বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সেই দৃশ্য যে বসনিয়ান দেখেছে, তার মনে স্থায়ীভাবে মানসিক আঘাতের ক্ষত তৈরি হয়েছে। সে সময় আমি আমার পরিবারের সঙ্গে বসনিয়ার বিহাকে থাকতাম। একদিন আমাদের বাড়ির পাশেই সার্বদের বিমান থেকে বোমা ফেলা হলো। আমি এবং আমার আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুরা প্রাণভয়ে দিগ্‌বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছুটতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর জাতিসংঘের একটা গাড়ি দেখে দৌড়ে গাড়ির কাছে গেলাম। আমি ভেবেছিলাম, গাড়িটা আমাদের উদ্ধার করতে এসেছে। কিন্তু দেখলাম গাড়ি থামল না। আমাদের অসহায়ভাবে ফেলে গাড়িটা চলে গেল। তখন মনে হচ্ছিল, আমরা মরি বা বাঁচি, তা নিয়ে পশ্চিমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। এরপর আমার বাবা এবং তঁার বন্ধুরা মিলে আমাকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। সেখানে পড়াশোনা করা এবং সম্মানজনক জীবন-জীবিকার মধ্য দিয়ে আমার সেই মনের ক্ষত হয়তো সেরেছে। কিন্তু যে হাজার হাজার বসনিয়ান পীড়নের শিকার হয়েছে, তাদের মধ্যে সেই ক্ষত সারানোর জন্য পশ্চিমা বিশ্ব কী করতে পেরেছে? সেই বঞ্চনার অনুভূতিই বিশ্বের সবচেয়ে সহিষ্ণু মুসলমানদের মনে চরমপন্থার ভাবনা জাগিয়ে তুলছে।

এবার আফগানিস্তানের দিকে তাকান। সেখানে যুগের পর যুগ সাধারণ মানুষ সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে। তারা প্রতিবারই দেখেছে, বাইরের শক্তিগুলো তাদের ‘সহায়তা’ করতে এসে শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসঘাতকতা করে চলে যায়। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য তাদের গ্রাস করে আছে। তাদের শিশুরা পড়াশোনা করার সুযোগ পাচ্ছে না। ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত কয়েক কয়েক লাখ আফগান নাগরিক মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছে। সেভ দ্য চিলড্রেনের হিসাব অনুযায়ী, গত ২০ বছরে আফগানিস্তানে ৩৩ হাজার শিশু নিহত হয়েছে। সর্বশেষ ঘটনায় গত আগস্টে আইএসকের ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলা চালায় বলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল। দেখা গেছে, ওই হামলায় এমন একটি পরিবারকে বোমা মেরে শেষ করে দেওয়া হয়েছে, যাদের সঙ্গে আইএসকের দূরতম সম্পর্কও নেই।

যুক্তরাষ্ট্র যাদের সন্ত্রাসী বলে নির্বিচার মেরেছে, তারা আফগানদের চোখে কেবলই সন্ত্রাসী নয়। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ তাদের মা, কেউ বাবা, কেউ ভাই, কেউবা বোন। শীতল যুদ্ধের সময় আফগানিস্তানে প্রথম যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করে। ১৯৭৮ সালে সোভিয়েত-সমর্থিত কমিউনিস্ট পার্টি আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করার পর যুক্তরাষ্ট্র এখানে নাক গলাতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্র অশিক্ষিত ও ধর্মপ্রাণ মুসলমান আফগানদের সোভিয়েতের বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে সহযোগিতা দেয়। নব্বইয়ের দশকের শেষে সোভিয়েতবিরোধী তালেবান ক্ষমতা দখল করে। এরপর সেই তালেবানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ২০০১ সালে যুদ্ধ করে তালেবান সরকারের পতন ঘটায়। এরপর থেকে সেখানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী কথিত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে হাজার হাজার মানুষ মেরেছে।

এই রক্তপাত ২০ বছর ধরে আফগানদের দেখতে হয়েছে। বারবার পশ্চিমাদের নেতিবাচক আচরণে সাধারণ আফগানদের মধ্যে পশ্চিমাদের সম্পর্কে অনাস্থা তৈরি হয়েছে। ২০০১ সালে, অর্থাৎ আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন যখন আফগানিস্তানে ছিলেন, তখন বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের সূচকে দেশটি ১৬ নম্বরে ছিল। আজ সেই দেশ সন্ত্রাসের তালিকায় ১ নম্বরে উঠে এসেছে। আর এর দায় আমাদেরই।

আল-জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

  • আমরা সাবিক এল রায়েস কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও লেখক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন