বিজ্ঞাপন

এ ব্যবস্থার অন্তরালে একটি অমানবিক শোষণ এবং শ্রম আইন ভঙ্গের মহোৎসব চলছে। ধরুন, অফিস পাহারা দেওয়ার জন্য সিকিউরিটি কোম্পানির সঙ্গে একটি সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থা একটি চুক্তি করল। চুক্তি অনুযায়ী, সেবা গ্রহণকারী সংস্থা সিকিউরিটি কোম্পানিকে কর্মীর বেতন-ভাতা বাবদ অর্থ পরিশোধ করেন। সমস্যা হচ্ছে, সেবাকর্মীরা সে চুক্তি অনুযায়ী মধ্যস্বত্বভোগী সংস্থার কাছ সঠিক পারিশ্রমিক পায় না। ধরুন, আপনি ৩০ জন গার্ডের প্রতিজনের জন্য প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা করে দুটি উৎসব ভাতাসহ বছরে ১৪ মাসের বেতন বাবদ কোম্পানিকে বিল দিচ্ছেন ৮৪ লাখ টাকা, কিন্তু কর্মীরা পায় মাসে ৮ হাজার টাকা। আবার আপনি ৮ ঘণ্টার শিফট ধরে প্রতি শিফটে ১০ জন করে তিন শিফটের জন্য ৩০ জন চেয়েছিলেন। প্রাইভেট কোম্পানির প্রতি শিফট ১২ ঘণ্টার। আপনার অজান্তে ১০ জন গায়েব। মূল ১৪ মাসের বেতন থেকে প্রতি মাসে জনপ্রতি ১২ হাজার টাকা মেরে দিচ্ছে। এভাবে ৮৪ লাখ টাকার বিল থেকে ৫৬ লাখ টাকা কোম্পানি আত্মসাৎ করে, শুধু ২৯ লাখ টাকা কর্মীদের দিয়ে থাকে। বিষয়টি বোঝানোর জন্য একটি কল্পিত উদাহরণ দিলাম। যাদের সন্দেহ হবে, তারা বিষয়টির বাস্তব অবস্থা খতিয়ে দেখুন।

এভাবে পরিচ্ছন্নতাকর্মী, দারোয়ান, মালি, ড্রাইভার প্রভৃতি নিম্নস্তরের সেবাকর্মীদের বিষয়ে একটি অমানবিক শোষণপ্রক্রিয়াকে সর্বত্র প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। কর্মীদের সঠিকভাবে নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না, যাতে তারা শ্রম আইনে মামলা করতে না পারে। তাদের কর্মঘণ্টা, ছুটি, উৎসব ভাতা ইত্যাদি অত্যন্ত অস্পষ্ট। কিন্তু কোনো উচ্চ পদে যখন কোনো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ হয়, সেখানে বেতন-ভাতা নিয়মিত চাকরির কয়েক গুণ বেশি দেওয়া হয়।

এজেন্সিকে ২৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জ দিয়ে বেতন-ভাতার টাকাটা পুরোপুরি যাতে শ্রমিক পায়, তার পাকা বন্দোবস্ত করে আউটসোর্স ব্যবস্থাকে আইনানুগ ও মানবিক করা প্রয়োজন। কোনো সেবা সহায়তা দানকারী সংস্থা কর্মীর বেতন থেকে টাকা কর্তন করে যাতে অতি মুনাফা না করতে পারে, এ ব্যাপারে সরকারের শ্রম দপ্তরের একটা নজরদারি থাকতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিমা ব্যবস্থা এবং তাদের জন্য শ্রম আইনের আওতায় প্রতিকার পাওয়ার পথ উন্মুক্ত রাখার যাবতীয় ব্যবস্থাও গ্রহণ করা উচিত।

উল্লেখ করা বিষয়টি দেশে নিম্ন পর্যায়ের সেবাকর্মীদের প্রতি যেমন হচ্ছে, একই বিষয়টি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উচ্চপর্যায়ের পেশাদার বিশেষজ্ঞগণের সঙ্গেও হচ্ছে। বিষয়টি সরকার এবং দেশে নানা প্রকল্পের অর্থায়নকারী সংস্থা যেমন বিশ্বব্যাংক, এডিবি, ইউনিসেফ, ইউকে এইড প্রভৃতির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রযোজ্য। তেমনিভাবে সরকারের ক্লায়েন্ট সংস্থা এলজিইডি, ডিপিএইচই, পানি উন্নয়ন বোর্ড, গৃহায়ণ অধিদপ্তর প্রভৃতি দেখার বিষয়। এসব সংস্থা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিশেষায়িত পেশাগত সেবা গ্রহণ এবং প্রকল্পের নানা লজিস্টিক সেবার জন্য তথাকথিত একধরনের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে উপদেষ্টা ফার্ম বা সেবা প্রদানকারী ফার্ম নিয়োগ করে থাকে। এই ফার্মগুলোও একইভাবে পেশাদার উপদেষ্টা থেকে শুরু করে ড্রাইভার, অফিস সহকারী—সবার জন্য মূল চুক্তিতে ধার্যকৃত বেতন দেয় না। তারা মূল অর্থায়নকারী সংস্থার চুক্তির বাইরে প্রত্যেক কর্মীর সঙ্গে পৃথক চুক্তি করে, যা খুবই গোপনীয় থাকে। এমনকি একই কাজের জন্য পাঁচজন থাকলে পাঁচজনের পাঁচ অঙ্কের বেতন হতে পারে। এভাবে এ দেশের কিছু কনসালটিং ফার্ম বিদেশি ফার্মের যোগসাজশে বাংলাদেশি পেশাজীবীদের প্রকল্পের নির্ধারিত বেতনের সিংহভাগ আত্মসাৎ করে থাকে। অথচ কম শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতা নিয়েও অনেক বিদেশি উপদেষ্টা দেশিদের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি বেতন গ্রহণ করেন।

বিদেশিদের অধিক বেতন গ্রহণ একটি ভিন্ন বিষয়, কিন্তু দেশি-বিদেশি কিছু উপদেষ্টা ফার্ম অত্যন্ত অস্বচ্ছ পন্থায় দেশি পেশাদার ও লজিস্টিক কর্মীদের ধার্যকৃত মূল বেতন না দিয়ে ঠকিয়ে চলেছে। কনসালটিং ফার্মগুলোর নিজস্ব কোনো বিশেষজ্ঞ থাকে না। প্রকল্পের দরপত্রের বিড করার সময় জানিয়ে না জানিয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করে তা জমা দেয়। যখন বিড জিতে যায়, তখন মূল চুক্তি এড়িয়ে পৃথকভাবে নিয়োগগুলো দিয়ে থাকে, তখনই বেতন কম দেওয়ার অস্বচ্ছ কৌশলটি অবলম্বন করে। অর্থায়নকারী সংস্থা বা সরকারের বাস্তবায়নকারী সংস্থা এসব জেনেও না জানার ভান করে। অথবা এখান থেকে তারাও কিছু অন্যায্য সুবিধা গ্রহণ করে থাকে। দেশের নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে উপদেষ্টা সেবার গুণগত মান অটুট এবং বৃদ্ধি করতে হলে এ অস্বচ্ছতা ও অসাধুতা থেকে উপদেষ্টা সেবাকে মুক্ত করতে হবে। দেশের কিছু বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি যদি তাদের জন্য নির্ধারিত উচ্চ বেতনটা পায়, তাতে তো কারও কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু একটা মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্যে কিছু নিরীহ পেশাজীবী বঞ্চিত হবেন, সেটি কোনোভাবে কাম্য হতে পারে না।

দেশে লোকবল জোগানদার কিছু ভুঁইফোড় সংস্থার মাধ্যমে কর্মী নিয়োগের বিষয়টি আজকাল একটি ‘নতুন আদম ব্যবসা’ হিসেবে দেশের অভ্যন্তরে কাজ করছে। এখানে একটি বড় ধরনের অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতি পাকাপোক্তভাবে আসন করে নিচ্ছে। সরকারকে ছোট করার কৌশল হিসেবে একসময় নানা উন্নয়ন সহযোগীরা বিষয়টি গ্রহণের সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু এ ব্যবস্থার অপব্যবহার এবং তার মাধ্যমে একপক্ষের মধ্যযুগীয় মুনাফাবৃত্তি এবং অপর পক্ষের পেটে লাথি দেওয়ার বিষয়টি নীরবে হজম করা যায় না।

ড. তোফায়েল আহমেদ শিক্ষাবিদ ও শাসন বিশেষজ্ঞ।

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন