আমরা সব সময় শরণার্থীদের সঙ্গে মানবতা ও সম্মানের সঙ্গে আচরণ করেছি। তুর্কি জনগণ দুই হাত বাড়িয়ে উদ্বাস্তুদের স্বাগত জানায় এবং বছরের পর বছর ধরে তাদের সঙ্গে নিজেদের রুটি ভাগ করে খায়। ইউরোপে যেখানে অনেক রাজনীতিবিদ ভোটারের মন জয় করতে, অর্থাৎ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে নিয়মিত অভিবাসনবিরোধী বক্তব্য দিয়ে থাকেন, সেখানে তুর্কি নেতৃত্ব দেশটিতে শরণার্থীবিরোধী মনোভাব জাগানোর জন্য দেশীয় বিরোধীদের প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করে থাকেন।

সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কাকে অজুহাত হিসেবে সামনে এনে তুর্কি সরকার শরণার্থীদের বলির পাঁঠা বানাতে অস্বীকার করে। শরণার্থীরা যেখান থেকেই আসুক না কেন, তারা সবাই তুর্কিতে একটি সত্যিকারের আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে।

কিন্তু কীভাবে তুরস্ক এত বড় কাজ করল?

তুরস্ক সরকার একেবারে শুরু থেকেই শরণার্থীদের তার ভূখণ্ডে কেন ও কীভাবে স্বাগত জানাবে, সে বিষয়ে স্বচ্ছ ছিল। তুরস্ক সব সময়ই তার জনগণকে বুঝিয়ে এসেছে, ভিটেমাটি ছেড়ে যে হতভাগ্য মানুষগুলো আশ্রয়ের জন্য এসেছে, তারা এ যুদ্ধের জন্য দায়ী নয়। তুরস্কের মানুষও সিরিয়ায় কী ঘটছে, তা প্রথম থেকেই জেনে আসছে। তুরস্ক সরকারও তার জনগণকে প্রথম থেকেই সিরিয়ার বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে ধারণা দিয়ে এসেছে। সেখানকার মানুষ কতটা দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে পড়েছে, তা তাদের অবগত করে আসছে। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ব্যক্তিগতভাবে তুর্কি জনগণকে সিরিয়ার মানুষের অবস্থার কথা জানিয়েছেন।

তুরস্ক তার ভূমিতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের বিষয়ে কোনো ধরনের বৈষম্য করেনি। ধর্ম, জাতি, গোত্র, লিঙ্গ—এসবের ভিত্তিতে কোনো শরণার্থীর সঙ্গে আলাদা ধরনের কোনো আচরণ করেনি। সিরিয়া থেকে পালিয়ে আসা সবাইকে আমরা বাহু প্রসারিত করে স্বাগত জানিয়েছি। বাশার আল–আসাদের নির্যাতন থেকে পালিয়ে আসা আরব, আইএসের তাড়া খেয়ে জীবন নিয়ে পালিয়ে আসা কুর্দি, ওয়াইপিজির দ্বারা নির্যাতিত হয়ে পালিয়ে আসা তুর্কমান—যারাই হোক না কেন, সবাই সমান মর্যাদায় এ দেশে আশ্রয় পেয়েছে।

ইউরোপীয় নেতারা যেভাবে তাঁদের দেশে কট্টর দক্ষিণপন্থী ও শরণার্থীবিরোধী আন্দোলনকারীদের মাথাচাড়া দিতে দিয়েছেন এবং তাঁদের দেশে শরণার্থীবিরোধী জনমত গঠনে পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছেন, তুরস্কের নেতারা তা করেননি। বরং তুরস্কে যাতে কোনো ধরনের শরণার্থীবিরোধী প্রচার-প্রোপাগান্ডা না চলে, সে জন্য কঠোরভাবে এসব আন্দোলন দমন করেছে।

আমাদের সরকার সব সময়ই এটা মাথায় রেখেছে, একটি সফল শরণার্থী নীতি তৈরি করতে হলে শরণার্থীদের বিষয়ে সরকার ও জনগণের মধ্যে স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে। শরণার্থীদের বিষয়ে জনগণের কাছে কোনো কিছু রাখঢাক করা যাবে না।

এ ছাড়া শরণার্থী নীতি তৈরির সময় এনজিওগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তুরস্ক প্রথম থেকেই এনজিওগুলোকে শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করেছিল। এর ফলে তুরস্ক ও সিরিয়ার সীমান্তে থাকা শরণার্থীদের এনজিওগুলো আগাম সহায়তা দিতে পেরেছিল। এতে রাষ্ট্রের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, তুরস্ক তার ভূমিতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের বিষয়ে কোনো ধরনের বৈষম্য করেনি। ধর্ম, জাতি, গোত্র, লিঙ্গ—এসবের ভিত্তিতে কোনো শরণার্থীর সঙ্গে আলাদা ধরনের কোনো আচরণ করেনি। সিরিয়া থেকে পালিয়ে আসা সবাইকে আমরা বাহু প্রসারিত করে স্বাগত জানিয়েছি। বাশার আল–আসাদের নির্যাতন থেকে পালিয়ে আসা আরব, আইএসের তাড়া খেয়ে জীবন নিয়ে পালিয়ে আসা কুর্দি, ওয়াইপিজির দ্বারা নির্যাতিত হয়ে পালিয়ে আসা তুর্কমান—যারাই হোক না কেন, সবাই সমান মর্যাদায় এ দেশে আশ্রয় পেয়েছে।

আমরা তাদের জাতি, ধর্মীয় বিশ্বাস বা তাদের পটভূমি–নির্বিশেষে সংঘাতের শিকার সবার সঙ্গে একই আচরণ করেছি। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, শরণার্থীদের তাদের ধর্ম বা গায়ের রং অনুসারে বাছাই করা নৈতিকভাবে নিন্দনীয় হবে। আমরা আরও বুঝতে পেরেছি, এ ধরনের বৈষম্যমূলক আশ্রয়নীতি যেকোনো দেশে বিদেশিবিদ্বেষ এবং বর্ণবাদের ধ্বংসাত্মক তরঙ্গকে উসকে দিতে পারে।

আজ দুঃখজনকভাবে কিছু ইউরোপীয় দেশ এ ফাঁদে পড়েছে এবং শরণার্থীদের চেহারা ও গায়ের রঙের ভিত্তিতে তারা ইউক্রেনের উদ্বাস্তুদের গ্রহণ করছে। একটি বড় সামরিক সংঘাতের শিকার হওয়া মানুষের সাংস্কৃতিক সখ্য কখনোই একটি শরণার্থী নীতি তৈরির ভিত্তি হওয়া উচিত নয়।

তৃতীয়ত, শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় সফল হতে হলে অবশ্যই আন্তর্জাতিক সংহতি দরকার। সব পক্ষ অল্প অল্প করে দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিলে তা কোনো একক দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায় না। কিন্তু তুরস্ক কখনোই এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা পায়নি। ইউক্রেন ইস্যুতে পশ্চিমাদের সেই ধরনের ভুল করা মোটেও ঠিক হবে না। এ ক্ষেত্রে পরস্পরকে সহযোগিতা করতে হবে।

আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত

ফাহরেত্তিন আলতুন তুরস্কের প্রেসিডেন্টের যোগাযোগবিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন