বিজ্ঞাপন

বছরের অন্য সময় রফিকুলের এই গ্রামের কথা খুব একটা মনে পড়ে না। কিন্তু প্রতিবছরই ২৫তম রোজার পর সে অস্থিরতা বোধ করে। তার মা-বাবা মারা গেছে। গ্রামে তাকে নিবিড়ভাবে সময় দেওয়ার মতো বন্ধুবান্ধবও তেমন কেউ নেই। তবু রফিকুল বুঝতে পারে এই পথ, এই বুড়োটে বট, এই পলেস্তারা খসা পুরোনো বাড়িঘর, এই ভাঙা ঘাটলা, তেমাথায় টিনের দোচালায় মুদিদোকান খুলে বসা টাকলা সাইফুলের ‘কিরে দোস্ত, কবে আসলি?’ বলে প্রাণোচ্ছল সম্বোধন—সব তাকে টানে।

আসলে এরা সারা বছরই টানে। ঈদটা সেই টানের তীব্রতা সৃষ্টির অছিলা মাত্র। দুই যুগের বেশি সময় ঢাকায় কাটানোর পরও রফিকুল রাতে ঘুমের মধ্যে যেসব স্বপ্ন দেখে, তার প্রায় সব স্বপ্নের পটভূমি থাকে এই পাড়া, এই বটগাছ, এই খাল। তবু কাজে আটকা পড়ে যাওয়ার কারণে সব ঈদে তার গ্রামে আসা হয় না। যে বছর আসা হয় না, সে বছর তার ঈদের দিন কাটে ঢাকার অ্যাপার্টমেন্টের নিচে খলিল মিয়ার চায়ের দোকানে। গ্রামের সেই টানে তার বুকে চিনচিনে ব্যথা হয়। স্ত্রী-ছেলে-মেয়ে বুঝতে পারে না, ভেতরে-ভেতরে তার পুরো ঈদটাই মাটি হয়ে গেছে।

ভোরবেলা গ্রামের ঘর ছেড়ে বের হয়ে সেই ঘুমন্ত অজগরের মতো রাস্তা ধরে রফিকুল তেমাথার দিকে হাঁটতে লাগল। এই রাস্তা ধরে সোজা যেতে যেতে সেখান থেকে শাখা নদীর মতো একটা কানা গলি ভেতরের দিকে ঢুকে গেছে। সেই গলি ধরে রফিকুল সামনে এগোল। এখানেই একটা একতলা বাড়ি। সেই বাড়ি রফিকুলের কাছে চিরকাল বড় মায়াবী। বিশেষ করে শীতের কুয়াশা মেখে রাতের ম্লান আলোয় রাস্তাটা তার কাছে বড় রহস্যময় হয়ে উঠত। কত দিন রাতে কোচিং থেকে বাড়ি ফেরার পথে ওই রাস্তায় দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য উপভোগ করেছে সে। আর সে সময় তার মধ্যে শুধু এই ভাবনা কাজ করত, এই একতলা দালানের ভেতর থেকে একটা কিশোরীর এক জোড়া চোখ তাকে দেখছে।

‘আরে রুফু দা না!’—একটা নারীকণ্ঠের সম্বোধনে রফিকুল চমকে ওঠে। বহুদিন বাদে কেউ তাকে ডাকনাম ধরে ডাকল। এখানে এই নামে যে তাকে লোকে ডাকবে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এত দিন পরেও যে কেউ তা মনে রাখতে পারে, তা ভাবতেই রফিকুলের গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। সে পেছন ফিরে দেখল, বছর আটেক বয়সী একটা ছেলের হাত ধরে হেঁটে আসছে সবিতা। সে রফিকুলের বন্ধু প্রশান্তর ছোট বোন। রফিকুল হাসল।

সবিতা বলল, ‘রুফু দা, কবে আসলা? তুমার ছাওপোনা কেমন আছে? ওরা আইছে?’
রফিকুল সবিতার কথার জবাব দিতে দিতে তার চেহারার দিকে চেয়ে তন্ময় হয়ে যায়। ঈদের ছুটিতে আর কে কে গ্রামে এসেছে, তার একটা মোটামুটি ছোট তালিকা সবিতা রফিকুলকে দিয়ে দেয়। অবশ্য ফেসবুকের কল্যাণে দু-একজনের বাড়ি আসার খবর ইতিমধ্যে সে পেয়ে গেছে।

কথা শেষে ‘তাইলে যাই রে’ বলে রফিকুল এক পা এগোতেই সবিতা কেমন একটু দুষ্টুমির হাসি দিয়ে, সেই একতলা বাড়ির দিকে চোখ ফিরিয়ে বলল, ‘উনিও তো আইছে। এবার ঈদে ঢাকাত্তে আর শ্বশুরবাড়ি যায়নি, দুলাভাই আর বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বাপের বাড়ি চইলে আসিছে।’

রফিকুলের বুকের মধ্যে ধড়াস করে উঠল। সে সবিতার কথার কোনো জবাব না দিয়ে নিজের চেহারার অপ্রতিভ ভাবটা সামলে নিয়ে হাঁটা শুরু করল। সেই একতলা বাড়ির ‘সেই তাকে’ কোনো দিন কিছু বলা হয়নি রফিকুলের। শুধু তেমাথায় পাকুড়গাছের গায়ে চাকু দিয়ে খুঁচিয়ে রফিকুল তার নামের সঙ্গে যোগ চিহ্ন দিয়ে তার নাম লিখে রেখেছিল সেই কবে। তারপর একদিন সে কাউকে কিছু না বলেই চলে গেছে ঢাকায়। বিয়ের সুবাদে সেই একতলা দালানের বাসিন্দাও তার বছর দশেক বাদে স্বামীর সঙ্গে গেছে ঢাকায়। তার দুই ছেলেমেয়ে। এখানে পুরোনো বাড়িতে বাবা আর মা থাকেন। দুজনেরই বয়স হয়েছে। তাঁদের দেখতে প্রতি ঈদেই তাকে আসতে হয়। রফিকুল বুঝতে পারে, তার নাম শোনামাত্রই এই যে বুকের মধ্যে বহু বছর পর ধড়াস করে উঠল, এই যে তার ‘বাজিল বুকে সুখের মতো ব্যথা’, হয়তো সেই ‘ধড়াস করা’ আর বুকের চিনচিনে ব্যথার অনুভূতির লোভ তাকে ঈদের ছুটিতে বাড়িতে টেনে আনে।

রফিকুল ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে তেমাথার দিকে গেল। অসংখ্য অপরিচিত তরুণ মুখের মধ্যে বেশ কিছু পরিচিত মাঝবয়সী আছে। তাদের মধ্যে দু-একজন আবার ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে ঈদের ছুটিতে এসেছে। ছেলেবেলার বন্ধু সলেমানের সামনের উঁচু পাটির একটা দাঁত পড়ে গেছে। সে রফিকুলকে জড়িয়ে ছোটবেলাকার কী একটা অশ্লীল ঘটনার কথা বলতে গিয়ে প্রথমে ফিক করে হাসল। তারপর সেই হাসির রেশ ধরে কাশতে লাগল। হাসি আর কাশি মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। রফিকুল হাসি হাসি মুখে সলেমানের দিকে চেয়ে আছে। তার মনে হচ্ছে এবারের ঈদের ছুটিতে বাড়ি আসতে যত কষ্টই হোক, সে কষ্ট সার্থক হয়েছে। ছুটিতে না এলে এই হাসি সে দেখত কেমন করে?

ভাবতে ভাবতে সে পা বাড়ায় সেই বট-পাকুড়গাছে দিকে। ছেলেমানুষের মতো সে খুঁজে বের করতে চায় পাকুড়ের বল্কলে লেখা তার আর সেই ‘তাহার’ নাম।

সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
ই-মেইল: [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন