বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আফগানিস্তানে মার্কিন সুপারপাওয়ারের ‘কবর’ কেন রচিত হলো, তা নিয়ে অনেকে অনেক ধরনের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। এসব ব্যাখ্যা হয়তো আংশিক সত্য। তবে আমি এখানে একটা বিকল্প ব্যাখ্যা হাজির করার চেষ্টা করব। আফগানিস্তানে একটি অভিজাত রাষ্ট্রব্যবস্থা চালু হয়েছিল। বাইরের উদ্দীপক থেকে কৃত্রিমভাবে পুষ্টি জুগিয়ে সেটা টিকিয়ে রাখা হয়েছিল।

দাতাদের দেওয়া বড় অঙ্কের অনুদানে আফগানিস্তানে একটা নতুন অভিজাত শ্রেণি হঠাৎ করেই তৈরি হয়েছিল। বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলারের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) হজম করার মতো সামর্থ্য দেশটির ছিল না। ২০০১ সালে দেশটির জিডিপি ছিল মাত্র ৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০০ বিলিয়ন ডলারে। দেশটিতে ওয়ার লর্ড, সরকারি কর্মকর্তা, ধর্মীয় নেতা, মাদক পাচারকারীরা আগে থেকেই অভিজাততন্ত্রের অংশ ছিল। গত দুই দশকে ঠিকাদার, পণ্য সরবরাহকারী, পরিবহন ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, বিশেষজ্ঞ, ব্যাংকার ও সেনাবাহিনীর কমান্ডারদের একটা অংশ নতুন অভিজাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল।

বাইরের দখলদারির ফলে আফগানিস্তানের অভিজাত শ্রেণি ধারাবাহিকভাবে লাভবান হয়েছে। ব্যবসা, চাকরি এবং দুর্নীতি তাদের সম্পদকে স্ফীত করেছে। তারা এ সম্পদ আবার বিদেশে পাচার করেছে। মার্কিন বাহিনীর সহযোগিতায় প্রথম যারা কাবুল ত্যাগ করেছে, তারা এ অভিজাত শ্রেণি। সাম্প্রতিক সময়ে ফাঁস হয়ে যাওয়া কয়েকটি প্রতিবেদন থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের সত্যতা পাওয়া যাচ্ছে। গত দুই দশকে আফগানিস্তান থেকে দুবাইয়ে কয়েক বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে গেছে। এ টাকার একটি অংশ আবার আফগানিস্তানের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে এবং তালেবানের পুনরুত্থান ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিনষ্টের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।

এ চিত্রের বিপরীতে আফগানিস্তানে সাধারণ মানুষের দুর্দশার চিত্র তুলনা করুন। সেখানকার ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। তাদের সম্মানজনক কোনো চাকরি নেই, আয়ের স্থির কোনো উৎস নেই। মৌলিক সেবা থেকেও তারা বঞ্চিত। দাতারা স্কুল ও হাসপাতালের জন্য অনুদান দিয়েছে। কিন্তু সেই টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। কিংবা অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এখন যে প্রশ্নটি সামনে আসছে সেটা হলো, আফগান জনগণের কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই কী করে তালেবান এ রকম একটা জয় পেয়ে গেল। তালেবানের প্রথম দফার শাসনে অসংখ্য দুর্বলতা আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার পরও কেন আফগান জনগণ তালেবান-পরবর্তী সরকারগুলোকে বিশ্বাস করেনি? এর কারণ হচ্ছে তারা মনে করেছে, ২০০১-এর পর যে অবাধ দুর্নীতি সেখানে গেঁড়ে বসেছে, তালেবান শাসনে অন্তত সেটার পুনরাবৃত্তি হবে না।

২০০১-এর পরে বিদেশিরা আফগানিস্তানের ক্ষমতায় তাদের পুতুল সরকার বসিয়েছে। সরকার পরিচালনার আদেশ-নির্দেশ তারাই দিয়েছে। অর্থনৈতিকভাবেও তাদের মুখাপেক্ষী থাকতে হয়েছে। সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যদের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, অস্ত্রসজ্জা, বেতন-ভাতা—সবকিছুই ওই বিদেশিরা জোগান দিত। আফগান জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজে সেনা-পুলিশ ব্যবহার করা হতো না। আফগানিস্তানের সব প্রতিষ্ঠান কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। ২০২০ সালের নভেম্বরের দ্য ইকোনমিস্ট-এর প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, তালেবানের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নয়ন হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আফগান সাধারণ জনগণ মনে করেছিল, তালেবান এলে তাদের ছেলেরা অন্তত স্কুলে যেতে পারবে, অসুখ হলে চিকিৎসা পাবে।

নারী অধিকারকর্মীরা এখন সেখানে প্রতিবাদ করে ঠিক কাজটি করছেন। তালেবান শাসনে মেয়েদের স্কুলে যাওয়া এবং নারীদের বাইরে কাজ করার ক্ষেত্রে একটা বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। নগরের শিক্ষিত নারী ছাড়া আফগানিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নারীর দুর্দশা এতটুকুও লাঘব হয়নি। তাদের গড় আয়ু মাত্র ৪৫ বছর, আর গর্ভকালীন ও শিশু জন্ম দেওয়ার সময় মাতৃমৃত্যুর হার অনেক বেশি।

আফগানিস্তানের এ গল্পের শিক্ষা হচ্ছে, অভিজাতদের অপশাসন ও দুর্নীতি সংখ্যাগরিষ্ঠের কল্যাণের টাকা উজাড় করে ফেলে। সেটা জনগণের মধ্যে গুরুতর অসন্তোষ সৃষ্টি করে। এর ফলে রাষ্ট্রবহির্ভূত শক্তি ক্ষমতায় চলে আসে।

ডন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

ইশরাত হোসেন পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদ ও লেখক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন