জাপানের রাজনীতিতে এতটা দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর এই বলিষ্ঠ উপস্থিতিকে দেখা হয় অনেকটা যেন ক্ষয়িষ্ণু একটি দলে নতুন জীবনীশক্তি এনে দিয়ে শক্ত ভিত্তির ওপর সেই দলকে আবারও দাঁড় করিয়ে দেওয়ার এক গৌরবগাথা হিসেবে। দ্বিতীয় মেয়াদে দীর্ঘ প্রায় আট বছর ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় তিনি চেষ্টা করে গেছেন বিশ্বজুড়ে জাপানের অর্থনৈতিক অবস্থানের শক্ত ভিতকে আরও বেশি মজবুত করে নিতে। সময় অবশ্যই সেই অর্থে তাঁর অনুকূলে ছিল না। বিশ্বজুড়ে চলমান অর্থনৈতিক অস্থিরতার মুখে তিনি কতটা সফল হবেন, সেই প্রশ্ন থেকেই গিয়েছিল। তবে তা সত্ত্বেও চেষ্টার কোনো রকম ত্রুটি তাঁর ছিল না, যদিও আবের সেই অর্থনৈতিক নীতিমালাকে বারবার প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। আবেনোমিক্স নামে যে নব্য উদার অর্থনৈতিক নীতিমালার ঘোষণা তিনি দিয়েছিলেন, বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে সেটা ছিল পশ্চিমের দেশে নব্য উদার অর্থনীতির নামে প্রবর্তিত সংস্কারের অনুরূপ। ফলে জাপানেও আবেনোমিক্সের সূত্র ধরে দেশের নব্য ধনিক শ্রেণি আরও বেশি সম্পদশালী হওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়। নাগরিকদের মধ্যে আয়ের বৈষম্য আরও প্রকট হয়ে ওঠে। তবে তা সত্ত্বেও পশ্চিমের মতো ধনী-দরিদ্রের বড় মাপের বিভাজন তা তৈরি করে দেয়নি এবং জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পেনশন ব্যবস্থার মতো কল্যাণ রাষ্ট্রের অনেক বৈশিষ্ট্য থেকে জাপান বের হয়ে যায়নি। এটাই সম্ভবত ছিল কিছুটা বিতর্কিত অর্থনৈতিক নীতি সত্ত্বেও আবের জনপ্রিয় রয়ে যাওয়ার পেছনের বড় একটি কারণ।

অন্যদিকে এশিয়ার সঙ্গে নতুন এক সম্পর্ক গড়ে নিতে আবে ছিলেন প্রয়াসী। বিশেষ করে ভারতে জাপানের বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করা এবং ভারতের সঙ্গে আরও নানা ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে নিতে তাঁর চালানো প্রচেষ্টাকে অনেকেই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন, যদিও চীনকে সংযত রাখার উদ্দেশ্য এর পেছনে ভালোভাবে যুক্ত ছিল। বাংলাদেশকেও আবে দেখেছেন বন্ধুপ্রতিম এক দেশ হিসেবে। আবের শাসনকালে ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্প জাপান চালু করে এবং বিশ্বব্যাংকের বাধা সৃষ্টির আগপর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পের সঙ্গেও জাপান ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল।

আরেকটি বড় যে স্বপ্ন আবে দীর্ঘ সময় ধরে দেখে গেছেন, তা হলো জাপানের সংবিধান আংশিকভাবে হলেও সংশোধন করে নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে শান্তি রক্ষার দায়িত্ব পালন জাপানের জন্য সহজ করে দেওয়া। ১৯৪৭ সাল থেকে কার্যকর জাপানের সংবিধানে কোনো রকম সংস্কার বা রদবদল একেবারেই করা হয়নি। এর পেছনের কারণ হচ্ছে, সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত যুদ্ধ পরিহারের নবম ধারা। শান্তিবাদীরা বলে আসছেন যে সংবিধান পরিবর্তনের ব্যবস্থা করে দেওয়া হলে কট্টরপন্থীরা সে সুযোগ গ্রহণ করে শুরুতেই নবম ধারার মূলে কুঠারাঘাত করতে পারেন। আবে অবশ্য ধারাটি বিলুপ্ত করে দেওয়ার উল্লেখ কখনো করেননি, বরং তিনি দেখতে চেয়েছিলেন বাক্যের বিন্যাস সেখানে যেন এভাবে করে নেওয়া হয়, যা কিনা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তি রক্ষায় ভূমিকা পালন জাপানের জন্য সহজ করে দেবে। এ ছাড়া জাপানের নিজস্ব সামরিক বাহিনী রাখার ওপর সংবিধানগত যে নিষেধাজ্ঞা, সেটারও নতুন ব্যাখ্যা তিনি নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। নবম ধারার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে জাপানের নিজস্ব সামরিক বাহিনী রাখার ওপর পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা আরোপ থাকায় জাপানকে এখনো কিছুটা রাখঢাক করে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে নিতে হচ্ছে। সামরিক ব্যয় এবং অস্ত্রবলের দিক থেকে জাপান অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি আড়াল করে রাখতে বাহিনীর নাম দেওয়া হয়েছে আত্মরক্ষা বাহিনী। সেই জটিলতা দূর করে নেওয়ার স্বপ্ন আবে দেখেছিলেন, যা কিনা এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত না হলেও বলা যায়, সেই পথে জাপান অনেকটা এগিয়ে গেছে।

জাপানের অন্য অধিকাংশ প্রশাসনের মতোই আবের প্রশাসনও দুর্নীতির অভিযোগ থেকে মুক্ত ছিল না। তবে সেই দুর্নীতি অবশ্য নাগরিক জীবনকে খুব বেশি ব্যাহত করেনি এবং অর্থের অঙ্কের দিক থেকেও তা ছিল পশ্চিমের অন্য অনেক দেশের তুলনায় যথেষ্ট নগণ্য।

দেশের ভেতর চালানো নানা রকম প্রচেষ্টার বাইরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও জাপানকে নতুন এক উচ্চতায় আবে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। সন্দেহ নেই, তাঁর শাসনকালেই চীনের সঙ্গে জাপানের সম্পর্কের যথেষ্ট অবনতি ঘটে এবং জাপান আরও ঘনিষ্ঠভাবে পশ্চিম, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সখ্য গভীর করে নেয়। তা সত্ত্বেও বলতে হয় যে আবের পররাষ্ট্রনীতি ছিল বর্তমানে আমরা যা লক্ষ করছি, তার চেয়ে অনেক বেশি নমনীয়। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করে নিয়ে উত্তর ভূখণ্ড নামে পরিচিত জাপানের উত্তরের প্রধান দ্বীপ হোক্কাইডোর অদূরের চারটি দ্বীপ নিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে রাশিয়ার সঙ্গে চলা বিরোধের গ্রহণযোগ্য একটি সমাধান তিনি খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন; যা কিনা দুই দেশের মধ্যকার অস্বাভাবিক সম্পর্কের অবসান ঘটানোর পথের সন্ধান দেবে। রাশিয়ার সঙ্গে জাপান এখনো কার্যত যুদ্ধ-অবস্থায় আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সংঘাতের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি টেনে রাশিয়া ও জাপানের মধ্যে এখনো কোনো শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। দায়িত্ব পালনের পুরো সময় ধরে আবে চেষ্টা করে গেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের পথের সেই বাধা দূর করে নিতে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ১৭বার তিনি সাক্ষাৎ করেছেন এবং বিতর্কিত দ্বীপের অতীতের জাপানি অধিবাসীদের উত্তরপুরুষের জন্য ভিসামুক্ত ভ্রমণের ব্যবস্থাও তিনি করে দিতে পেরেছিলেন। তবে এর বাইরে খুব বেশি অগ্রসর হওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা রকম টানাপোড়েন এর জন্য মূলত দায়ী।

অন্যদিকে এশিয়ার সঙ্গে নতুন এক সম্পর্ক গড়ে নিতে আবে ছিলেন প্রয়াসী। বিশেষ করে ভারতে জাপানের বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করা এবং ভারতের সঙ্গে আরও নানা ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে নিতে তাঁর চালানো প্রচেষ্টাকে অনেকেই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন, যদিও চীনকে সংযত রাখার উদ্দেশ্য এর পেছনে ভালোভাবে যুক্ত ছিল। বাংলাদেশকেও আবে দেখেছেন বন্ধুপ্রতিম এক দেশ হিসেবে। আবের শাসনকালে ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্প জাপান চালু করে এবং বিশ্বব্যাংকের বাধা সৃষ্টির আগপর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পের সঙ্গেও জাপান ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। ফলে আবের বিদায়ে বাংলাদেশও হারিয়েছে ঘনিষ্ঠ এক জাপানি বন্ধুকে।

মনজুরুল হক জাপান প্রবাসী শিক্ষক ও সাংবাদিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন