বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বিশেষত পণ্য পরিবহনে কনটেইনার ব্যবহার, টেলিকমিউনিকেশন ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের কারণে দ্বিতীয় যুদ্ধ–পরবর্তীকালে বিশ্বায়নের আবার দ্রুত প্রসার ঘটে, যা সম্পদ সৃষ্টি এবং মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে অভাবনীয় অবদান রাখে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক রাষ্ট্র ও চীন বিশ্বায়নের এ ঢেউকে কাজে লাগিয়ে প্রভূত সম্পদশালী হয়। বাংলাদেশেও তার তৈরি পোশাক ও জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে এ সমৃদ্ধির অংশীদার হয়।

উন্নত দেশগুলো, বিশেষত যাদের মুদ্রার রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে বিশ্ববাজারে বেশি চাহিদা, তারা বিশ্বায়নের কারণে অপেক্ষাকৃত বেশি লাভবান হয়েছিল। কারণ, তারা নিজেদের উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানি না করেই বিদেশে উৎপাদিত পণ্য নিজেদের মুদ্রার বিনিময়ে আমদানি করে ভোগ করতে পারত। ডলারকে রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহারের কারণে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জীবনমানে অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি আনে। কারণ, তারা নিজেদের উৎপাদিত পণ্যের পাশাপাশি রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে বিশ্ববাজারে ডলারের ব্যাপক চাহিদার সুবাদে সহজে বিদেশে উৎপাদিত পণ্য উপভোগ করতে পারত। তবে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় অনেক শিল্পপণ্যের উৎপাদন, শ্রমমূল্যের ব্যাপক পার্থক্যের কারণে, উন্নত দেশগুলো থেকে ক্রমাগতভাবে অনুন্নত দেশগুলোতে স্থানান্তরিত হতে থাকে, যার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে উচ্চ মজুরিতে নিযুক্ত শিল্পশ্রমিকেরা বেকার হয়ে যান এবং একসময়ের শিল্পসমৃদ্ধ এলাকাগুলো ‘রাস্টবেল্টে’ বা ঝাং-ধরা এলাকায় পরিণত হয়।

বিশ্বায়নের এমন অসম প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের মতো অনেক উন্নত দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভয়াবহ প্রভাব সৃষ্টি করে। এসব দেশে জাতীয়তাবাদ, সাংস্কৃতিক সংঘাত ও লোকরঞ্জনবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ স্লোগান এবং কিছু আমদানির ওপর ট্যারিফ আরোপ যার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এসব কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রসার হ্রাস পেয়েছে। ইকোনমিস্ট–এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বিশ্ব জিডিপির তুলনায় বিশ্ব বাণিজ্য ৫ শতাংশ কমেছে। বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় আরেকটি বড় ধাক্কা পড়েছে গত দুই বছরের করোনাভাইরাস অতিমারির কারণে। এর ফলে আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়েছে এবং বিশ্ব বাণিজ্যে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে।

অতিমারির প্রভাব না কাটতেই মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ইউক্রেন যুদ্ধ। দ্রুত ইউক্রেন দখল করে একটি অনুগত সরকার সেখানে প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় নিয়ে ভ্লাদিমির পুতিন প্রায় দেড় মাস আগে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ শুরু করলেও, এটি দ্রুত শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এ কারণে বিশ্ব বাণিজ্য গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সারা পৃথিবীর অর্থনীতিতে। বিশ্ব বাণিজ্যের প্রাক্কলিত অগ্রগতির হার ৪ দশমিক ৭ শতাংশের অর্ধেকে নেমে আসবে এবং বিশ্ব অর্থনীতিও সংকুচিত হবে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো, পল ক্রুগম্যানের মতে, হয়তো অপেক্ষাকৃত সহজে এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবে, কিন্তু এতে বাংলাদেশের বিকাশমান অর্থনীতি চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ঝুঁকিকে পড়ার আরও অনেক কারণ রয়েছে। রপ্তানিতে বহুমুখিতার অভাব। রপ্তানি বাণিজ্য বহুলাংশে তৈরি পোশাক ও জনশক্তি রপ্তানিতে সীমাবদ্ধ। এ ছাড়া প্রযুক্তিগত কারণেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত ঝুঁকিতে রয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে এখন কম্পিউটারই সেলাই মেশিন চালাতে পারবে, যার ফলে তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশের কম মজুরির সুবিধা উধাও হয়ে যাচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশও এতে প্রতিযোগিতা অর্জনে সক্ষম হচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলার আরেকটি বড় কারণ হলো, ‘উন্নয়ন’ সম্পর্কে আমাদের বিকৃত ধারণা। যেখানে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-পরিবেশ-আয় ইত্যাদি ক্ষেত্রে অগ্রগতির মাধ্যমে জীবনমানে উৎকর্ষ ঘটিয়ে মানুষের অবস্থা ও অবস্থানের পরিবর্তনই সত্যিকারের উন্নয়নের লক্ষ্য, সেখানে অবকাঠামো তৈরিই আমাদের দেশে উন্নয়নের সমার্থক হয়ে পড়েছে। অবকাঠামো তৈরি উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও অবকাঠামো সৃষ্টিই উন্নয়ন নয়। তবে অবকাঠামো সৃষ্টির আকর্ষণ হলো এর মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানো যায়। বস্তুত অপ্রয়োজনীয়, ব্যয়বহুল ও অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক অবকাঠামো তৈরি করতে গিয়ে বাংলাদেশ আজ ‘ক্রোনিজম’–এ পরিণত হয়ে পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা।

আমাদের ঝুঁকির বাড়তি কারণ হলো, সব ক্ষেত্রে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি-দলবাজি। যার জন্য অনেক বছর আগে প্রয়াত বিচারপতি হাবিবুর রহমান ‘দেশটা বাজিকরের হাতে’ বলে আক্ষেপ করেছিলেন। এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চারদিকে মেধাহীনতা, ‘জি হুজুর’ সংস্কৃতি, কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা, সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভঙ্গুর অবস্থা, জনস্বার্থের পরিবর্তে গোষ্ঠীস্বার্থে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ, আইনের শাসনের অভাব, নাগরিক স্বাধীনতার সংকোচন, ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিশ্চিহ্ন করার রাজনীতি। এসব অসংগতি ও অন্যায় আমাদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত না করে পারে না।

আমাদের ঝুঁকির অন্য একটি কারণ হলো, নির্বাচনী প্রক্রিয়া অকার্যকর হয়ে পড়ার কারণে প্রচলিত দায়বদ্ধতার কাঠামো ভেঙে পড়া। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে এবং টিকে আছে সরকারি দল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং একশ্রেণির সরকারি ও সাংবিধানিক পদে নিয়োজিত কর্মকর্তার আঁতাতের কারণে। তাই জনগণের কাছে সরকারের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকার প্রতিষ্ঠিত না হলে তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ হবে না এবং তাদের স্বার্থে ও কল্যাণে কাজ করবে না।

ড. বদিউল আলম মজুমদার সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন