এই কূটনীতিকদের আলোচনার প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ অনুষঙ্গ ছিল ইউক্রেন সংকট। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ ভারতের কৌশলগত দুর্বলতাগুলোকে ইতিমধ্যে উন্মোচিত করে দিয়েছে। দেশটির বৈশ্বিক অবস্থান এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়ে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু একই সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ের কূটনীতিকদের সাম্প্রতিক দিল্লি সফরের ঘটনা ভারতের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়িয়েছে বলে মনে হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কি এ কৌশলগত সুযোগ ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারছেন?

গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের বিষয়ে রাশিয়ার ওপর ভারতের নির্ভরতা এবং ক্রেমলিনের সঙ্গে দিল্লির ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস পশ্চিমারা ভালো করেই জানে। তারপরও তারা ইউক্রেন ইস্যুতে ভারতকে পাশে চাইছে। ইউক্রেন সংকটে ভারত যে ধরনের ভূমিকা রাখছে, ঠিক একই ধরনের ভূমিকা রাখছে চীন। চীনের এ প্রতিক্রিয়া সবাইকে কিছুটা অবাক করেছে। রাশিয়ার আক্রমণের নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘে আয়োজন করা ভোটাভুটিতে এ দুটি দেশই ভোটদানে বিরত ছিল। দুটি দেশই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ক্রেমলিনের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বজায় রেখেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত পশ্চিমের কাছ থেকেও তার প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। ভারত তার সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের ঘাঁটি আধুনিকীকরণ করতে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করতে চাইছে। দিল্লি উপলব্ধি করছে, সামরিক ক্ষেত্রে রাশিয়ান সরবরাহের ওপর তার অতিমাত্রিক নির্ভরতা তাকে চীনের সঙ্গে ভবিষ্যতের সীমান্ত সংকটের ক্ষেত্রে অসহায় করে ফেলবে। এ উপলব্ধিই ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকতে সহায়তা করছে।

২০২০ সালের জুনে চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক স্থবির হয়ে আছে। তবে সম্প্রতি চীন ‘স্বাভাবিক’ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সম্প্রতি দিল্লি সফর করার সময় বলেছেন, ‘চীন ও ভারত এক কণ্ঠে কথা বললে বিশ্ব শুনবে’।

রাশিয়া নিঃসন্দেহে ক্রেমলিনের অবস্থান ‘বোঝার’ জন্য ভারতকে ধন্যবাদ জানাতে আগ্রহী। ভারত যাতে রাশিয়ার বিষয়ে তার অবস্থান পরিবর্তন না করে, সে জন্য ইতিমধ্যে মস্কো দিল্লিকে অর্থনৈতিক প্রণোদনা দিয়েছে। রাশিয়া তেল ও গ্যাস রপ্তানিতে ভারতকে উল্লেখযোগ্য ছাড় দিয়েছে এবং সাশ্রয়ী মূল্যের সার সরবরাহে রাজি হয়েছে।

যদিও ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের’ ওপর ভারত দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্ব দিয়ে আসছে এবং সেটিই ভারতকে এত দিন আনুষ্ঠানিক জোটের বাইরে রেখেছে; তথাপি ভারতের সাম্প্রতিক বিস্তৃত ভূরাজনৈতিক অভিমুখ দিল্লিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিশেষ অংশীদারির সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী করেছে। বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারত অংশীদারিতে জড়িয়েছে। ভারত মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট ‘কোয়াড’–এর সদস্য। এটি একটি অনানুষ্ঠানিক জোট, যার মধ্যে জাপান ও অস্ট্রেলিয়াও রয়েছে। চীনের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নজরদারিতে রাখতে এ জোট গঠন করা হয়েছে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত পশ্চিমের কাছ থেকেও তার প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। ভারত তার সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের ঘাঁটি আধুনিকীকরণ করতে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করতে চাইছে। দিল্লি উপলব্ধি করছে, সামরিক ক্ষেত্রে রাশিয়ান সরবরাহের ওপর তার অতিমাত্রিক নির্ভরতা তাকে চীনের সঙ্গে ভবিষ্যতের সীমান্ত সংকটের ক্ষেত্রে অসহায় করে ফেলবে। এ উপলব্ধিই ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকতে সহায়তা করছে।

মার্কিন উপ–জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সিং রাশিয়ার ওপর আরোপ করা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করলে তার ‘পরিণাম’ বরণ করার বিষয়ে ভারতে স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ক্রেমলিনের সঙ্গে দিল্লির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হ্রাস করতে ভারতকে ইঙ্গিতপূর্ণ অনুরোধও করেছেন। তিনি একটি ভারতীয় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে বলেছেন, ‘রাশিয়া যত বেশি চীনের জুনিয়র অংশীদার হয়ে উঠবে, চীন রাশিয়ার ওপর থেকে তত বেশি ফায়দা তুলতে পারবে এবং ভারতের কৌশলগত অবস্থানের জন্য তা তত কম অনুকূল হবে।’ দলিপ সিং আরও বলেছেন, ‘চীন যদি প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল বা এলএসি) লঙ্ঘন করে, তাহলে রাশিয়া তখন ভারতকে প্রতিরক্ষায় সহায়তা দিতে এগিয়ে আসবে—এমনটা কি কেউ মনে করেন? আমার তো মনে হয় না।’

ভারত ইউক্রেনকে মানবিক সহায়তা দেওয়ার কাজ শুরু করেছে। তারা ইতিমধ্যে ইউক্রেনকে ৯০ টন ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে। যেহেতু সেখানে আরও ধ্বংসযজ্ঞ চলছে, সে কারণে সেখানে ভারতের সহায়তা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারত সানন্দে মূল্য ছাড়ে রাশিয়া থেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও সার রুবল দিয়ে কিনবে। কিন্তু ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান এবং রাশিয়ান প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ওপর ভারতের নির্ভরতা হ্রাসের অর্থ হলো ভারত এখন আর পুরোপুরি রাশিয়ার শিবিরে নেই।

ইউক্রেনে শান্তির জন্য ভারতের আহ্বান আরও বিশ্বাসযোগ্য হতো, যদি ভারত শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সরাসরি পদক্ষেপ নিত। যেখানে তুরস্ক এবং ইসরায়েলের মতো দেশগুলো শান্তি প্রতিষ্ঠার মধ্যস্থতায় নিযুক্ত রয়েছে। ভারত একটি মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা পালন করার জন্য কোনো চেষ্টা করেনি। এমনকি রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ দিল্লিকে মধ্যস্থতায় সহায়তা করার পরামর্শ দেওয়ার পরও দিল্লি সে ধরনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ভারত ইউক্রেন ইস্যুতে যে কূটনৈতিক মনোযোগ পাচ্ছে, তা ব্যবহার করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী আসনের জন্য তার আকাঙ্ক্ষার যোগ্য জায়গা তৈরি করতে পারত। দুঃখের বিষয়, এখন মনে হচ্ছে ভারতের সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা অতিমাত্রায় মিনমিনে গোছের ছিল।

১৯৪৬ সালে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু একটি পর্যবেক্ষণমূলক কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘ভারত তার মতো করে গঠিত, সে বিশ্বে গৌণ ভূমিকা পালন করতে পারে না। সে হয় কোনো বিষয়ে বিশদ আকারে ভূমিকা রাখবে, নয়তো কোনো ভূমিকাই রাখবে না।’

সে ক্ষেত্রে ইউক্রেন ভারতের সামনে একটি ‘টেস্ট কেস’। আজকের ভারত কি আদৌ ভূমিকা রাখবে?

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

  • শশী থারুর জাতিসংঘের সাবেক সহকারী মহাসচিব এবং ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। বর্তমানে ভারতের কংগ্রেস পার্টির এমপি