বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সংস্কৃত শব্দ ‘কমল’ বা পদ্মফুল হলো এই নামের উৎস। নিজের তামিল পরিবারে তিনি কমলা নামে পরিচিত। ২০১৯ সালে প্রকাশিত আত্মজৈবনিক দ্য ট্রুথ উই হোল্ড গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, তাঁর প্রথম নামের শুদ্ধ উচ্চারণ ‘কমা-লা’, যেমন যতিচিহ্ন ‘কমা’ উচ্চারণ করা হয়। শুধু নাম নয়, তাঁর জন্মসূত্র নিয়েও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। ১৯৬৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় জন্মগ্রহণকারী কমলা জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিক হলেও ট্রাম্পের প্রচারাভিযানের সভাপতি ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে তাঁর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। একজন রক্ষণশীল আইনজীবীর উদ্ধৃতি দিয়ে ট্রাম্পের ক্যাম্পেইন থেকে বলা হয়েছে, কমলা হ্যারিসের পিতা-মাতা উভয়েই অভিবাসী হওয়ায় ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে তাঁর নির্বাচন বৈধ কি না, তা একটি ন্যায্য প্রশ্ন। মার্কিন শাসনতন্ত্রের ১৪তম সংশোধনী অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী সবাই এ দেশের নাগরিক। ১৮৯০ সাল থেকে এ আইন বহাল রয়েছে। মার্কিন শাসনতন্ত্র অনুসারে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী মার্কিন নাগরিকের পক্ষেই দেশের প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার বৈধতা রয়েছে, সে পূর্বশর্ত কমলা হ্যারিস অবশ্যই পূরণ করেন।

আরেক বিতর্ক কমলা কতটা কালো, সেই প্রশ্নে। অর্ধেক জ্যামাইকান, অর্ধেক ভারতীয় কমলা কারও কারও কাছে যথেষ্ট কালো নন। এই তর্কে ইন্ধন জোগাচ্ছেন ট্রাম্প–সমর্থকেরা। যেমন রেডিও হোস্ট মার্ক লেভিন বলেছেন, কমলা মোটেই আফ্রিকান-আমেরিকান নন, তিনি ভারতীয় ও জ্যামাইকান। ট্রাম্পের আরেক সমর্থক কট্টর বর্ণবাদী দিনেশ ডি সুজা বলেছেন, কমলার মা–বাবা কেউ দাস বা দাস বংশোদ্ভূত নয়। ফলে তাঁকে কৃষ্ণাঙ্গ বলা যায় না। তবে আফ্রিকান-আমেরিকান বুদ্ধিজীবীরাই এ যুক্তি খণ্ডন করেছেন। নিউইয়র্ক টাইমস–এর ভাষ্যকার জামেল বুইই বলেছেন, কালো কোনো রেইস বা জাতি নয়। কালো মানুষেরা নিজেদের কালো মানুষ হিসেবে পরিচিত করেনি। এটা আসলে একটা মতাদর্শ, যার লক্ষ্য কৃষ্ণাঙ্গদের মানবেতর প্রমাণ করা। কমলা নিজে বলেছেন, ‘আমি একজন কালো মানুষ, এটাই শেষ কথা। আমার জন্ম কালো মানুষ হিসেবে, আমার মৃত্যুও হবে কালো মানুষ হিসেবে। যারা আমার জন্ম-পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, তারা আসলে বিভক্তি ও বিদ্বেষ ছড়াতে চায়। একই ঘটনা ঘটেছিল বারাক ওবামার ক্ষেত্রে।’

তবে যত যুক্তিপূর্ণভাবে কমলা নিজেকে কালো বলুন না কেন, এ প্রশ্ন তাঁকে তাড়া করে ফিরবেই। তিনি সচ্ছল পরিবারের সন্তান, তাঁর অভিজ্ঞতা অধিকাংশ আফ্রিকান-আমেরিকানের অভিজ্ঞতা নয়। এ কথা ওবামার ক্ষেত্রেও খাটে। সেই কারণে ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে আফ্রিকান-আমেরিকানদের মধ্যে ওবামা তেমন জনপ্রিয় ছিলেন না। নিজের কথার ও কাজের মিল প্রমাণ করে তাঁকে কালো মানুষের সমর্থন আদায় করে নিতে হয়েছে। কমলা হ্যারিসকেও তা–ই করতে হবে।

প্রশ্ন উঠেছে, কমলার মনোনয়ন কি কালো মানুষদের দলে আনার রণকৌশল, না সংখ্যালঘুর অধিকারের প্রতি এই দলের নীতিগত অবস্থানের প্রকাশ? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই দলের শক্তি বহুলাংশে এসেছে অশ্বেতাঙ্গ, বিশেষত আফ্রিকান-আমেরিকানদের কাছ থেকে। নাগরিক সমানাধিকারের প্রশ্নে ডেমোক্রেটিক পার্টি মুখে যত কথাই বলুক, ক্ষমতায় থাকার সময় এই দলের নেতৃত্ব প্রকৃত সমতা অর্জনে আগ্রহী হয়নি। ১৯৯৬ সালে বিল ক্লিনটনের আমলে নাগরিক কল্যাণ ব্যবস্থা সংস্কারের নামে যে আইন প্রণয়ন করা হয়, তাতে কালো মানুষদের রাষ্ট্রের বোঝা ছাড়া আর কিছুই ভাবা হয়নি। বহু পরে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্য বিমোচন। সে কাজে আমরা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছি।’ পুলিশ ও জেল ব্যবস্থা সংস্কারের ব্যাপারেও ডেমোক্র্যাটদের অঙ্গীকার মুখের কথায় সীমাবদ্ধ থেকেছে। কমলার ব্যাপারে অন্য আরেক সমালোচনা, ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল থাকাকালে তিনি কালো মানুষদের সঙ্গে থাকার বদলে পুলিশি স্বার্থ রক্ষা করেছেন। আইনশৃঙ্খলা প্রশ্নে তাঁর কঠোর অবস্থানের কারণে কমলা নিজেই নিজেকে একসময় ‘টপ কপ’ বা পয়লা নম্বর পুলিশ বলে ঢেঁড়া পিটিয়েছিলেন। ক্যালিফোর্নিয়ার আইন পরিষদ পুলিশের হাতে নিহত হওয়ার ঘটনা তদন্তের ভার তাঁর হাতে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু কমলা তার বিরোধিতা করেন। তিনি যুক্তি দেখিয়েছিলেন, এটা তাঁর কাজ নয়; স্থানীয় ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির। টহলরত পুলিশের সঙ্গে বডি ক্যামেরা রাখার প্রস্তাবেরও তিনি বিরোধিতা করেছিলেন।

এ সমালোচনার কথা কমলা জানেন। সম্ভবত সে কারণে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর দেশজুড়ে যে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলন গড়ে ওঠে, তিনি কংগ্রেসের ভেতরে ও বাইরে তার প্রবল সমর্থক হয়ে ওঠেন। বাইডেন ক্যাম্পেইন মনে করে, কমলার মনোনয়নের ফলে আফ্রিকান-আমেরিকান ও অন্যান্য সংখ্যালঘু মানুষের মধ্যে লক্ষণীয় উৎসাহের সঞ্চার হবে। সেই অঙ্ক মাথায় রেখেই তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক জরিপ থেকে সে কথার প্রমাণও মিলেছে। কমলার নাম ঘোষণার পর প্রথম দুই দিনে তহবিল সংগৃহীত হয়েছে ৪৮ মিলিয়ন ডলার। দলের নির্বাচনী কনভেনশনের চার দিনে সংগৃহীত হয়েছে আরও ৭০ মিলিয়ন ডলার, যার অধিকাংশই এসেছে সাধারণ ভোটারদের কাছ থেকে।

ডেমোক্র্যাটদের জন্য এটি গভীর আশার কথা। তবে বাইডেন বা কমলা নয়, ডেমোক্র্যাটদের আশার প্রকৃত উৎস ট্রাম্প নিজে। তাঁর প্রতি অসন্তোষ এত তীব্র যে এবার রিপাবলিকানদের জন্য এক ‘নীল সুনামি’ অপেক্ষা করছে। দলনিরপেক্ষ হিসেবে পরিচিত কুক পলিটিক্যাল রিপোর্ট মন্তব্য করেছে, দেশের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে, তারা পরিবর্তন চায়।


হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন