বিজ্ঞাপন

ইসরায়েলি জেনারেলরা আর কী বলবেন। তাঁরা বলছেন হামাসের সামরিক সামর্থ্য খর্ব করার কথা। বলছেন, তাঁদের হাতে নিহতদের বেশির ভাগেই হামাস যোদ্ধা। গত ১১ দিনে ২০৯, ২০১২, ও ২০১৪ সালের যোগফলের চেয়ে নাকি তাঁরা এবার বেশি কিছু অর্জন করেছেন। কিন্তু তাঁরা কাউকে বোকা বানাতে পারছেন না। ইসরায়েল জানে, তারা একটা কৌশলগত বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। এটাই ছিল তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যর্থ ও উদ্দেশ্যবিহীন সীমান্ত যুদ্ধ। তারা হামাসের আক্রমণের মুখে নিজেদের নাজুকতা মাপতে ভুল করেছে। এবং ভুলে গেছে যে উত্তর দিকে হিজবুল্লাহও বিষয়টা খেয়াল করছে আর তাদের কাছে রয়েছে হামাসের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী গোলাবারুদ, তাদের পাশে রয়েছে ইরান।

ইসরায়েল বলেছিল, গাজা ফ্রন্টে সব শান্ত। তারা এ-ও ভেবেছিল যে ফিলিস্তিনি ইস্যুকে তারা নিশ্চল করে দিতে পেরেছে। ভেবেছিল, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ট্রাম্পের ‘আব্রাহাম চুক্তি’ ফিলিস্তিনিদের অপ্রাসঙ্গিক করে দেবে। এখন নিজেদের ভ্রান্তি তারা টের পাচ্ছে। ইসরায়েল কৌশলগতভাবে বিপদে পড়েছে। বিশ্ব হয়তো পরের কোনো বড় ইস্যুতে মন দেবে। কিন্তু পাশ্চাত্যের অজস্র পর্যবেক্ষকের কাছে এটা ছিল এক মোড় ঘোরানো ঘটনা। তারা একে দুটি দেশের যুদ্ধ বলে শুধু মনে করছে না, মনে করছে সরাসরি বর্ণবাদী অবিচারের দৃষ্টান্ত হিসেবে। লন্ডনের বিক্ষোভের প্ল্যাকার্ডের লেখা দেখুন: ফিলিস্তিন দম নিতে পারছে না এবং ফিলিস্তিনি জীবনের মূল্য আছে।

ফ্রি প্যালেস্টাইন হ্যাশট্যাগ যোগ দিয়েছে মি টু ও ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার হ্যাশট্যাগের সঙ্গে। বৈশ্বিক প্রজন্ম ফিলিস্তিন প্রশ্নকে অতি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে। শুধু রাজনীতিবিদেরাই নন, কোটি কোটি ফলোয়ারসমৃদ্ধ তারকা ফুটবল খেলোয়াড় থেকে জনপ্রিয় শিল্পী এবং ফ্যাশন-আইকনরা প্রতিবাদ করেছেন। ইহুদি ও আরবদের সাম্প্রদায়িক সংঘাত তাদের আরও বীতস্পৃহ করেছে ইসরায়েলের প্রতি। তারা দেখেছে পুলিশি বর্বরতা এবং বিচারব্যবস্থার পক্ষপাত। যারা উইঘুরের দিকে তাকায়নি, তাকায়নি উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের দিকে, কিংবা আসাদ সরকারের গণহত্যা ও ইথিওপিয়ার সংঘাত যাদের মনোযোগ কাড়েনি, তারাও ফেটে পড়েছে গাজায় হামলা দেখে। এপির এক সাংবাদিক যিনি আগে জেরুজালেমে নিযুক্ত ছিলেন, তিনি লিখেছেন, ‘ইসরায়েল/ফিলিস্তিন এখন পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবর’। এর মানে সেখানে যে অন্যায় করা হচ্ছে, কোটি কোটি মানুষের চোখে সেটা অন্য সবকিছুর চেয়ে গুরুতর।

কেন গাজা এত দৃষ্টি কাড়ল, তা নিয়ে আপনারা অনেক গবেষণা করতে পারেন। কিন্তু কেন গাজা এত নজর কাড়ল? এর চেয়ে অনেক অনেক বেশি মৃত্যু ঘটেছে আরাকানে, ইয়েমেনে, সিরিয়ায় বা অন্য জায়গায়। এটাও মূল ঘটনা নয় যে ইসরায়েল পশ্চিমের আদরের মিত্র; সেটা তো সৌদি আরবও। সম্ভবত ঘটনা এই যে ফিলিস্তিনিরা ৫৪ বছর যাবৎ (কারও কারও কাছে ৭০ বছর) ইসরায়েলি দখলদারি মোকাবিলা করে আসছে। এর পরিণতি হলো, প্রতিটি সহিসংতার সময় ইহুদি সম্প্রদায় বৈশ্বিক সমালোচনার মুখে পড়বে। ব্রিটেনে ইহুদিবিদ্বেষী ঘটনা আগের চেয়ে ছয় গুণ বেশি বেড়েছে এবার।

ইসরায়েলে, এর নেতারা ভুলের অভিযোগ তুলবেন। কিন্তু ব্যাপারটা সেই পুরোনো প্রবাদের মতো, নাবিক হয়ে সমুদ্রকে দোষারোপ করা। বরং তাদের উচিত নতুন বাস্তবতার দিকে তাকানো। তাদের উচিত তাদের ঘনিষ্ঠতম মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। ইসরায়েলের পুরোনো বন্ধু আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও কর্তেজ ইসরায়েলকে বর্ণবাদী রাষ্ট্র বলে অভিহিত করেছেন। দীর্ঘদিনের ইসরায়েলপন্থী ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্যরা ইসরায়েলে অস্ত্র চালানে বিলম্ব ঘটিয়ে দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র অবস্থান বদলালেও বেশ কিছু ইউরোপীয় দেশ ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠছে। তাহলেও ইসরায়েলের হুঁশিয়ারি সংকেত পাঠ করা উচিত। আমরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছিলাম, ইসরায়েল যদি সঠিক কাজ না করে, দখলদারির অবসান না ঘটায়, তাহলে অচিরেই একে দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র বলে মার্কা মেরে দেওয়া হতে পারে। গত দুই সপ্তাহে আর কিছু না হোক, সেই আশঙ্কা আরও নিকটতর হয়েছে।

দি গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ।

জোনাথন ফ্রিডল্যান্ড ব্রিটেনের দি গার্ডিয়ান পত্রিকার কলাম লেখক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন