বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এখন চাইছে আটলান্টিক মহাসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক আরও গভীর করতে। কিন্তু চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন না করে তারা কী করে এটা করবে, তা পরিষ্কার নয়। তাহলে কি ইউরোপের দেশগুলো মিত্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে যথেষ্ট আস্থাশীল বলে মনে করছে না? বাইডেন ন্যাটোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, কিন্তু তাঁর পূর্বসূরি ডোনাল্ড ট্রাম্প সেটা করেননি। যদি ট্রাম্প আবার পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তাহলে কি তিনি ন্যাটোর প্রতি একই রকম গুরুত্ব দেবেন? এ সন্দেহই ইইউকে তাদের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’-এর (ইউরোপের সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া) পথে চালিত করছে।

চীন ইস্যুতে আটলান্টিক মহাসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর একটা সুযোগ রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে চীন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইইউ সংলাপ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইইউ বাণিজ্য ও প্রযুক্তি কাউন্সিলের মাধ্যমে এ ধরনের উদ্যোগ ইতিমধ্যে চলমান। চীনের প্রতিযোগিতাবিরোধী ব্যবসা ও বাণিজ্যের যে চর্চা, সেটার বিরুদ্ধে যৌথ পদক্ষেপ এবং চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে রপ্তানি ও বিনেয়োগ নিষেধাজ্ঞা আরোপের যে সিদ্ধান্ত, সেগুলোকে সাধুবাদ জানানো উচিত।

সামরিক ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চীনের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সুযোগ এখন সীমিত। যদিও ইউরোপের কোনো কোনো দেশ প্রতীকী অর্থে সেটা করার চেষ্টা করছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে দক্ষিণ চীন সাগরের মুক্ত অঞ্চলে জার্মান রণতরির উপস্থিতির কথা বলা যায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে জার্মানি যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করেছে। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একমাত্র ফ্রান্সেরই উল্লেখ করার মতো সামরিক শক্তি রয়েছে। কিন্তু ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-ইভেস লে ড্রিয়ান সম্প্রতি বলেছেন, ‘চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার যে গুরুত্ব, সেটাকে আমরা খাটো করে দেখছি না। এটা ভয়ানক হয়ে উঠতে পারে এবং এর ঝুঁকি নিয়ে আমাদের সব সময়ই মূল্যায়ন করা দরকার আছে। কিন্তু আমাদের কৌশলগত দিক থেকে সামরিক বিষয়টা এড়ানোর চেষ্টা করছি। স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল।’

চীনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে এ অনীহার কারণ হচ্ছে বিপদজ্জনক পথ এড়িয়ে সরল পথ বেছে নেওয়া। এ ক্ষেত্রে জার্মানির নতুন সরকারের অবস্থান আরও দৃঢ়। চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ স্পষ্ট করে বলেছেন, সব পদক্ষেপ সতর্কতার সঙ্গে বিচার করা হচ্ছে। কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতামূলক পথের প্রতিই জোর দেন তিনি।

সুতরাং যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির কাছে এটা প্রত্যাশা করতে পারে না যে তারা চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে মতাদর্শিক চশমা দিয়ে দেখবে। অকাস প্রতিরক্ষা চুক্তি করার সময় যোগাযোগের ব্যর্থতার কারণে ফ্রান্সের সঙ্গে যে ভুল–বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়েছে, তাতে ইন্দো-প্যাসিফিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।

তবে আটলান্টিক মহাদেশীয় দেশগুলোর জোটই ইউরোপের সামনে একমাত্র বিকল্প, যার মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কে প্রভাবিত করতে পারে। এ সম্পর্ক যাতে দ্রুত অবনতি না ঘটে, সেই ঝুঁকিও তারা কমিয়ে আনতে পারে। বর্তমান কৌশল যখন কাজে আসছে না, তখন ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যাতে বড় কোনো সংঘাতে, বিশেষ করে সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।ক

১৯৭০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যকার উত্তেজনা প্রশমনের জন্য হেলনোস্কি চুক্তি হয়েছিল। ইতিহাসের সেই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় থেকে শিক্ষা নিয়ে ইইউ এ ক্ষেত্রে একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে।

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে উত্তেজনা প্রশমনে ইইউর নেতৃত্ব দেওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ইন্দো-প্যাসিফিকের যে প্রস্তাব তারা দিয়েছে, সেটা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। এ প্রস্তাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে সেখানে দুই পরাশক্তির মধ্যে যুদ্ধ এড়ানোর পথের সন্ধান দেওয়া হয়েছে। সেটা যদি না করতে পারে, তাহলে ইইউ কেন গঠন করা হয়েছিল?

রবার্ট উইলিয়ামস মরিটজ রুডলফ গবেষক, ইয়েল ল স্কুল, যুক্তরাষ্ট্র

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন