প্রশ্নটা তাই থেকেই যায়। ফিনিক্স পাখির মতো ছাই থেকে উঠে আসার শক্তি তাহলে তালেবানরা পেল কোথায়? এর উত্তরে অনেক কথা বলা যেতে পারে। আজকের আফগান সমস্যাকে সংযুক্ত করা যেতে পারে আফগান জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের নৃতাত্ত্বিক ও জনমিতির বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে, ইতিহাসের গর্ভ থেকে টেনে বের করে আরও অনেক উপাদান সংযুক্ত করা যেতে পারে বর্তমান সময়ের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে এবং সবই যৌক্তিক। তবে আমি সেদিকে যাব না, পাঠকের দৃষ্টিকে সীমিত রাখতে চাই গত ২০ বছর সময়ের ফ্রেমে।

প্রথমেই স্মরণ করতে চাই, ভূপ্রাকৃতিক গঠনের অনিবার্য ফলে দেশটির জনগোষ্ঠী শতাধিক গোত্রে বিভক্ত। এ পর্যন্ত আফগান ‘জাতি গঠনের’ কোনো কাজ না হওয়ায় এর জনমানসও গোত্রীয় মূল্যবোধ দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। এই মূল্যবোধের বাইরে কোনো কিছু তারা মেনে নিতে মোটেও প্রস্তুত নয়। দেখা গেছে, ইতিহাসের বিভিন্ন কালপর্বে যারাই তাদের এই মূল্যবোধ ভাঙতে চেষ্টা করেছে, তারা তারই বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। কমিউনিস্ট শাসন পতনের এটিও একটি অন্যতম কারণ। আশা করা হয়েছিল, ২০০১-এ এসে বিশ্বসম্প্রদায় অতীত থেকে শিক্ষা নেবে। কিন্তু নেয়নি। না নিয়ে উল্টো দেশটিতে পশ্চিমা ধাঁচের এক অতি আধুনিক গণতান্ত্রিক ধারণা চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করেছে, যা দেশটির বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বোধের একেবারেই বাইরে।

দ্বিতীয়ত, আফগানিস্তান হলো শুরা বা কাউন্সিলের দেশ। কেন্দ্র থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত রয়েছে অসংখ্য শুরা, কোনোটা স্থানিক শুরা, কোনোটা পেশাভিত্তিক। কিন্তু ২০০১-এর পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের এই শুরাগুলোকে অকার্যকর করে দিয়ে প্রতিটা স্তরে পশ্চিমা ধাঁচের আধুনিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে সচেষ্ট হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে, দেশের প্রতিটা জেলায় শুরা-ই-উলেসওয়ালি বা জেলা পরিষদ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও নতুন করে জেলা উন্নয়ন পর্ষদ (ডিস্ট্রিক্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যাসেম্বলি—ডিডিএ) তৈরি করা হয়, যা বিদ্যমান শুরা সদস্যদের অনেককেই নাখোশ করে তোলে। এসব কারণে অনিবার্য হয়ে ওঠে নতুন-পুরানের দ্বন্দ্ব, যা ছড়িয়ে যায় প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত। আর তালেবানরা জনমানসের সেই মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বেরই সুযোগ গ্রহণ করে জনগণকে খেপিয়ে তুলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে।
এরপরই বলব প্রশাসনিক অব্যবস্থার কথা। দীর্ঘ ২০ বছরেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আফগানিস্তানে একটি যুগোপযোগী প্রশাসনিক কাঠামো দাঁড় করাতে পারেনি।

তালেবান-উত্তর আফগানিস্তানে যে প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, তা আসলে দেশটির দীর্ঘদিনের যুদ্ধপতি বা ওয়ার লর্ডদের একটি পুনর্বাসন প্রকল্প মাত্র। স্মরণ করা যেতে পারে গত শতাব্দীর আশির দশক থেকে বড়-ছোট ৩০ থেকে ৪০ জন যুদ্ধপতি দেশটিকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এদের প্রত্যকেরই আছে স্থানীয় কমান্ডার; কমান্ডারদের আছে আবার সাব-কমান্ডার। ২০০১-এর পর থেকে এই কমান্ডার, সাব-কমান্ডাররাই জেলা পর্যায়ের সব পদ দখল করে আছে। সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকার কারণে এমনও দেখা গেছে যে আজকে যে ব্যক্তি ডিস্ট্রিক্ট গভর্নর, কাল হয়ে যাচ্ছে পুলিশ প্রধান। আবার উল্টোটাও ঘটছে। সিভিল সার্ভিসের এই অবস্থার কারণে সিভিল প্রশাসনের কোনোরূপ দায়বদ্ধতা ছিল না কারও প্রতি। তারা তাদের নিজ নিজ গোত্র বা ট্রাইবকে সেবা প্রদানই একমাত্র কাজ বলে বিবেচনা করত। এইভাবেই চলেছে এতটা বছর। প্রশাসনের নামে চলেছে দুর্নীতির খেলা। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ তাদের মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে সরকারের থেকে। কিন্তু সুযোগ ছাড়েনি তালেবান।

ভূপ্রাকৃতিক গঠনের অনিবার্য ফলে দেশটির জনগোষ্ঠী শতাধিক গোত্রে বিভক্ত। এ পর্যন্ত আফগান ‘জাতি গঠনের’ কোনো কাজ না হওয়ায় এর জনমানসও গোত্রীয় মূল্যবোধ দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। এই মূল্যবোধের বাইরে কোনো কিছু তারা মেনে নিতে মোটেও প্রস্তুত নয়। দেখা গেছে, ইতিহাসের বিভিন্ন কালপর্বে যারাই তাদের এই মূল্যবোধ ভাঙতে চেষ্টা করেছে, তারা তারই বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

বিচার বিভাগের চিত্র আরও করুণ। প্রতিটা জেলাতেই রয়েছে জেলা আদালত। স্বাভাবিকভাবেই আছে জেলা জজ, প্রসিকিউটর—সব। কিন্তু শুধু কাগজেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই থাকার সুব্যবস্থা এবং নিরাপত্তার অভাবের অজুহাতে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা কাবুলেই অবস্থান করতেন বেশি সময়। এই অবস্থায় সাধারণ মানুষ সরকারি প্রশাসনের কাছ থেকে কোনোরূপ বিচার পেত না। বাধ্য হয়ে তারা তালেবান কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হতো।

সরকারি প্রশাসন ও বিচার বিভাগের এই বাস্তবতায় প্রায় প্রতিটা জেলাতেই তালেবানরা গড়ে তোলে এক সমান্তরাল প্রশাসনিক কাঠামো, যেখানে তাদেরও ছিল গভর্নর, পুলিশ প্রধান এবং জেলা জজ। এই সমান্তরাল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার কাজটি চালু করেছিল অনেক অগেই, বলা চলে ২০০৫-২০০৬-এর দিক থেকেই। সরকারি লোকেরাও এটা জানতেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের মাঝে পারস্পরিক যোগাযোগও ছিল। আর এই যোগাযোগটার প্রয়োজনও ছিল। কারণ, তালেবানের সহযোগিতা ছাড়া গ্রাম পর্যায়ে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তালেবানরাও প্রকল্পের আর্থিক ভাগ পেত। এইভাবেই সরকার এবং তালেবানের মধ্যে একধরনের ‘পারস্পরিক লাভের’ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বলা বাহুল্য, এসব ক্ষেত্রে দর-কষাকষিতে তালেবানরাই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকত। এইভাবেই চলে আসছিল সেই ২০০৬ থেকে।

এদিকে এই ভূপ্রাকৃতিক অবস্থার কারণেই দেশটিতে এখন পর্যন্ত প্রত্যন্ত অঞ্চলের সঙ্গে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। সকল রাস্তাঘাট গিয়ে শেষ হয়েছে বড়জোর জেলা সদর পর্যন্ত। অথচ আফগান জনগোষ্ঠীর একটা বিশাল অংশ শহর থেকে দূরে প্রত্যন্ত গ্রামে বা বিভিন্ন উপত্যকায় বসবাস করে। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে, কিংবা গ্রাম থেকে শহরে আসতে এখনো গাধা বা ঘোড়া ব্যবহার করে। যোগাযোগের এই অবস্থার কারণে জনসংখ্যার একটা বড় অংশের সঙ্গে শাসকগোষ্ঠীর কোনো প্রত্যক্ষ কার্যকর সম্পর্ক কখনোই গড়ে ওঠেনি, না রাজতন্ত্রের আমলে, না কমিউনিস্ট আমলে, না গণতান্ত্রিক আমলে। এই বাস্তবতায়, জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ যখন শহরকেন্দ্রিক সুবিধাবাদী শ্রেণিকে নিয়ে ব্যস্ত, তালেবানরা তখন প্রত্যন্ত গ্রামের সাধারণ মানুষের মাঝে তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অ্যাজেন্ডা নিয়ে কাজ করেছে। এমন করেই তারা আফগানিস্তানের গ্রামাঞ্চলে একটা নীরব ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ সংঘটিত করেছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। শহরে যখন চলছে কারজাই কিংবা আশরাফ গনির প্রশাসন, কয়েক কিলোমিটার দূরেই তখন চলছে তালেবান প্রশাসন। কেউ খেয়াল করেনি গ্রামগুলো চলে গেছে দূরে, অনেক দূরে।

শেষ কিন্তু সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, দেশটির ভূপ্রাকৃতিক অবস্থার কারণে আফগান প্রতিরক্ষা বাহিনী ছিল প্রায় সর্বাংশে আকাশযাননির্ভর। এক ঘাঁটি থেকে অন্য ঘাঁটিতে যাতায়াত, রসদ সরবরাহ—সবকিছুই হতো হেলিকপ্টারে। কিন্তু গত ২০ বছরে মার্কিন সহায়তায় যে বাহিনী গড়ে তোলা হয়, তাতে তাদের শুধু সম্মুখযুদ্ধের জন্যই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। লজিস্টিকসসহ অন্যান্য টেকনিক্যাল বিষয়াদির নিয়ন্ত্রণ থেকে যায় মার্কিন বাহিনীর হাতেই। এই অবস্থায় গত মাসে (জুলাই ২০২১) মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গে তালেবান যোদ্ধারা যখন তাদের অফেন্সিভ শুরু করে, তার আগেই আফগান বাহিনীর আকাশপথের সাপোর্ট বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে তারা হয়ে যায় দিশেহারা। আত্মসমর্পণ ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় ছিল না। এমনও শোনা যায় যে আকাশযান নিয়ন্ত্রণের জন্য যে রাডার যন্ত্র ব্যবহার করা হয়, তার নিয়ন্ত্রণও ছিল মার্কিন বাহিনীর হাতে। তারা এই টেকনোলজি হস্তান্তর না করেই নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়।

উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা বলাই যায়, আমরা যাকে ঘর বলছি তা কোনো ঘরই ছিল না। এ ছিল ভুল মাটিতে ভুল সিমেন্ট-বালির ভুল মিশ্রণে গড়ে তোলা এক ভুল কাঠামো, মাটি পরীক্ষা না করেই গড়ে তোলা এক বহুতল ভবন। অন্য কথায় এ ছিল এক তাসের ঘর। একটু বাতাসেই তাই ভেঙে পড়েছে।

মোশতাক আহমেদ সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা, আফগানিস্তান। ই-মেইল: [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন