গত সপ্তাহে ফ্রান্সের উপকূল থেকে রবারের নৌকায় চড়ে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন কিছু লোক। কিন্তু মাঝপথে নৌকা উল্টে যায় এবং ২৭ জন লোক ডুবে যায়। তাদের মধ্যে তিনটি শিশু, এক অন্তঃসত্ত্বাসহ সাত নারী ছিলেন। এ নিয়ে গত ২০ বছরে ইংলিশ চ্যানেলে প্রায় সাড়ে তিন শ অভিবাসনপ্রত্যাশী ডুবে মারা গেছেন, যাঁদের মধ্যে ৩৬টি শিশু। সর্বশেষ নৌকাডুবির পর সবচেয়ে হতবাক করার মতো যে বিষয়টি সবার দৃষ্টি কেড়েছে, সেটি হলো, এমন দুর্ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্য যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স—এই দুই দেশের সরকারের মধ্যে সহযোগিতামূলক উদ্যোগ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমরা তা দেখলাম না। আমরা দেখলাম, দুই দেশের সরকারই নিজ দেশের ভোটারদের খুশি রাখার কথা মাথায় রেখে এই নৌকাডুবির জন্য একে অপরকে দোষ দিয়ে যাচ্ছে।

এ বছর ফ্রান্স সরকার ২৫ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশীকে ছোট ছোট ডিঙিনৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়া থেকে বিরত রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ফ্রান্স সরকার তাঁদের না সাগরে নামা ঠেকাতে পেরেছে, না মানব পাচারকারী চক্রের তৎপরতা ঠেকাতে পেরেছে। গত সপ্তাহে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা গেছে ফ্রান্সের ক্যালে শহরের কাছের সৈকতে যখন রবারের নৌকায় অভিবাসনপ্রত্যাশীরা উঠছিলেন, তখন সেখানে দেশটির পুলিশ সদস্যদের নিষ্ক্রিয়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। ওই নৌকায় এক ডজনের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক লোক ও ছয়টি শিশু ছিল। শিশুদের বয়স ৩ থেকে ৭ বছরের মধ্যে।

অনেকেই বলেছিলেন, কুর্দি শিশু আয়লানের মৃত্যু হয়তো একই পরিণতি বরণ করা থেকে বহু অভিবাসীকে রক্ষা করবে। কিন্তু আমরা তখন ভুলে গিয়েছিলাম রাজনীতিকেরা এবং সরকারগুলো নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে চূড়ান্ত অমানবিক হয়ে উঠতে পারে।

তবে গত সপ্তাহের নৌ দুর্ঘটনার পর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, ‘ফ্রান্স ইংলিশ চ্যানেলকে সলিলসমাধিস্থল হতে দেবে না’। কিন্তু এই চ্যানেল যে অনেক আগে থেকে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সলিলসমাধিস্থল হয়েই আছে, তা তাঁর নজর এড়িয়ে গেছে। দুর্ঘটনার পর মাখোঁ ইউরোপের কয়েকটি দেশের নেতাদের নিয়ে এ বিষয়ে জরুরি বৈঠক করেছেন; কিন্তু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সঙ্গে এমানুয়েল মাখোঁর সম্পর্কের অবনিতর জের ধরে সেই বৈঠকে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। প্রীতি প্যাটেলকে আমন্ত্রণ না জানানোয় বরিস জনসন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফ্রান্স সরকারের সমালোচনা করায় দুই দেশের মধ্যে চাপান–উতোর আরও বেড়ে গেছে।

যুক্তরাজ্যে পার্লামেন্ট সদস্যরা অবৈধ অভিবাসীর অনুপ্রবেশ ঠেকাতে প্রীতি প্যাটেলকে কঠোর হতে বলেছেন। প্রীতি প্যাটেল হাস্যোজ্জ্বলভাবে সেই দাবি মানতে চেয়েছেন। কারণ, ক্ষমতাসীন রক্ষণশীলরা সমর্থকদের খুশি রাখতে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আশ্রয় দেওয়ার পক্ষে নন। এটি নিশ্চিত, অভিবাসীদের জন্য যুক্তরাজ্যে ঢোকার নিরাপদ পথগুলো খুলে দিলে আদম পাচারকারীদের অবৈধ কামাই রাতারাতি বন্ধ হয়ে যাবে। পাশাপাশি এটি করা হলে তা রক্ষণশীল ভোটার ও এমপিদের হতাশ করবে।

সবচেয়ে হতবাক করার বিষয় হলো প্রীতি প্যাটেল একটি আইনের খসড়া প্রস্তাব করেছেন, যাতে বলা হয়েছে, অবৈধ অভিবাসীদের নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে ঢুকতে কেউ সহায়তা করলে তার সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড হবে। এই আইন প্রণয়নের উদ্যোগের কথা শুনে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউট চিন্তায় পড়ে গেছে। ইংলিশে চ্যানেল দিয়ে ছোট নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে ঢোকার সময় যাঁরা নৌকাডুবির শিকার হন এই প্রতিষ্ঠানটির স্বেচ্ছাসেবীরা তাঁদের উদ্ধার করে কূলে নিয়ে আসেন। এখন এই আইন পাস হলে তাঁদের সেই উদ্ধার তৎপরতাও কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত হবে।

অর্থাৎ এটি স্পষ্ট যে দুই দেশের রাজনীতিকেরা তাঁদের রাজনৈতিক স্বার্থকে যতখানি গুরুত্ব দিয়েছেন, অভিবাসনপ্রার্থীদের জীবন বাঁচানোকে তাঁরা ততটা গুরুত্ব দেননি।

এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

জনাথন গোরনাল যুক্তরাজ্যের সাংবাদিক ও লেখক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন