কিন্তু অর্থনীতি টিকে রাখার ফ্রন্টলাইন যোদ্ধাদের সঙ্গে আমরা কী আচরণ করেছি? করোনাকালে দেশে ফেরত আসা আবার পরে প্রবাসে ফেরত যাওয়া শ্রমিকদের কোয়ারেন্টিনে থাকা, টিকা দেওয়া, ভিসা পাওয়া কিংবা টিকিট প্রাপ্তিতে প্রতিনিয়ত নাজেহাল হতে হয়েছে। হাওরে কৃষকদের অবস্থা তো গোটা দেশ এখন দেখেও না দেখার ভান করছে যেন। কাঙ্ক্ষিত বাঁধটাও তাঁরা পেলেন না ভয়াবহ অনিয়মের কারণে। ঢলের পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া সোনালি ধান হারিয়ে কৃষকের বুক ভাসানো কান্না এখন আর কে দেখে! এরপর থাকল পোশাকশ্রমিক। মূলত এই অভাগাদের কথা বলতেই এ লেখার অবতারণা।

বিধিনিষেধে সবকিছু বন্ধ থাকলেও পোশাক কারখানাগুলোকে কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি। একবার কারখানা বন্ধ, আরেকবার খোলো। একবার শ্রমিকদের গ্রামে পাঠিয়ে দাও, আবার বিনা নোটিশে কারখানায় হাজির হও। গাড়ি বন্ধ, ফেরি বন্ধ—রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে মাইলের পর মাইল হেঁটে আসো। মহামারিতে এমন সব লুকোচুরি খেলা হয় শ্রমিকদের জীবন নিয়ে। পোশাক কারখানার মালিকেরা সবার আগে মোটা অঙ্কের প্রণোদনা পেলেও সেসময় বেতন-ভাতার জন্য রাস্তাও অবরোধ করতে হয় শ্রমিককে, পুলিশের হামলার শিকার হতে হয়, অনেককে ছাঁটাই হতেও হয়।

এভাবেই মহামারিকালে অর্থনীতি সচল রাখার ‘প্রতিদান’ দেওয়া হলো পোশাকশ্রমিকদের। যদিও প্রতিবছর দুই ঈদের আগে বেতন-ভাতার জন্য পোশাককর্মীদের বিক্ষোভের দৃশ্য ও পুলিশের হাতে তাঁদের মার খাওয়া দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি।

কিন্তু ঈদ এলেই কেন বকেয়া বেতন-ভাতার জন্য পোশাকশ্রমিকদের রাস্তায় নামতে হয়? অনেকের মনে হতে পারে, তাহলে কি গোটা বছর বেতন-ভাতা বকেয়া থাকে না? উত্তর হচ্ছে, গোটা বছরই কোনো না কোনো মাস এমনকি টানা কয়েক মাস শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বকেয়া রাখা হয় অনেক কারখানায়। সেটি মেনে নিয়েই মুখ বুজে কারখানায় দিন-রাত কাজ করে যান তাঁরা। খেয়ে না খেয়ে থাকেন, অপুষ্টিতে ভোগেন, মালিকের বারবার আশ্বাসে ‘প্রতারিত’ হন।

আজকে বাহারি পণ্যের বড় শিল্পপতিদের অনেকের যাত্রা শুরুই তৈরি পোশাক ব্যবসা দিয়ে। পোশাক পণ্যের আমদানি ও রপ্তানিতে সরকারের শুল্ক সুবিধাও সবচেয়ে বেশি ভোগ করেন তাঁরা। কিন্তু শ্রমিকের বেতন-ভাতার প্রশ্নে তাঁদের অনেকে ‘গরিব’ হয়ে যান! কখনো ক্রয়াদেশ আটকে যাওয়া, কখনো বিক্রীত পণ্যের অর্থ আটকে যাওয়া, কখনো গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা—এমন সব সমস্যা সামনে নিয়ে আসেন তাঁরা। ফলে প্রতিবছর ঈদের আগে পোশাকশ্রমিকদের রাস্তায় নামতে হয়।

কিন্তু ঈদের আগে সেটি আর মেনে নেওয়া সম্ভব হয় না তাঁদের। কারণ, বছরে দুই ঈদেই কয়েক দিনের লম্বা ছুটি পান তাঁরা। গ্রামে রেখে আসা স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবার সান্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ আর কই তাদের। পরিবারও দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকে উৎসবের দিনে তাঁদের প্রিয় মানুষটার জন্য।

শুধু পরিবার নয়, ঘরের বিড়ালটা, গোয়ালের গরুটা, উঠোনের সামনে আমগাছটা, ঘরের পেছনে নদীটা, সাঁতারের বন্ধুরা, বাপের বাড়ি বেড়াতে আসা একসময়ের খেলার সই, প্রাইমারি স্কুলের মাঠটা—কত কত কিসিমের অপেক্ষায় তাঁরা ছুটে যেতে চান। কিন্তু খালি হাতে কীভাবে সম্ভব? ছেলেটার জন্য নতুন একটি সানগ্লাস, মেয়েটার জন্য লাল একটি ভ্যানিটি ব্যাগ কিংবা ছোট ভাইবোনের একটি নতুন টুপি বা এক জোড়া জুতা, বাপের জন্য লুঙ্গি, মায়ের জন্য সস্তা একটি শাড়ি, বউয়ের জন্য ইমিটিশনের একটি গলার হার—কত কিছুই তো নিতে হবে। এখন বেতন-ভাতা ছাড়া সেসবের জোগাড় কোত্থেকে হবে? ফলে বছরের অন্য সময় বেতন-ভাতা বকেয়া থাকলেও ঈদের আগে সেটি কি মেনে নেওয়া যায়? কারখানার মালিকেরাও কি সেসব বোঝেন না। সে জন্য বকেয়া পরিশোধের একের পর এক তারিখ ঘোষণা করেন। কিন্তু কথা রাখেন না তাঁরা। কেউ পালিয়ে যান। বিক্ষোভে নামেন শ্রমিকেরা। শায়েস্তা করতে ডাকা হয় পুলিশ। লেলিয়ে দেওয়া মাস্তান। ভাঙচুর হয় কারখানা। এবারও ঈদ সামনে রেখে কয়েকটি জায়গায় আমরা সেই দৃশ্যই দেখতে পেলাম।

গত সপ্তাহে মিরপুর ও উত্তরায় এবং এর আগে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেন। ঈদের আগে বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের আশ্বাস দেওয়া হলেও সেটি পাননি তাঁরা। সেই ক্ষোভে কারখানাও ভাঙচুর করেন তাঁরা। শুধু তাই নয়, এক কারখানায় প্রায় ৩০০ শ্রমিক কেউই এ বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চের বেতন পাননি। সব বকেয়া বেতন ও ঈদ বোনাস ২০ এপ্রিল দেওয়ার কথা ছিল। অন্যদিকে কারখানার মালিকও দুই সপ্তাহ ধরে লাপাত্তা। ফলে মারমুখী হতে হলো শ্রমিকদের।

চলতি মাসের বেতন চাইলে না হয় কথা ছিল, চলতি বছরের কোনো মাসেই বেতন পাননি তাঁরা। এটি কি ভাবা যায়! এ কয় মাসে বাজারের অস্থিরতা, দফায় দফায় ভোজ্যতেল-সিলিন্ডার গ্যাসের দাম বাড়া, টিসিবির গাড়ির পেছনে মানুষের হাহাকার—কত কিছুই দেখলাম আমরা। এ কয় মাস কীভাবে চললেন এসব পোশাককর্মী। বিক্ষোভে এসে আহাজারি করে এক নারী শ্রমিক বলছেন, ‘আমাদের বাচ্চাকাচ্চা নাই? আমাদের সংসার নাই? কয় মাস ধরে বেতন দেয় না। ঘরভাড়া দিতে পারি না। কেউ খবর নেয় না। মালিক পালাইছে।’ শুধু বেতন না ওভারটাইম ও বোনাসও তাঁরা পাননি।

default-image

উত্তরার ইন্ট্রাকো ডিজাইন ও ইন্ট্রাকো ফ্যাশন নামের একই মালিকের দুই প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকেরা বকেয়া বেতন-ভাতার দাবিতে ছয় দিন ধরে কারখানায় অবস্থান করেছিলেন। তাঁদের অবস্থান ছিল শান্তিপূর্ণ। এরপরও তাঁদের ওপর পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, রবার বুলেট চালায়। আহতদের কোলে করে শ্রমিকদের দৌড়াতে দেখলাম আমরা। রক্ত ও ঘাম পানি করা শ্রমের মূল্য চাইতে এসে মার খেতে হলো অর্ধশত শ্রমিককে। এটিই যেন আমাদের শ্রমিকদের নিয়তি।

২৬ এপ্রিল প্রকাশিত প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, প্রায় তিন ডজন তৈরি পোশাক ও বস্ত্র কারখানা শ্রমিকদের গত মার্চ মাসের মজুরি গত সোমবার পর্যন্ত পরিশোধ করেনি। শ্রমিকেরা চলতি মাসের মজুরি ও উৎসব ভাতা পাবেন কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠনের নেতারা বলছেন, কিছু কারখানা আর্থিক সংকটে রয়েছে। বেতন-ভাতা পরিশোধে তাদের সমস্যা হতে পারে। যদিও শ্রম মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে থেকে সিদ্ধান্ত হয়, শ্রমিকদের ঈদের বোনাস (উৎসব ভাতা) ও চলতি মাসের অন্তত ১৫ দিনের বেতন পরিশোধ করবেন মালিকেরা। একই সঙ্গে বেতন-ভাতা বকেয়া থাকলে সেগুলোও ঈদের ছুটির আগেই পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি উৎসব ভাতার তুলনায় চলতি মাসের ১৫ দিনের মজুরি পরিশোধের হার একেবারেই নগণ্য। যেমন ২ হাজার ৬৮৮ পোশাক কারখানার মধ্যে গত সোমবার পর্যন্ত মাত্র ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ বা ৭৫টি কারখানা মজুরি দিয়েছে। বিজিএমইএর ১ হাজার ৫৮০, বিকেএমইএর ৬৫৪ ও বিটিএমএর ৩২৯টি কারখানা সেদিন পর্যন্ত মজুরি পরিশোধ করেনি।

যদিও এপ্রিলের পুরো বেতন ও ঈদ বোনাস পরিশোধের দাবি জানিয়েছেন শ্রমিক সংগঠনগুলো। এক মানববন্ধনে বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আকতার বলেন, ‘সরকার ও গার্মেন্টসের মালিকেরা একযোগে শ্রমিকদের ওপর চড়াও হয়েছেন। এপ্রিলের ১৫ দিনের বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এমন সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করছি। মালিকেরা রেকর্ডসংখ্যক অর্ডার পাচ্ছেন, কিন্তু শ্রমিকদের পেটে ভাত নাই। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আকাশ ছুঁয়েছে।’

শেষ পর্যন্ত সব কারখানা শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধ করতে পারবে কি না, আমরা সন্দিহান। কারণ, বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘শতাধিক কারখানা আর্থিক সমস্যায় আছে। কারণ, ক্রয়াদেশ থাকলেও গত দুই মাস গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যার কারণে তারা পর্যাপ্ত পরিমাণ পোশাক রপ্তানি করতে পারেনি। সে জন্য ব্যাংকেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই অর্থ পাচ্ছে না। তারপরও যে যেভাবে পারছে, বেতন-ভাতা পরিশোধের চেষ্টা করছে।’

অথচ করোনার ধাক্কা কাটিয়ে দেশের তৈরি পোশাক খাত বেশ ভালোভাবেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩ হাজার ১৪৫ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়। এতে প্রবৃদ্ধি হয় ১২ দশমিক ৫৫ শতাংশ। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) প্রায় গত বছরের কাছাকাছি রপ্তানি হয়েছে, যা পরিমাণে ৩ হাজার ১৪২ কোটি ডলার। এটি গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৩ দশমিক ৮১ শতাংশ বেশি। এমন পরিসংখ্যান থাকার পরেও যখন তাঁরা নানা সমস্যার কথা বলে থাকেন, সেগুলো যে কারও কাছে অজুহাতই মনে হওয়ার কথা।

এরপরও স্বস্তিদায়ক হচ্ছে, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার শ্রমিক বিক্ষোভ কমই দেখতে পেয়েছি আমরা। কারণ, বড় কারখানাগুলো শ্রমিকদের ঈদ বোনাসসহ বেতন-ভাতা পরিশোধ করেছে। তবে অনেকগুলো ছোট ও সাবকন্ট্রাকন্টিং কারখানায় বেতন-ভাতা পরিশোধ নিয়ে সমস্যা রয়ে গেছে। শ্রমিকনেতাদের কাছ থেকেই সেটি আমরা জানতে পারলাম। ফলে এবারও কয়েক জায়গায় শ্রমিকদের আন্দোলন দেখতে হলো আমাদের।

বিশ্বজুড়ে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। কখনো ভিয়েতনাম ১ নম্বরে, কখনো বাংলাদেশ। তার মানে দিন দিন ফুলেফেঁপে এ ব্যবসা বেড়েছে। পোশাক কারখানার মালিকেরা দিন দিন আরও কলাগাছ থেকে বটগাছ হয়েছেন। শ্রমিকের ঘামে অর্জিত মুনাফা দিয়ে সহজেই কোটিপতির তালিকায় নাম লিখিয়ে ফেলছেন। কেউ সাংসদ হয়ে যাচ্ছেন, কেউ মন্ত্রী হয়ে যাচ্ছেন, কেউ মেয়র হয়ে যাচ্ছেন। সংসদ তো রীতিমতো ব্যবসায়ীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে, যাঁদের অনেকেই তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী।

আজকে বাহারি পণ্যের বড় শিল্পপতিদের অনেকের যাত্রা শুরুই তৈরি পোশাক ব্যবসা দিয়ে। পোশাক পণ্যের আমদানি ও রপ্তানিতে সরকারের শুল্ক সুবিধাও সবচেয়ে বেশি ভোগ করেন তাঁরা। কিন্তু শ্রমিকের বেতন-ভাতার প্রশ্নে তাঁদের অনেকে ‘গরিব’ হয়ে যান! কখনো ক্রয়াদেশ আটকে যাওয়া, কখনো বিক্রীত পণ্যের অর্থ আটকে যাওয়া, কখনো গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা—এমন সব সমস্যা সামনে নিয়ে আসেন তাঁরা। ফলে প্রতিবছর ঈদের আগে পোশাকশ্রমিকদের রাস্তায় নামতে হয়।

এবার ঈদের ছুটিতেই মে দিবস পড়েছে। শ্রমিকের অধিকার নিয়ে কত ফুলঝুরি এবারও আমরা শুনতে পাব। কিন্তু উৎসবের কালে অনেক শ্রমিককে খালি হাতেই ফিরতে হবে ঘরে। পথ চেয়ে থাকা মানুষগুলোর কাছে মাথা নিচু করে দাঁড়াতে হবে তাদের। গতবারও তেমনটি হয়েছে হয়তো, তার আগের বারও। হয়তো আগামী ঈদেও আমরা তেমনটি দেখতে পাব। আমাদের অর্থনীতির ফ্রন্টলাইন যোদ্ধাদের এই দুঃখ আদৌ কি ঘুচবে না?

  • রাফসান গালিব প্রথম আলোর সহসম্পাদক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন