বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল একটি বিস্তৃত সমুদ্র এলাকা। বিশ্বের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নৌরুট এই অঞ্চলে রয়েছে। পূর্বে ভারত থেকে জাপান এবং দক্ষিণে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত এই অঞ্চল বিস্তৃত। এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের শক্তি ও দাপট যেভাবে বেড়ে চলেছে, তা অনেক দেশের জন্যই অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাপানের ফর্মুলায় অকাসের আগে একই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি হয়েছিল কোয়াড। বলা যায় জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে গঠিত কোয়াডের একটি শক্তিশালী ও জমাট পরিণতি হচ্ছে অকাস। যেখান থেকে বাদ পড়েছে জাপান ও ভারত। যুক্ত হয়েছে যুক্তরাজ্য। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে অকাস গঠনের ফলে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনকে একটি নতুন শক্তিশালী সামরিক জোটকে মোকাবিলা করতে হবে।

নৌশক্তির শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য চীনের উত্থানকে ঠেকাতে চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। চীন যেখানে তার অবস্থান জোরদার করছে, সেই অঞ্চলটি যেহেতু ভারত-প্রশান্ত মহাসাগর, তাই দেশ দুটিকে অস্ট্রেলিয়ার ওপর ভর করতে হয়েছে। অকাস গঠনের প্রতিক্রিয়ায় সে কারণেই গ্লোবাল টাইমস–এর আক্রমণের শিকার হয়েছে অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া বা ভারত, জাপান এই দেশগুলোকে চীনের সঙ্গে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ভাগাভাগি করতেই হবে। এই দেশ তিনটি তাদের স্বার্থেই এই অঞ্চলে কোনো সংঘাত চাইবে না বা এমন কিছুতে নিজেদের জড়াতে চাইবে না। তা ছাড়া অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, পরাশক্তি হিসেবে চীনের উত্থান ঠেকানোর মতো অবাস্তব ও অসম্ভব লক্ষ্য নিয়ে এই দেশগুলোর এগোনোর কোনো কারণ নেই।

দক্ষিণ চীন সাগর বা সামগ্রিকভাবে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের নিয়ন্ত্রণ বা কর্তৃত্ব বজায় রাখা শুধু বাণিজ্যিক স্বার্থে নয়, বরং পরাশক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার জন্যও জরুরি। মার্কিন নৌ কৌশলবিদ আলফ্রেড থায়ার মাহান উনিশ শতকেই বলে গেছেন, সমুদ্রবাণিজ্য বা নৌশক্তি যে ক্ষেত্রেই হোক, সমুদ্র যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তার পক্ষে পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বিভিন্ন সময় তাঁর লেখা প্রবন্ধগুলো নিয়ে প্রকাশিত বইয়ে (দ্য ইন্টারেস্ট অব আমেরিকা ইন সি পাওয়ার, ১৮৯৭) তিনি যুক্তি দিয়েছেন, স্থলে যত সম্পদই থাক না কেন সমুদ্রপথে সম্পদ বিনিময় বা বাণিজ্য যত সহজ, অন্য কোনো পথে তেমন নয়। তাঁর মত হচ্ছে, কোনো দেশ যদি দুনিয়ার বড় শক্তি হতে চায়, তবে দেশটিকে তার আশপাশের জলসীমানায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের নৌ কৌশলবিদ সমুদ্রে আমেরিকার নৌশক্তির ‘ইন্টারেস্ট’ রক্ষায় যে পরামর্শ দিয়েছেন, চীন এখন যেন হুবহু সেই পথেই হাঁটছে। কারণ, সমুদ্রের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বে তার নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টেক্কা দিতে হলে নৌশক্তি বৃদ্ধি ও নৌপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যে জরুরি, সেই উপলব্ধি চীনের বেশ আগেই হয়েছে। এশিয়ার ভূরাজনীতি ও অর্থনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক রিচার্ড হিদারিয়ান ২০১৫ সালে এক প্রবন্ধে নৌশক্তিতে চীনের এই উত্থানের মাত্রাটি তুলে ধরেছিলেন। তিনি লিখেছেন, নতুন এক নৌশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক সমুদ্রব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে পাল্টে দিচ্ছে। চীনের নৌশক্তি ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলেছে এবং দেশটির হাতে রয়েছে বিপুল অস্ত্র। সেই শক্তির ওপর ভর করে চীন পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতিকে কোণঠাসা করতে চাইছে। (এ সিনো-আমেরিকান নেভাল শোডাউন ইন সাউথ চায়না সি, আল-জাজিরা, ২৯ অক্টোবর ২০১৫)।

অকাস গঠনের পর ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিবেশ নিশ্চিতভাবেই আরও বিরোধপূর্ণ হয়ে উঠবে। চীনকে মাথায় রেখে অস্ট্রেলিয়া ও জাপান তাদের প্রতিরক্ষা খরচ বাড়াচ্ছে। ২০২২-২৩ সালের পরিকল্পনায় জাপান সামরিক খাতে রেকর্ড পরিমাণ ৫০ বিলিয়ন ডলার বাজেট রেখেছে। সামরিক খাতে অস্ট্রেলিয়ার ২০২১-২২ সালের বরাদ্দ জিডিপির দুই ভাগ ছাড়িয়েছে

দেখা যাচ্ছে, চীন তার নৌশক্তিকে সত্যিকার অর্থেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকির পর্যায়ে নিয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়াকে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন দেওয়ার ঘোষণা ও যুক্তরাজ্যকে সঙ্গে নিয়ে সামরিক জোট অকাস গঠন করে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত এই পরিস্থিতি সামাল দিতে চাইছে। প্রশ্ন হচ্ছে নৌশক্তি বৃদ্ধি ও ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় মরিয়া চীনকে কি এ ধরনের জোট গঠনের মাধ্যমে দমানো যাবে? নিজেদের স্বার্থে এই অঞ্চলের কোনো দেশই (তা ভারত, অস্ট্রেলিয়া বা জাপান যে দেশই হোক না কেন) চীনের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে চাইবে না। অকাস এই অঞ্চলকে তবে কী দিতে যাচ্ছে?

সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের পরিচালক ও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বোর্ডের সাবেক সদস্য সি রাজা মোহন এক প্রবন্ধে লিখেছেন, অকাস ও কোয়াড নিয়ে এশিয়ার দেশগুলোর চিন্তার কারণ মূলত তিনটি। প্রথমত, দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার মতো পরিস্থিতির মধ্যে পড়বে। দ্বিতীয়ত, আসিয়ানকে কেন্দ্র করে এখানে যে আঞ্চলিক কাঠামো কার্যকর রয়েছে, কোয়াড তাকে অনেকটাই খাটো করবে। আর তৃতীয়ত, অকাস এই অঞ্চলে এক নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা উসকে দেবে।

লন্ডনভিত্তিক ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ ও স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, এই করোনার সময়েও ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক খরচে কোনো ছেদ পড়েনি। স্টকহোম ইনস্টিটিউট বলছে, গত এক দশকে চীন ও ভারতের নেতৃত্বে এই অঞ্চলে সামরিক খরচ ৪৭ শতাংশ বেড়েছে। এখন অকাস গঠনের পর চীন নিজেকে এই জোটের টার্গেট হিসেবে বিবেচনা এবং নিজেদের সামরিক কর্মসূচি আরও বাড়ানোর পথ ধরতে পারে।

সাংবাদিক ও অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর’স ফেলো টনি ওয়াকার লিখেছেন, (স্ক্রল ইন্ডিয়া, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১) অকাস গঠনের পর ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিবেশ নিশ্চিতভাবেই আরও বিরোধপূর্ণ হয়ে উঠবে। চীনকে মাথায় রেখে অস্ট্রেলিয়া ও জাপান তাদের প্রতিরক্ষা খরচ বাড়াচ্ছে। ২০২২-২৩ সালের পরিকল্পনায় জাপান সামরিক খাতে রেকর্ড পরিমাণ ৫০ বিলিয়ন ডলার বাজেট রেখেছে। সামরিক খাতে অস্ট্রেলিয়ার ২০২১-২২ সালের বরাদ্দ জিডিপির ২ ভাগ ছাড়িয়েছে। অকাসে যুক্ত হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার খরচ আরও বাড়বে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। টনি ওয়াকার লিখেছেন, প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৩ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত না বাড়িয়ে অস্ট্রেলিয়া হয়তো অকাসের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারবে না। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোও তাদের সামরিক কর্মসূচি নতুন করে পর্যালোচনা করতে শুরু করেছে।

  • এ কে এম জাকারিয়া প্রথম আলোর উপসম্পাদক

    [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন