সিরিয়ায় রাশিয়ার সেনাবাহিনীর উপস্থিতির কারণে সেখানে সামরিক অভিযান চালাতে গিয়ে জটিলতায় পড়তে হয় তুরস্ককে। সম্প্রতি আঙ্কারা সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কুর্দি অধ্যুষিত এলাকায় ঝটিকা সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। যদিও এ অভিযান সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল–আসাদের জন্য কোনো হুমকি সৃষ্টি করতে পারেনি। কিন্তু এ ধরনের হামলা ঠেকাতে রাশিয়ার সমর্থনের বিকল্প কী হতে পারে, তা ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন বাশার আল–আসাদ।

রাশিয়ান সমর বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স মালাশেঙ্কো সম্প্রতি ব্যাখ্যা করে বলেছেন, সিরিয়ায় যদি গৃহযুদ্ধ ফিরে আসে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেওয়া ছাড়া মস্কোর আর কোনো বিকল্প থাকবে না। কেননা, একই সঙ্গে দুটি বড় পরিসরের যুদ্ধ পরিচালনা করা ক্রেমলিনের পক্ষে সম্ভব নয়।

এ কারণেই সিরিয়ায় যখন সংঘাতের তীব্রতা বাড়ার আভাস মিলছে, বাশার আল–আসাদ তখন রাশিয়ার সমর্থনের চেয়ে ইরানের ওপর নির্ভর করতে শুরু করেছেন। কিছু রিপোর্ট থেকে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে যে সিরিয়াতে রাশিয়ান সেনারা নিয়ন্ত্রণ করত এমন কিছু এলাকায় এরই মধ্যে ইরান নিজেদের সেনা নিয়োজিত করেছে।

রাশিয়ার জন্য তুরস্কের আকাশসীমা বন্ধ করার সিদ্ধান্তে ক্রেমলিনের প্রতিক্রিয়া ছিল দুর্বল। এ ঘটনা থেকে এটাই প্রতীয়মান যে সিরিয়ায় আঙ্কারা যে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সে বিষয়ে রাশিয়ার নীতিনির্ধারকেরা সতর্ক। সম্ভবত এ কারণেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ একজন সামরিক কর্মকর্তা, ইরাক ও সিরিয়াতে কুর্দিদের বিরুদ্ধে তুরস্কের পরিচালিত সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, আঙ্কারা নিজেদের পবিত্র যুদ্ধ লড়ছে। কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নৈতিক অধিকার তাদের রয়েছে।

ক্রেমলিনের এ ধরনের বাগাড়ম্বর আঙ্কারাকে তুষ্ট করতে পারবে বলে মনে হয় না। যদিও এখন পর্যন্ত রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেয়নি তুরস্ক। কিন্তু তুরস্ক ইউক্রেন সরকারের কাছে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। কুর্দিদের বিরুদ্ধে যে সামরিক অভিযান চালিয়েছে তুরস্ক তাতে এটা স্পষ্ট যে সিরিয়াতে শিগগিরই নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে তুরস্ক।

তুরস্ক যে এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে তা নিয়ে যথেষ্ট সতর্ক রাশিয়ার কর্মকর্তারা। রাশিয়ার আইনসভার সদস্য সিমিওন বাগদাসারোভ মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ। তুরস্কের আকাশসীমায় রাশিয়ার বিমানের উড্ডয়নে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রসঙ্গে গত ২৪ এপ্রিল তিনি বলেছেন, আঙ্কারার দিক থেকে এটা সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার প্রচেষ্টা। এতে রাশিয়াকে বড় মূল্য দিতে হবে। তুরস্কের নেতারা কেন আবার রাশিয়ার পিঠে ছুরি মারছে সে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের কখনোই ভুলে যাওয়া উচিত হবে না তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য।’

আঙ্কারার সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়া এখন কী করতে পারে? তুরস্ক থেকে তারা টমেটো আমদানি বন্ধ করে দিতে পারে অথবা তুর্ক স্ট্রিম পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে পারে। তাতে মস্কোর ভূরাজনৈতিক অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় রাশিয়ার অর্থনীতি এরই মধ্যে ভুগছে। এ পরিস্থিতিতে আঙ্কারার সঙ্গে সম্পর্ক আর বিপদাপন্ন হোক তা এ মুহূর্তে চাইবে না ক্রেমলিন।

তুরস্ক আকাশপথ বন্ধ করায় রাশিয়ার পক্ষে সিরিয়ার হেমাইমিম ও তারতুস ঘাঁটিতে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একটা পূর্ণ সম্ভাবনা আছে যে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে পড়ে তুরস্ক এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হতে পারে, রাশিয়া যাতে তাদের বিমান সেনাদের হেমাইমিম ও তারতুস থেকে সরাতে না পারে, সে জন্যই এটা করা হয়েছে।

এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আঙ্কারা ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে কৃষ্ণসাগরের সংযোগকারী বসফরাস ও দার্দানেলিস প্রণালিতে রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এ পরিস্থিতিতে তুরস্কের মদদপুষ্ট বিদ্রোহীরা যদি সিরিয়াতে বড় ধরনের হামলা শুরু করে তবে বাশার আল–আসাদের সিরীয়-আরব বাহিনীকে সহায়তা করা রাশিয়ার জন্য কঠিন হয়ে যাবে। কেননা, ইউক্রেনে অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে রাশিয়ার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে।

এ কারণেই সিরিয়ায় যখন সংঘাতের তীব্রতা বাড়ার আভাস মিলছে, বাশার আল–আসাদ তখন রাশিয়ার সমর্থনের চেয়ে ইরানের ওপর নির্ভর করতে শুরু করেছেন। কিছু রিপোর্ট থেকে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে যে সিরিয়াতে রাশিয়ান সেনারা নিয়ন্ত্রণ করত এমন কিছু এলাকায় এরই মধ্যে ইরান নিজেদের সেনা নিয়োজিত করেছে।

সিরিয়ার জ্বালানি–সংকট কাটাতেও সহযোগিতা করছে ইরান। জ্বালানি ঘাটতির কারণে দেশটিতে ঠিকমতো মৌলিক সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। খাদ্যদ্রব্যেরও দাম বেড়ে যাচ্ছে। ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরুর আগপর্যন্ত সিরিয়াতে গ্যাস সরবরাহ করত মস্কো। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ সেই সরবরাহব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলেছে। রাশিয়ার কয়েকটি সূত্র জানাচ্ছে, আসাদ সরকারকে প্রাকৃতিক গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানির প্রধান জোগানদাতা এখন ইরান।

যদিও সিরিয়ার রাজনৈতিক বশ্যতা বদলের ক্ষেত্রে ওপরের কোনো ঘটনা প্রভাব ফেলতে পারেনি। দামেস্ক এখনো মস্কোর প্রতি সমানভাবে অনুগত। সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল মিকদাদ বলেছেন, মিথ্যা ও দ্বিমুখী নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত পশ্চিমা নীতির বিরুদ্ধে সিরিয়া রাশিয়ার অবস্থানকে সমর্থন দেয়। রাশিয়া দনবসে দোনেৎস্ক ও লুহানস্ককে যে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছে, তার প্রশংসা করেছে সিরিয়া।

বাশার আল–আসাদ এখন পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে রাশিয়ার আরেক মিত্র বেলারুশের আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কোর পথ অনুসরণ করছেন। লুকাশেঙ্কো পশ্চিম ও রাশিয়ার মধ্যে ভারসাম্য নীতিতে চলছেন। বাশার আল–আসাদ মস্কো ও তেহরানের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করে এগোচ্ছেন।

এখন পর্যন্ত যা পরিস্থিতি তাতে বলা যায়, ইউক্রেন যুদ্ধ সিরিয়াতে রাশিয়ার প্রভাব খর্ব করবে। রাশিয়ার পরিবর্তে ইরান আসাদ সরকারের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠবে।

এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ মনোজ দে
নিকোলাই মিকোভিচ সার্বিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন