করোনা: রোগ মুক্তিতেই সমাধান মিলবে না

কোভিড-১৯ প্রত্যেককেই কড়া আঘাত করছে। সব দেশের সরকারি নেতারা এটিকে এমন একটি দৃষ্টান্তমূলক আঘাত হিসেবে দেখছেন, যা থেকে আধুনিক সমাজকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বের করে নিয়ে আসা দরকার বলে মনে করছেন তাঁরা। নীতিনির্ধারকেরা ওষুধশিল্প এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে এমন একটি উপায় বের করার চেষ্টা করছেন, যাতে কোভিড-১৯–এর হুমকির কারণে অতিগুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়। আমরা কীভাবে এখন আরও গুছিয়ে উঠতে পারি, তাঁরা সেই উপায় জানার চেষ্টা করছেন।

কিন্তু বাস্তবতা হলো কোভিড-১৯ মহামারির আরও একটি আঘাত আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে। সেই আঘাত আমাদের সরাসরি শারীরিকভাবে আক্রান্ত করবে না, কিন্তু অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে আমাদের বিপন্ন করে তুলবে। আমাদের মনে রাখা দরকার, এ ভাইরাস এমন একটি সত্তা, যার মানুষের মতো বিবেচনা শক্তি নেই এবং এটি পদার্থবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের বাঁধাধরা নিয়মে আবদ্ধ। এ ভাইরাস বেছে বেছে মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে না। নিতান্ত ঘটনাচক্রে আমরা এর দ্বারা ‘সাজা’ পাচ্ছি।

শুধু বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি আমাদের রক্ষা করতে পারবে না। বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বিপণনব্যবস্থাকে ঠিক রাখার পেছনে বড় দেশগুলোকে বড় ধরনের ছাড় দিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। কোনো সরকার যদি এ মহামারিকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানোর কথা ভাবে, তাহলে তাদের মাধ্যমে যে বৈশ্বিক ক্ষতি হবে, তার ভাগ তাদেরও নিতে হবে

যদিও ভাইরাসটি একেবারে নতুন প্রজাতির এবং সাধারণ ভাইরাসের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর, তবে প্লেগের মতো এটি ধ্বংসাত্মক মহামারি হিসেবে এখনো আমরা এটিকে দেখতে পাচ্ছি না। তবে এ মহামারি মোকাবিলায় কোনো ধরনের পূর্বপ্রস্তুতি না থাকায় আমাদের পরিস্থিতি সামাল দিতে বেগ পেতে হচ্ছে। সমস্যা হলো সবাই এ মহামারি থেকে দ্রুত আরোগ্যের পথ খুঁজছেন, কিন্তু আরোগ্যের পরবর্তী পরিস্থিতি মাথায় রাখছেন না। বেশির ভাগ নীতিনির্ধারক বুঝতে পারছেন না, বড় আঘাত সামনে আসছে। কোভিড–পরবর্তী অস্থিরতা ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রব্যবস্থা পর্যন্ত বিস্তার লাভ করতে পারে।

করোনার অভিঘাতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে বাজারব্যবস্থা। এত দিন ধরে বিশ্ব যে বাজার ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছে, কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সেই ব্যবস্থাপনা ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক বেসরকারি খাতগুলোর সরবরাহব্যবস্থা ব্যাপকভাবে পাল্টে যাচ্ছে। বিশ্ববাজারের ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে গিয়ে গোটা ব্যবস্থাপনা নতুন আদল নিচ্ছে। এ নতুন আদলের সঙ্গে অনেক দেশই খাপ খাওয়াতে পারছে না। এ পরিস্থিতি আরও কতটা অবনতির দিকে যাবে, তা আমরা কেউই বলতে পারছি না। সে কারণে শুধু কোভিড-১৯–এর সংক্রমণ থেকে রেহাই পাওয়ার মধ্যে এর সমাধান নেই।

বিশেষজ্ঞরা সরকারগুলোকে কোভিড-১৯–এর কারণে পাল্টে যাওয়া পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পরামর্শ দিচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, রাজনৈতিক নেতাদের আশপাশের অঞ্চলের সঙ্গে কোভিড-১৯ পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের চুক্তিতে আসা দরকার, যাতে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জগুলো সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়।

এর বাইরে আমাদের মনে রাখা দরকার শুধু বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি আমাদের রক্ষা করতে পারবে না। বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বিপণনব্যবস্থাকে ঠিক রাখার পেছনে বড় দেশগুলোকে বড় ধরনের ছাড় দিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। কোনো সরকার যদি এ মহামারিকে সুযোগ হিসেবে
কাজে লাগানোর কথা ভাবে, তাহলে তাদের মাধ্যমে যে বৈশ্বিক ক্ষতি হবে, তার ভাগ তাদেরও নিতে হবে। সরকারগুলোকে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি সামাজিক জাগরণ সৃষ্টি করতে হবে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

এইচ টি গোরানসন গ্রিফিত ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর ইন্টেগ্রেটেড ইন্টেলিজেন্ট সিস্টেমের সাবেক উপপরিচালক এবং বেথ কার্ডিয়ার গ্রিফিত ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টেড অটোনমাস সিস্টেম ডিফেন্স কো-অপারেটিভ রিসার্চ সেন্টারের একজন ফেলো