বিজ্ঞাপন

প্রথমে পূর্ব জেরুজালেমের অধিবাসীরা জেগে উঠল। ‘চিরন্তন ইহুদি নগরী’তে বাস করে ৩ লাখ ৮০ হাজার ফিলিস্তিনি। তারা শহুরে জনগোষ্ঠীর এক-তৃতীয়াংশ, অথচ ৫৪ বছর ধরে তাদের কোনো রাজনৈতিক বা নাগরিক অধিকার নেই। ইসরায়েল তাদের ভূমি দখল করেছে কিন্তু নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করতে যা যা করার সব করেছে। তারা নিষ্প্রাণ পাথর ও উঁচু দেয়াল জোড়া লাগাতে উপকথার আঠা জুড়েছে, কিন্তু জীবন্ত মানুষকে ভেবেছে জড় পদার্থ। কারণ তারা ইহুদি নয়।

কিন্তু এবার সত্যিকার বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে ফিলিস্তিনি ইসরায়েলিরা। তাদের নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার রয়েছে। এত বছর ধরে তারা শ্রম ও সেবা দিয়ে গেছে। সম্প্রতি তারা হাসপাতাল, ফার্মেসি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে দলে দলে যোগ দিয়েছে। যখন মনে হচ্ছিল তাদের একীভূত করা যাচ্ছে, তখনই তারা সহিংস বিক্ষোভে ফেটে পড়ল। একে কি সেই গৃহযুদ্ধের শুরুর মতো দেখাচ্ছে না?

আরব নাগরিকেরা কিছু অধিকার পাওয়ার পর দেখতে পাচ্ছে, তাদের আসলে কখনোই সমান বলে ভাবা হবে না। কারণ, রাষ্ট্রটা ইহুদিদের

ফরাসি রাজনৈতিক দার্শনিক আলেক্সেই ডি তক্যুইভিল ফরাসি বিপ্লবকে বুঝতে গিয়ে খেয়াল করেন, বিপ্লবের আগে সমানাধিকারের বেলায় অনেক অগ্রগতি হয়েছিল। এই অগ্রগতিই ফরাসিদের পরিপূর্ণ সমতার জন্য বিদ্রোহী করে তোলে। তিনি লিখেছেন, ‘যখন সমাজে বৈষম্যই সাধারণ নিয়ম, তখন বড় বড় বৈষম্যও মানুষের চোখে লাগে না। কিন্তু যখন সবকিছু অনেকটা সমান হয়ে আসছে, তখন সামান্য বৈষম্যও তাদের বড় আকারে আহত করে। সুতরাং সমতা যত এগিয়ে আসবে, ততই পরিপূর্ণ সমতার আকাঙ্ক্ষা দুর্দম হবে।’

এ উপলব্ধি ইসরায়েলের জন্যও সত্য। আরব নাগরিকেরা কিছু অধিকার পাওয়ার পর দেখতে পাচ্ছে, তাদের আসলে কখনোই সমান বলে ভাবা হবে না। কারণ, রাষ্ট্রটা ইহুদিদের। ইসরায়েল তার সব নাগরিকের না হলেও বিশ্বের সব ইহুদির রাষ্ট্র (অথচ সেসব ইহুদি ইসরায়েলে থাকতেও চায় না)। এ ‘ইহুদি গণতন্ত্র’ তেমনই, যেমন উদ্ভট যুক্তরাষ্ট্রে ‘শ্বেত গণতন্ত্র’ ফ্রান্সে ‘গ্যালিক-ক্যাথলিক প্রজাতন্ত্র’।

১৯৬৭ সালে সীমান্ত প্রতিষ্ঠার পর ইসরায়েলে ৭০০ নতুন ইহুদি বসতি বসলেও আরব বসতি বাড়েনি একটিও। ইসরায়েলের ২১ শতাংশ নাগরিক আরব হলেও একটিও আরবি বিশ্ববিদ্যালয় নেই। বিপরীতে ফিলিস্তিনি জমিতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়। ইসরায়েল নিজেকে সেক্যুলার ও উদার দেশ বললেও এখানে কোনো ইহুদি নারী অ-ইহুদি কাউকে বিয়ে করতে পারে না। বেশির ভাগ ইসরায়েলি ইহুদি এসব নিয়ে উদাসীন থাকলেও তারা তাদের ‘ইহুদি ও গণতান্ত্রিক’ জনভান্ডার নিয়ে গর্বিত।

এত সব অসহ্য বৈষম্যের বিরুদ্ধেই ফেটে পড়েছে ফিলিস্তিনি ইসরায়েলিরা। তাদের দমাতে ইহুদি বর্ণবাদী দাঙ্গাবাজেরা নেমে এসেছে প্রবাদ কথিত অন্ধকারের পাহাড় থেকে, যার নাম ইসরায়েলের মুক্ত ভূমি। সহিংসতা খারাপ হলেও চিরকালই তা সমতার আন্দোলনের জুড়ি ছিল। গরিব কৃষ্ণাঙ্গদের দাঙ্গা থেকেই আমেরিকা ক্রমেই সব নাগরিকের রাষ্ট্র হওয়ার পথ নিয়েছে।

ইসরায়েলের সামনে এখন প্রশ্ন হলো: ইসরায়েল কি যুগোস্লাভিয়ার মতো টুকরা টুকরা হয়ে যাবে? সেখানেও বঞ্চিত নাগরিকেরা সুবিধাপ্রাপ্ত নাগরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিল। নাকি ইসরায়েল কানাডা, বেলজিয়াম বা সুইজারল্যান্ডের মতো বহুজাতিক, বহুভাষিক গণতন্ত্র হবে?

সময়ই তা বলে দেবে।

হারেৎজ পত্রিকা থেকে নেওয়া, সংক্ষেপিত অনুবাদ

স্লোমো স্যান্ড ইসরায়েলের তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক। তাঁর জায়নবাদবিরোধী বেস্টসেলার বই: ইনভেনশন অব দ্য ল্যান্ড অব ইসরায়েলইনভেনশন অব দ্য জুয়িশ পিপল

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন