default-image

গদ্যকার্টুনে কৌতুক বলাটাই দস্তুর। প্রথমে একটা কৌতুক কপি-পেস্ট করি। 

স্বামী-স্ত্রী ঘরে বসে ছিল। বউ বলল, চলো, সময় কাটাতে দুজনে একটা খেলা খেলি। তুমি একটা কাগজে পাঁচজন নারীর নাম লেখো, যাদের তুমি পছন্দ করো। আর আমি পাঁচজন পুরুষের নাম লিখছি, যাদের আমি পছন্দ করি।
দুজনে কাগজ-কলম নিয়ে লেখা শুরু করে দিল।

কিছুক্ষণ পরে কাগজ খোলা হলো।
বউ লিখেছে:
ব্রাড পিট
মাশরাফি বিন মুর্তজা
উত্তমকুমার
ওস্তাদ জাকির হোসেন
হিমু

স্বামী লিখেছে:
রিমা (স্কুলের বন্ধু)
অঙ্কিতা (বউয়ের মামাতো বোন)
সীমা (বউয়ের বান্ধবী)
শবনম (সামনের ফ্ল্যাটের ভাবি)
অপর্ণা (ছেলের ক্লাসটিচার)

মোরাল অব দ্য স্টোরি:
পুরুষের জীবন বাস্তববাদী। আর নারীরা থাকে স্বপ্নের জগতে।
পরিণতি:
স্বামী দশ দিন ধরে বাইরের খাবার খাচ্ছে, আর ড্রয়িংরুমে সোফায় ঘুমোচ্ছে।

বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ:
এই বিপজ্জনক খেলা নিজের ঘরে খেলবেন না।

এই কৌতুকটা আমি পেয়েছি ফেসবুকে।

এখন এই কৌতুকটা আমরা বিশ্লেষণ করব। প্রথমেই শেষ লাইনটা বেছে নিই। বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ:
এই বিপজ্জনক খেলা নিজের ঘরে খেলবেন না।
অর্থাৎ কার মনে কী আছে, এটা আমরা জানব না, শুনব না, বলতে দেব না। সেটা একটা পদ্ধতি হতে পারে বটে। সেটা ভালো, নাকি জনতার মনের খবর জেনে ব্যবস্থা নেওয়া ভালো?
নকল করতে না দেওয়ায় শিক্ষক প্রহৃত হচ্ছেন। এই ভিডিওটা আমি দেখেছি। অন্য সবার মতো আমিও ক্ষুব্ধ। ভিডিওতে চেনা যাচ্ছে অপকর্ম কারা করেছে। এখন দেখার পালা, প্রশাসন কী ব্যবস্থা নেয়!
ফেসবুকেই ভিডিওটা শেয়ার হয়েছে, তাই এটা নজর এড়ায়নি।
যেমন এই ছবিটাও আমি অনলাইনেই দেখেছি, দাম না পেয়ে টাঙ্গাইলের কৃষক পাকা ধানের খেতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন।
প্রথম আলো লিখেছে: টাঙ্গাইলে ধান কাটতে একজন শ্রমিককে মজুরি দিতে হচ্ছে ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা। সঙ্গে তিন বেলা খাবার। অথচ এই এলাকায় প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। এত কম দামে ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচ উঠছে না কৃষকের। তাই নিজের পাকা ধানে আগুন লাগিয়ে ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ জানিয়েছেন টাঙ্গাইলের কৃষক আবদুল মালেক সিকদার।
মধুর ক্যানটিনে ছাত্রলীগের পদবঞ্চিতদের বিক্ষোভে হামলা হয়েছে। একজন ছাত্রীর রক্তাক্ত ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। এটাও আমি দেখতে পেয়েছি ফেসবুকেই।
ফেসবুক, অনলাইন, ডিজিটাল মাধ্যমের এই যুগে তথ্য লুকিয়ে রাখা যাবে কি? তা ছড়িয়ে পড়বেই।
এখন কর্তৃপক্ষের কাজ কী হবে? তাঁরা দুধরনের পদক্ষেপ নিতে পারেন। এই–জাতীয় ছবি, খবর, ভিডিও যাতে অনলাইনে প্রকাশ করতে না পারে, সে জন্য ব্যবস্থা নিতে পারেন। কবি হেনরী স্বপনকে যেমন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ধরা হয়েছে, তেমনি দমনমূলক ব্যবস্থা নিতে পারেন। আবার উল্টোটাও করতে পারেন। এই ধরনের খবর পাওয়ার পর সমাধানের উদ্যোগ নিতে পারে কর্তৃপক্ষ। তারা পাবনার কলেজশিক্ষকের ওপরে হামলাকারীদের ধরতে পারে। তাদের শায়েস্তা করতে পারে। তারা কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে পারে। যেমন প্রধানমন্ত্রী নিজে ছাত্রলীগের কমিটি থেকে বিতর্কিতদের নাম কেটে দিতে বলেছেন বলে খবরে প্রকাশ।
কর্তৃপক্ষ বলতে পারে, খামোশ। সংবাদপত্রে, টেলিভিশনে, অনলাইনে, ফেসবুকে এই ধরনের খবর কেউ দেবে না। এই ধরনের ছবি ছাপাবে না। নকলকারীরা মেরেছে শিক্ষককে, মারুক। কৃষক ধানখেতে আগুন লাগিয়েছে লাগাক। ছাত্রকর্মীরা রক্তারক্তি করেছে। করুক। তাতে তোমার কী। তুমি চুপ করে থাকো। তুমি ছবি, ভিডিও, খবর, ক্ষোভ প্রকাশ কোরো না। যদি করো, তোমার পরিণতি হবে বরিশালের কবির মতো। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। ৫৭ ধারা।
আগুন লাগলে খবর গোপন করার জন্য ধোঁয়া না তাড়িয়ে কর্তব্য হচ্ছে আগুন নেভানোর চেষ্টা করা। দেশের কোথায় কী ঘটছে, তা জানতে পারলেই তো কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারবে।
যেমন এই বৃদ্ধটি করেছেন।
ডাক্তার বললেন, আপনার হিয়ারিং কিটটা কেমন কাজ করছে? শুনতে পাচ্ছেন সব?
হ্যাঁ। সব শুনতে পাচ্ছি। একদম পরিষ্কার।
আপনার বাসার লোকজন খুব খুশি এখন?
না। ওদের জানাইনি যে আমার কান ভালো হয়ে গেছে। সব শুনতে পাচ্ছি।
কেন?
কে কী বলে সব শুনি। আমার সম্পত্তি হেবা দলিল করে লিখেপড়ে দিয়ে যাব। এ পর্যন্ত তিনবার বদল করেছি।
এখন এই মুরব্বি বলতে পারেন, যা শুনছি, তা না শুনলেই ভালো হতো। আড়ালে-আবডালে এরা আমার বিরুদ্ধে এই সব বলে নাকি!
তা তিনি করেননি। তিনি শুনছেন এবং ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
ক্ষমতাবানদের বলব, কান বন্ধ করে রাখবেন না। শুনুন।
এবং ব্যবস্থা নিন।
কে বলছে, তাদের বিরুদ্ধ ব্যবস্থা নয়। কী বলছে, কেন বলছে, সেটা শুনুন, তার প্রতিবিধান করুন।
অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে।
আমি তা-ই লিখেছি। ছাপাখানার ভুলে ছাপা হয়েছে: অন্ধ হলে কি প্রণয় বন্ধ থাকে?

আনিসুল হক: প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0