ইউক্রেন যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যদিও যুদ্ধ শেষ হওয়া এবং মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোটাই এখন ইউক্রেনের মৌলিক স্বার্থ। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির কাছে শান্তির অন্বেষণ শর্তসাপেক্ষ একটি বিষয়। ইউক্রেনের যে ভূখণ্ড রাশিয়া অধিকার করে নিয়েছে, সেটা ফেরত চান তিনি। তাঁর দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হোক, সেই নিশ্চয়তাও তিনি চান। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ইউক্রেনের যুক্ত হওয়ার বিষয়টিও সেখানে রয়েছে। যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে রাশিয়ার যারা জড়িত, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার শর্তও তিনি দিয়েছেন।

পক্ষান্তরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকেও তাঁর দেশে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। ইউক্রেনে তিনি যে ব্যয়বহুল আগ্রাসন চালিয়েছেন, সেটার একটা ফল বের করে আনা তাঁর জন্য প্রয়োজন। না হলে দেশের মধ্যে তাঁর অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে। আপাতদৃষ্টিতে দুই দেশের এই বিরোধপূর্ণ অবস্থানের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে এনে শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ খুবই সীমিত। এ থেকে ধারণা করা যায় যে চলমান সংঘাত শুধু কয়েক মাস নয়, কয়েক বছর স্থায়ী হতে পারে। রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এ বিষয়ই দৃশ্যপট হয়ে উঠতে পারে।

কূটনীতিকে জাতীয় নিরাপত্তার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে, সেটাকে নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করা যাবে না। রাশিয়ার সঙ্গে কূটনীতির ক্ষেত্রে সেটা অনুসরণ করতে হবে। রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর বেসামরিক ও সামরিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু হওয়া প্রয়োজন। ভুল-বোঝাবুঝির ঝুঁকি কমাতে এবং সীমিত পরিসরে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র রয়েছে, সেই সুযোগকে কাজে লাগাতেই আলোচনা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

পশ্চিমের জন্য সম্ভাব্য একটা করণীয় হতে পারে রাশিয়া ইউক্রেনে কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে মস্কোর সঙ্গে সম্পর্কটা তৈরি করা। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিলে সেটা ভুল হবে। কেননা, রাশিয়া পশ্চিমের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনেক বিষয়ে প্রভাবিত করতে পারে। যেমন ইরান ও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সামর্থ্যকে সীমিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করতে পারে রাশিয়া; আবার জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে বৈশ্বিক যে প্রচেষ্টা, তাতেও বড় ভূমিকা পালন করতে পারে দেশটি।

বন্দী বিনিময়ের এই ঘটনা নিশ্চয়ই ভালো খবর। এ থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট যে ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গভীর বিরোধ থাকলেও দুই পক্ষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সেটি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। এ ধরনের সহযোগিতার সম্পর্ক রক্ষা করার জন্য নমনীয় ও সুশৃঙ্খল কূটনীতি প্রয়োজন।

এ ধরনের কূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। এমনকি ইউক্রেনে তাদের উদ্দেশ্য সাধনের সীমাও সীমিত করে আনতে হবে। এর মানে হচ্ছে, মস্কোয় পুতিনের শাসনের অবসানের মতো কথাবার্তা বলা থেকে তাদের সরে আসতে হবে। আমাদের যা ইচ্ছা তা দিয়ে নয়, বরং যা আছে তা-ই দিয়েই রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করতে হবে। পুতিন সম্ভবত তাঁর নিজ দেশের মধ্যেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছেন, অথবা খবরে যেমনটা এসেছে, স্বাস্থ্যগত কারণেই তিনি নিজ থেকেই দমে যেতে পারেন। পুতিনকে অপসারণ করার অবস্থান থেকে পশ্চিমাদের সরে আসতে হবে।

একইভাবে, পশ্চিমা সরকারগুলোকে অবশ্যই রাশিয়ার শীর্ষ কর্মকর্তাদের যুদ্ধাপরাধ আদালতে বিচার করার দাবি থেকে সরে আসতে হবে। এ ছাড়া ইউক্রেনে অবস্থানরত রাশিয়ার জ্যেষ্ঠ জেনারেল এবং যুদ্ধজাহাজের অবস্থান-সম্পর্কিত তথ্য জেলেনস্কির সরকারকে সরবরাহ থেকেও সরে আসতে হবে।

যে যুদ্ধ নিজের ইচ্ছাতেই বেছে নিয়েছে রাশিয়া, তাতে অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তারা। এখন যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন যে মন্তব্য (যুদ্ধকে ব্যবহার করে রাশিয়াকে দুর্বল করার উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রের নেই) করেছেন, সেটার বিপরীত কিছু তারা করছে না। যুক্তরাষ্ট্রকে যে বিষয়টির ওপর জোর দেওয়া উচিত সেটা হলো, ইউক্রেনের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধের অবসান যাতে হয়, সে চেষ্টা করা।

যুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোকে এখন ইউক্রেনকে অস্ত্রের জোগান অব্যাহত রাখতে হবে এবং সেই সঙ্গে যুদ্ধের ব্যাপ্তি ও তীব্রতা যাতে না বাড়ে, সে জন্য সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকতে হবে। পশ্চিমাদের এই সংযমের পেছনের কারণটি ক্রেমলিনের বোঝা উচিত। ন্যাটোর কোনো সদস্যকে ইউক্রেন যুদ্ধে না জড়ানো কিংবা গণবিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি তারা দিয়েছিল।

পশ্চিমকে এখন ইউক্রেন যুদ্ধে তাদের লক্ষ্যটা কী এবং সেটা কীভাবে অর্জন করা যাবে, বিষয়টি খুব সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। লক্ষ্যটা এমন হতে পারে যে ইউক্রেন তার সব ভূখণ্ডই নিয়ন্ত্রণ করবে, কিন্তু ক্রিমিয়াকে অথবা পূর্ব দনবাসের সব অঞ্চলকে মুক্ত করার চেষ্টা করা তাদের জন্য প্রয়োজনীয় নয়। এ ধরনের কিছু উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য কূটনীতি কিংবা কিছু ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা সহজ করার পথ বেছে নেওয়াটাই পশ্চিমের জন্য উত্তম। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত রাশিয়ার আচরণ পরিবর্তন না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখতেই হবে। জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা বাড়াতে হবে। কেননা, জ্বালানি রপ্তানির আয় থেকেই রাশিয়া যুদ্ধ চালাচ্ছে।

কূটনীতিকে জাতীয় নিরাপত্তার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে, সেটাকে নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করা যাবে না। রাশিয়ার সঙ্গে কূটনীতির ক্ষেত্রে সেটা অনুসরণ করতে হবে। রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর বেসামরিক ও সামরিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু হওয়া প্রয়োজন। ভুল-বোঝাবুঝির ঝুঁকি কমাতে এবং সীমিত পরিসরে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র রয়েছে, সেই সুযোগকে কাজে লাগাতেই আলোচনা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

এটা সত্য যে পুতিনের যুগ শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাশিয়ার সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক তৈরি হবে না। কিন্তু অন্তর্বর্তী এই সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক যাতে একেবারে বিনষ্ট না হয়, সেই চেষ্টা করে যাওয়ার বিকল্প কি আছে পশ্চিমের কাছে?

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনুবাদ মনোজ দে
রিচার্ড হাস কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের প্রেসিডেন্ট

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন