এ গল্পের ভেতরে রাজনীতির কুটিল শিক্ষা আমরা দেখতে পাই। সেই রাজনীতি যদি হয় দুর্বৃত্তায়ন, ক্ষমতাচর্চা ও মোড়লিপনার, তাহলে তো কথাই নেই। স্বাচ্ছন্দ্যে অন্যায় কর্মকাণ্ড চালিয়ে নিতে এখন যদিও বুশের মতো স্বয়ং প্রেসিডেন্টকে এমন কৌশল খাটাতে হয় না, আগেই তাঁর শাগরেদরা সেটি সেরে ফেলেন। আবার এ কৌশলকে একটু ঘুরিয়ে নিলেই ক্ষমতাধর ব্যক্তি বা কাঠামোর বিরুদ্ধে গজিয়ে ওঠা কোনো আন্দোলনকে সহজে দুর্বল করে দেওয়া যায়। এক লাখ লোককে হত্যার চেয়েও একজন বেলুন বিক্রেতার হত্যাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার মতো ইস্যু ঘুরিয়ে দেওয়ার কলকাঠি নাড়ানো হয়। গণতন্ত্রের চর্চাহীন রাষ্ট্রব্যবস্থায় গত এক দশকে প্রায় সব অধিকার আন্দোলন-প্রতিবাদে এমন চেষ্টাই আমরা দেখতে পাই, সেটি রাজপথের আন্দোলন হোক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ হোক। তখন সামঞ্জস্যহীনভাবে এমন সব যুক্তি হাজির করা হয়, মূল বিষয় থেকে সরে গিয়ে সেসব নিয়ে সবাই তর্কবিতর্কে মেতে ওঠে। বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দিয়ে সমাজের চোখে উল্টো দোষী বানানো হয় প্রতিবাদকারীদের।

হাফ পাসের দাবিতে ঢাকায় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের শুরুতেও তাদের দুর্বল করার ‘থিওরি’ নিয়ে হাজির হয় একটি পক্ষ। পাকিস্তানি শাসন থেকে আদায় করা অধিকার নিয়ে স্বাধীনতার ৫০ বছরেও শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামতে হচ্ছে, তার চেয়েও
ওই পক্ষের কাছে গুরুত্ব পেল প্ল্যাকার্ডের বানান ভুল। হাফ ‘পাস’ না হয়ে ‘পাশ’ কেন বা ‘স’ এর বদলে ‘শ’ কেন? শিক্ষার্থীদের দাবি থেকেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল যেন বানান শুদ্ধীকরণ। রাষ্ট্র ও সরকারের বিরাজনীতিকীকরণের প্রকল্পের অংশীদার হচ্ছে সেই পক্ষটি। এ কারণে অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অচলায়তন ভাঙতে দূরেও কোথাও কোনো গান বেজে উঠলে এর কণ্ঠ রোধ করা দায়িত্ব হয়ে পড়ে তাদের। যে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অনাচারের মধ্যে আমরা ঘুরপাক খেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, তার সবচেয়ে সুবিধাভোগীই হচ্ছে তারা। রাজনীতি বা ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ কোনোভাবে হাতছাড়া হয়ে যাক, কোনোভাবেই সেটি চায় না লেজুড়বৃত্তি চালিয়ে যাওয়া পক্ষটি। এর জন্য তখন জরুরি হয়ে পড়ে ‘আইডেনটিটি পলিটিকস’। সেখানে তারাই কুলীন, বাকিরা ব্রাত্য। রাজনীতি ও ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণকারী প্রভুদের তখত ঠিকঠাক রাখতে যেকোনো অধিকার আন্দোলনকে সন্দেহের চোখে দেখা এবং সেটির সঙ্গে যুক্তদের ‘অপর’ হিসেবে চিহ্নিত করাই তাদের কাজ।

এই গোটা বিষয়কে আমরা বলতে পারি বর্ণপ্রথা বা কাস্ট সিস্টেমের নতুন রূপ। বর্ণবিদ্বেষ নিয়ে বুঝতে হলে ভারতের দিকেই আমাদের নজর দিতে হয়। দলিতদের নিয়ে সেখানকার ধর্মবাদী উচ্চবর্ণ গোষ্ঠীর এমন বক্তব্য আপনি শুনতে পাবেন—একজন দলিত ব্যক্তির চেয়েও একটি গরুর জীবন অধিক গুরুত্বপূর্ণ। সমাজে যুগপৎভাবে নিজেদের আধিপত্য ও অন্যদের দাসত্ব টিকিয়ে রাখে বর্ণপ্রথা। সেটিকেই এখন রাজনৈতিক আদল দেওয়া হচ্ছে। পরোক্ষভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে, অধিকার আদায়ের দাবির চেয়েও একটি ‘শ’ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ বা তাদের সামনেই আন্দোলনকারীদের ওপর ক্ষমতাসীন দলের পেটোয়া সংগঠনের হামলাও তাদের কাছে গৌণ। তারা মনে করে, ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এমন আন্দোলনে হামলা চালানোই রেওয়াজ।

আশাব্যঞ্জক হচ্ছে, এই অটো পাস প্রজন্মই হাফ পাসের বিষয়ে সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট পরিবহনমালিকদের মাথা নত করতে বাধ্য করেছে। নিত্যপণ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহনভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে-সহ যেকোনো অধিকার আদায়ের ইস্যুতে যেখানে কোনো নাগরিক রাস্তায় নামতেই ভাবতে পারছে না, তাদের মুখ বুজে সয়ে নেওয়া বা যাওয়ার নিয়তির প্রতি এর চেয়ে বড় কশাঘাত আর কী হতে পারে?

নির্দিষ্ট অ্যাজেন্ডায় পরিচালিত রাজনীতিকে প্রশ্ন করলেই ভিকটিম ব্লেইমিং এখন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, এর আগে সেটি ছিল দোষারোপের রাজনীতি পর্যন্ত। কেন এই বানান শুদ্ধীকরণের অ্যাজেন্ডা সামনে আনা হলো? তাঁরাই এর উত্তর দিচ্ছেন, আন্দোলনকারীরা হচ্ছে ‘অটো পাস প্রজন্ম’। পড়াশোনা ছাড়া পরীক্ষা না দিয়ে পাস করা শিক্ষার্থীদের তো এ দশাই হবে! করোনা মহামারিকালে দীর্ঘ সময় ধরে স্কুল বন্ধের তালিকায় বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি ছিল বাংলাদেশ। কলকারখানা, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য, বাজার, সিনেমা হল, বিনোদনকেন্দ্র, কমিউনিটি সেন্টার, গণপরিবহন—সব খুলে দেওয়া হলেও মাসের পর মাস বন্ধ রাখা হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পরীক্ষা না নিয়ে দেওয়া হলো অটো পাস। শিক্ষাজীবন বিপর্যস্ত হয়ে অল্প বয়সী শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটল। গোটা বিষয়টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হলো শিক্ষার্থীরাই। আবার তাদেরই ট্যাগ দেওয়া হলো ‘অটো পাস প্রজন্ম’ বলে। শিক্ষার্থীরা যে দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, তাকে আগলে রাখার ক্ষমতাকাঠামোও যে নির্বাচনে ‘অটো পাস’ করা, এমন বদনাম কিন্তু বিরোধী রাজনীতিপক্ষ হরহামেশাই করে। মহামারিতে সরকারের যে নীতি শিক্ষা খাতের বড় ক্ষতি করল, এর জন্য ভুক্তভোগীদেরই দোষারোপ করা হচ্ছে, যেমনটা ধর্ষণের জন্য দায়ী করা হয় ভুক্তভোগী নারীকেই। সড়কে প্রাণ যাওয়া ব্যক্তিকেও উল্টো দোষারোপ করা হচ্ছে তার মৃত্যুর জন্য। সেখানেও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আওড়ানো হয় সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে।

বিরাজনীতিকীকরণ প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাজই হচ্ছে, কারা রাজনীতি করতে পারবে আর পারবে না, তা ঠিক করা। শিক্ষার্থীদের ও তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক কোনো চেতনাবোধ, আকাঙ্ক্ষা বা অবস্থান থাকতে পারবে না। সেটিরই যাবতীয় ব্যবস্থা–বন্দোবস্ত করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বিরাজনীতির ধারণার বীজ পুঁতে দেওয়া হয়। তখন আবার তাকে চিহ্নিত করা হয় ‘আই হেইট পলিটিকস জেনারেশন’ নামে। আবার তারাই যখন রাজনৈতিক সচেতন হয়ে ওঠে, তাদের বিরুদ্ধে সমাজের কাছে সন্দেহ তৈরির পাল্টা তৎপরতা চালানো হয়। কোটা সংস্কার আন্দোলন, নো ভ্যাট আন্দোলন ও কিশোর আন্দোলন—সবখানেই এই প্রবণতা দেখতে পাই আমরা। একই সঙ্গে ভিকটিম ব্লেইমিং ও আইডেনটিটি পলিটিকসের এই কার্ড খেলার মধ্য দিয়ে টিকে থাকে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক গোষ্ঠীরা।

আশাব্যঞ্জক হচ্ছে, এই অটো পাস প্রজন্মই হাফ পাসের বিষয়ে সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট পরিবহনমালিকদের মাথা নত করতে বাধ্য করেছে। নিত্যপণ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহনভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে-সহ যেকোনো অধিকার আদায়ের ইস্যুতে যেখানে কোনো নাগরিক রাস্তায় নামতেই ভাবতে পারছে না, তাদের মুখ বুজে সয়ে নেওয়া বা যাওয়ার নিয়তির প্রতি এর চেয়ে বড় কশাঘাত আর কী হতে পারে? পরিপূর্ণ দাবি আদায় না করে রাজপথ না ছাড়ার ঘোষণা, শুধু মানুষ না প্রাণীর জন্যও নিরাপদ সড়কের দাবি করা, শ্রমিকদের স্বার্থকেও দাবির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা, সড়কে দুর্নীতি-চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা—আন্দোলনে এমন পরিপক্বতা দেখানোর গত এক দশকে কোনো রাজনৈতিক দল বা নাগরিক গোষ্ঠী দেখাতে পারেনি। ক্ষমতার স্বার্থ-রাজনীতির কাছে দাসখত দেওয়া তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত প্রজন্মের ব্যর্থতা এবং বিরাজনীতিকীকরণের প্রকল্পের অংশীদারদের যাবতীয় প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সংগঠিত রাজনৈতিক আন্দোলনের বয়ান পাল্টে দেওয়া অটো পাস প্রজন্মের এই আন্দোলনই আগামীর ইতিহাস বিনির্মাণে আমাদের এগিয়ে নিল।

রাফসান গালিব প্রথম আলোর সহসম্পাদক