বিজ্ঞাপন

এই আইজেনের জন্মই হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে প্রযুক্তিকে সঙ্গী করে। তারা কিন্তু তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের মতো দুটি ধারার সঙ্গে পরিচিত নয়। আইজেন তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান পৃথিবীর সঙ্গে। পূর্ববর্তী প্রজন্মটি প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে যে ধরনের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের মধ্যে আছে, কিশোর-তরুণ প্রজন্মটি কিন্তু সেই টানাপোড়েনে নেই। তাই পূর্ববর্তী প্রজন্মকে সতর্কভাবে লক্ষ রাখতে হবে, তাদের মনস্তাত্ত্বিক এই দ্বন্দ্ব নেতিবাচকভাবে যেন নতুন প্রজন্মটিকে প্রভাবিত না করে। বর্তমান সময় ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ না করে তারা যদি তাদের প্রত্যাশার ভার জোর করে নতুন প্রজন্মের ওপর চাপিয়ে দেয়, তবে বাড়তে পারে দূরত্ব। আর এই দূরত্ব কোনোভাবেই কাম্য নয়।

শিশু মনোবিজ্ঞানী এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আই প্যারেন্টস-১০১-এর প্রতিষ্ঠাতা ড. অ্যাডাম প্ল্যাটার প্রযুক্তির দুনিয়ায় কিশোর-তরুণ প্রজন্মটিকে ‘ডিজিটালি নেটিভ সিটিজেন’ বা ‘প্রযুক্তি দুনিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা’ এবং তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মকে ‘ডিজিটাল ইমিগ্র্যান্টস’ বা ‘প্রযুক্তি দুনিয়ার অভিবাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, এই দুটি প্রজন্মের মধ্যে অবস্থানগত পার্থক্য থাকা খুবই স্বাভাবিক। তবে তিনি মনে করেন, অভিবাসীদের স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ন্ত্রণ করার এ প্রবণতা সমস্যা আরও বাড়িয়ে তুলছে। ফলে দুটি প্রজন্মের মধ্যে বাড়ছে দূরত্ব আর অবিশ্বাস, সম্পর্কের অবনতি ঘটছে, তৈরি হচ্ছে জটিলতা।

প্রশ্ন হলো আইজেনের এ প্রযুক্তিনির্ভরতা কি সব ক্ষেত্রে ক্ষতিকর? এ বিষয়ে যেসব গবেষণা পরিচালিত হয়েছে, সেগুলো দ্বিধাবিভক্ত। তবে প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন বাড়িয়ে দিচ্ছে দুই ধরনের ঝুঁকি; একটি হলো প্রযুক্তির প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি আর অন্যটি হলো সাইবার অপরাধের শিকার হওয়ার ঝুঁকি। এ ছাড়া আছে পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হওয়ার আশঙ্কা। কিন্তু এসব আশঙ্কা কি আগের দিনগুলোয় ছিল না? নিশ্চয়ই ছিল। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা নোংরা চোখগুলো তখনো বাস্তব দুনিয়ায় মাঠে-ঘাটে, পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়াত আর শিকার খুঁজত। ইউটিউব, নেটফ্লিক্স তখন ছিল না সত্য, তবে জটলা করে ভিসিপি কিংবা ভিসিআরে নীল ছবি দেখত উৎসাহী চোখগুলো। বরং এখনকার কিশোর প্রজন্ম প্রযুক্তির কল্যাণে এ ধরনের ঘটনাগুলো সম্পর্কে সচেতন ও প্রতিবাদী। প্রতিকারের উপায় সম্পর্কেও তারা অনেকেই জানে-বোঝে।

যেকোনো কিছুর প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি সব সময়ই ক্ষতিকর। তবে কোনটি আসক্তি আর কোনটি অভ্যস্ততা, সেটি নিরূপণ করতে হবে যুক্তিবাদী ও নিরপেক্ষ হয়ে, আবেগ দিয়ে নয়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ভালো লাগা, মন্দ লাগা, রুচি, পছন্দ আর ইচ্ছার পার্থক্য থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। আজকাল অনেকেই অভিযোগ করেন, শিশু-কিশোরেরা বই পড়ে না। আজকের শিশু-কিশোরেরা যদি বই পড়ার অভ্যাস থেকে দূরে সরেই যায়, তাহলে প্রজন্মটি গণ্ডমূর্খ হয়ে বেড়ে উঠবে, এমন ধারণা করার কোনো কারণ নেই। বই পড়ার অনভ্যস্ততা নিয়ে যে প্রজন্ম বড় হচ্ছে, সেই প্রজন্ম জ্ঞান আহরণের জন্য প্রযুক্তিভিত্তিক অনেক মাধ্যমকে এরই মধ্যে খুঁজে নিয়েছে, যার খবরও আমরা হয়তো রাখি না। চিরসত্য হলো, সভ্যতা তার আপন গতিতে এগিয়ে যাবে, বিকশিত হবে এবং আজকের কিশোর-তরুণ প্রজন্মই সেই সভ্যতাকে নেতৃত্ব দেবে।

যেকোনো কিছুর প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি সব সময়ই ক্ষতিকর। তবে কোনটি আসক্তি আর কোনটি অভ্যস্ততা, সেটি নিরূপণ করতে হবে যুক্তিবাদী ও নিরপেক্ষ হয়ে, আবেগ দিয়ে নয়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ভালো লাগা, মন্দ লাগা, রুচি, পছন্দ আর ইচ্ছার পার্থক্য থাকবে, এটাই স্বাভাবিক।

অনেকেই আছেন, যাঁরা সন্তানদের অনলাইন স্পেস মনিটরিং করার পক্ষপাতী। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এ ধরনের মনিটরিং শুধু যে শিশুর গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার প্রশ্নবিদ্ধ করে তা–ই নয়, এটি মানবাধিকার লঙ্ঘনও বটে। এ ধরনের মনিটরিং দুটি প্রজন্মের প্রতিনিধিদের সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করবে, রচনা করবে দূরত্ব। পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর বিশ্বাসের ওপর টিকে থাকে সম্পর্ক। ছোট বলেই শিশু-কিশোরদের ব্যক্তিগত জায়গায় প্রবেশ করা যায়, এটি কিন্তু ভ্রান্ত ধারণা।

প্রশ্ন হলো প্রযুক্তির প্রতি আসক্তি নিয়ন্ত্রণের উপায় কী? কীভাবে সচেতন করা যায় এই প্রজন্মকে? প্রথমত, প্রযুক্তির প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে শিশু-কিশোরদের সচেতন করতে হবে এবং এর নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারকে উৎসাহিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সন্তানের অজ্ঞাতসারে তাদের মনিটরিং করার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। মনিটরিং হতে হবে উভয় পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে, খোলামেলাভাবে। বিষয়টি হতে পারে অনেকটা নিয়মিত লেখাপড়া ফলোআপের মতো। তৃতীয়ত, তাদের প্রতি মনোযোগী হতে হবে, তাদের প্রচুর সময় দিতে হবে। চতুর্থত, ঠিকমতো না জেনে তাদের পছন্দকে ছোট করা যাবে না। অনলাইনে তারা যেসব সাইটে বিচরণ করে, সেসব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। ভালো কিছুকে উৎসাহিত করতে হবে, আর মন্দ কিছু থেকে সরে আসার পথের সন্ধান দিতে হবে। সৃজনশীল অনলাইন গেমকে উৎসাহিত করতে হবে। এ ধরনের অনেক গেম থেকে শেখার আছে অনেক কিছু। সর্বোপরি, নিজেদের এ ধরনের আসক্তি থেকে দূরে রাখতে হবে। নতুবা শিশু-কিশোরদের প্রতি কোনো পরামর্শই কাজে আসবে না।

সময়টাই এখন প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার। করোনা পরিস্থিতি আরও জানিয়ে দিয়েছে টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে। তাই প্রযুক্তিকে অভিযুক্ত না করে বরং মেনে নেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। শৈশবে সন্তানকে প্রযুক্তি থেকে দূরে রেখে পরবর্তী জীবনে এ বিষয়ে হঠাৎ তাদের কাছ থেকে পাণ্ডিত্য আশা করা বোকামি। নিজেদের পায়ে ভর করে তারা যেন প্রযুক্তিনির্ভর দুনিয়ায় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পথ চলতে পারে, সে জন্য বড়দের দায়িত্বশীল আচরণ দরকার। প্রযুক্তির বাস্তবতা মেনে নিয়েই স্বাস্থ্যকর পারিবারিক সম্পর্ক গঠনের দিকে মনোযোগী হতে হবে।

নিশাত সুলতানা লেখক ও উন্নয়নকর্মী

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন