্তভোগীর জীবন।

সম্প্রতি আইনজীবী সাইদুল হক সুমনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাও কজ অব অ্যাকশন–বহির্ভূত। যেখানে একটি অনুষ্ঠানে সাইদুল হক সুমন প্রতিবন্ধী শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। সেখানেও কোনো ব্যক্তিকে টার্গেট করে বলা হয়নি। আইনে সব সময় অপরাধমূলক অভিপ্রায়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়। যার অর্থ হলো, ব্যক্তি খারাপ মনোভাব থেকে কথাটি বলেছেন অর্থাৎ তাঁর খারাপ উদ্দেশ্য ছিল। যেখানে উদ্দেশ্যমূলকভাবে আঘাত করার ইচ্ছা নিয়ে বক্তব্য করাই হয়নি, তা কীভাবে মামলার পর্যায়ে পড়ে, তা বোধগম্য নয়। তাহলে এই বিষয়গুলো দেখে আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে মানুষের বাক্স্বাধীনতার কতটুকু বিপর্যয় ঘটেছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯২(ক)-তে প্রত্যেক নাগরিকের বাক্‌ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলা আছে। বর্তমানে মামলার প্রকৃতি অনুযায়ী যদি বলি, তাহলে মানুষের বাক্‌স্বাধীনতার অবনতি হচ্ছে এবং ৩৯২(ক) ধারার অবমাননা হচ্ছে। মানুষের বাক্‌স্বাধীনতার এই যে অবনতি বা চিন্তা কিংবা স্বাধীনতার যে অবক্ষয়, তা থেকে আমাদের প্রত্যেক নাগরিকের উচিত বেরিয়ে আসা। কেউ কোনো শব্দচয়নের ফলে তার ওপর আক্রমণাত্মক না হয়ে আমাদের উচিত শব্দটি কী কারণে ব্যবহার করা হয়েছে, তার কারণ উদ্‌ঘাটন করা বা কজ অব অ্যাকশন খুঁজে বের করা। আদৌ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে শব্দটি ব্যবহার করেছে কি না তা বের করা।

অকারণে কোর্টে বা থানায় মামলা করা থেকে আমাদের সবারই বিরত থাকতে হবে। অন্যথায় অযাচিত এসব মামলার জন্য আদালতে গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো জমে থাকবে এবং অকারণে করা মামলার ফাইল ভারী হবে। নষ্ট হবে আদালতের মূল্যবান সময় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভুক্তভোগীর জীবন।

এমনিতেই বাংলাদেশের অধস্তন আদালতের সম্মানিত বিচারকগণ মামলার ভারে জর্জরিত। যে পরিমাণ মামলা প্রতিনিয়ত ফাইল হচ্ছে, তা নিষ্পত্তিতে বিচারকের সংখ্যা অপ্রতুল। বাংলাদেশের আপিল বিভাগের বিচারপতি আছেন মাত্র ৫ জন, হাইকোর্ট বিভাগে আছেন ৯৪ জন। অধস্তন আদালতে বিচারক আছেন আনুমানিক ১৮০০ জন। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন প্রেষণে আছেন।

আইন ও বিচার বিভাগের তথ্যমতে, গত বছর দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর আগে নিম্ন আদালতের বিচারাধীন মামলা ছিল প্রায় ৩২ লাখ। করোনা পরিস্থিতির কারণে মামলার নিষ্পত্তি হচ্ছে কম। সেগুলোর মধ্যে বিচারকের অধীনে শুনানি ও বিচারকের জন্য গড়ে দুই হাজারের বেশি মামলা আছে; যা এই দেশের প্রায় ১৭ কোটি জনগোষ্ঠীর চাহিদার তুলনায় খুবই কম। যার কারণে মোট দায়ের করা মামলার তুলনায় মোট নিষ্পত্তি করা মামলার হার খুবই কম। এর ওপর যে হারে ভিত্তিহীন মামলার পরিমাণ বাড়ছে, ফলে ভবিষ্যতে মামলার জট হয়ে দেশের আইন বিভাগ প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

মারুফা গুলশান আরা আইনজীবী

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন