বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব হেলালুর রহমান, যিনি ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশনের সচিবের দায়িত্ব পালন করেছিলেন, বলেছেন, এটা নতুন অভিজ্ঞতা। দলীয় প্রতীক নিয়ে জয়ী প্রার্থীর দলীয় সদস্যপদ বাতিল হলে তিনি মেয়র পদে থাকতে পারবেন কি পারবেন না, সে বিষয়ে আইনে কিছু লেখা নেই। দুই মেয়াদে স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে হচ্ছে। এ রকম একটা সমস্যা হতে পারে, তাদের মাথায় রাখা উচিত ছিল।

স্থানীয় সরকার সংস্থার প্রতিনিধিদের বিষয়ে আইনে লেখা না থাকলেও জাতীয় সংসদের সদস্যের ক্ষেত্রে লেখা আছে। তাঁরা দল থেকে বহিষ্কার হলে সাংসদ পদও হারাবেন। এমনকি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁরা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে সংসদে ভোট দিতে কিংবা কথাও বলতে পারেন না। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপির সাংসদ ডা. আলাউদ্দিন ও হাসিবুর রহমান স্বপন মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। বিএনপি তাঁদের দল থেকে বহিষ্কার করলে দুজনকেই সদস্যপদ হারাতে হয়। গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হলেও তিনি সদস্য পদ হারান।
কিন্তু স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জনপ্রতিনিধিদের বিষয়ে আইনে কিছু লেখা নেই।

কেবল গাজীপুর নয়, সারা দেশে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে যাঁদের মনোনয়ন দিয়েছেন, তাঁদের নীতি-নৈতিকতা সম্পর্কে কি আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ভালোভাবে খোঁজখবর নিয়েছেন? নিলে মনোনীত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ওবায়দুল কাদেরের ভাষায় ‘রাজাকারের বাচ্চা’ ও ‘রাজাকারের নাতি’ ইত্যাদি অভিযোগ আসত না। ঐতিহ্যবাহী দলটিতেও অনুপ্রবেশকারী ও সুযোগসন্ধানীদের দৌরাত্ম্য বাড়ত না।

আগে নির্বাচন বরাবরই নির্দলীয়ভাবে হতো। গত মেয়াদ ও চলতি মেয়াদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার পরও কেন তাঁরা এ বিষয়ে আইনি ব্যাখ্যা নিলেন না? যে যুক্তিতে দলীয় পদ হারালে সাংসদরা সংসদে থাকতে পারেন না, সেই যুক্তিতে স্থানীয় সরকার সংস্থার জনপ্রতিনিধিদেরও থাকার কথা নয়। তাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন দলের মনোনয়ন নিয়ে, দলের প্রতীকে। সে ক্ষেত্রে তাঁর বিজয়ের পেছনে দলের ভূমিকাও আছে। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে যে এত মারামারি হানাহানির ঘটনা ঘটছে, তার পেছনেও কিন্তু দলীয় মনোনয়ন পাওয়া না-পাওয়ার প্রশ্ন জড়িত। যাঁরা দলীয় মনোনয়ন ও প্রতীক পেয়েছেন, তাঁরা মনে করেন, দল ও দলের নেতারা তাঁর সঙ্গে থাকবেন। অতএব জয় ঠেকায় কে?

স্থানীয় সরকার সংস্থার জনপ্রতিনিধিদের অপসারণের ক্ষেত্রে আরও কিছু বিধান আছে। স্থানীয় শাসন বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ মনে করেন, নৈতিক দায়িত্ব নিয়েও একজন মেয়র পদ থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন, যদি তিনি মনে করেন, তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আসতে পারে। বিধান হলো, নির্বাচিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য যদি কোনো মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেন, তাহলে তিনি বা তারা পদ হারাবেন। কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধির বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলন, রাষ্ট্র ও আইনবিরোধী অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তাঁকে পদ হারাতে হয়। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ কেউ জাহাঙ্গীর আলমকে দল থেকে বহিষ্কারের পাশাপাশি মেয়র পদ থেকেও অপসারণের দাবি করেছেন।

ক্ষমতাসীনমহল থেকে আরও বলা হচ্ছে, তিনি বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদদের সম্পর্কে যেসব গর্হিত মন্তব্য করেছেন, তাতে তাঁর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হওয়া উচিত। এই আইনে বিরোধী দলের নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে।

গাজীপুরের মেয়রের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ ব্যবস্থা নিয়েছে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করায়। কিন্তু তার বিরুদ্ধে আরও অনেক গুরুতর অভিযোগ আছে। আলোচ্য অডিওতে তিনি ৪-৫ জন কাউন্সিলরকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন। যারা তার বিরোধিতা করেছেন, তাদের দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। ব্যবসায়ীদের হুমকি ধামকি দিয়ে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ আছে।

প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, মেয়র গাজীপুরের অনেক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মুচলেকা নিয়েছেন, ভবিষ্যতে শহর সম্প্রসারিত হলে বিনা ক্ষতিপূরণে জমি ছেড়ে দিতে হবে। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জমি অধিগ্রহণ করার বিধান আছে। কিন্তু ভবিষ্যতে উন্নয়নকাজ হলে বিনা ক্ষতিপূরণে জমি দিতে হবে, এ রকম কোনো বিধান আইনে নেই। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব মনে করে, ২০১৩ সালে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী আজমত উল্লাহ খানের পরাজয়ের পেছনে জাহাঙ্গীর আলমের ভূমিকা ছিল। তিনি মন্ত্রীদের গোনেন না বলেও মন্তব্য করেছেন। এসব অভিযোগ যদি সঠিক হয়ে তাকে তাহলে তিনি পরবর্তী নির্বাচনে মেয়র পদে মনোনয়ন পেলেন কীভাবে?

জাহাঙ্গীর আলম তাঁর বিরুদ্ধে দলীয় সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘আমি কোনো অন্যায় করিনি। গাজীপুরে আওয়ামী লীগের একটি পক্ষ ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে আসছিল। তারা প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভানেত্রীকে ভুল বুঝিয়েছেন। তারপরও প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত তিনি মেনে নিয়েছেন।’

কেবল গাজীপুর নয়, সারা দেশে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে যাঁদের মনোনয়ন দিয়েছেন, তাঁদের নীতি-নৈতিকতা সম্পর্কে কি আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ভালোভাবে খোঁজখবর নিয়েছেন? নিলে মনোনীত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ওবায়দুল কাদেরের ভাষায় ‘রাজাকারের বাচ্চা’ ও ‘রাজাকারের নাতি’ ইত্যাদি অভিযোগ আসত না। ঐতিহ্যবাহী দলটিতেও অনুপ্রবেশকারী ও সুযোগসন্ধানীদের দৌরাত্ম্য বাড়ত না।

দলের নীতি-আদর্শের বিরুদ্ধে কাজ করেন, এ রকম আরও কত জাহাঙ্গীর আলমকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব জনপ্রতিনিধি বানিয়ে এনেছেন, তার সুলুকসন্ধান জরুরি।

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন