উত্তর-পূর্ব ভারতে বিজেপির নতুন কৌশল

উত্তর-পূর্ব ভারতের তিন খ্রিষ্টানপ্রধান ও এক কমিউনিস্টশাসিত রাজ্য জয় করাই বিজেপির এখন লক্ষ্য। মিশন ২০১৮। ভোটের আগে বা পরে জোট রাজনীতির দক্ষ খেলুড়ে হিসেবে বিজেপি আসাম ও মণিপুর জয়ের পর এবার খ্রিষ্টানপ্রধান নাগাল্যান্ড, মিজোরাম ও মেঘালয় জিততে মরিয়া। সঙ্গে রয়েছে বামের ত্রিপুরাও। ইতিমধ্যে নিজেদের জয় নিশ্চিত করতে বিজেপির থিংকট্যাংক বাড়তি গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে চার রাজ্যকেই। চার রাজ্যেই বিধানসভা নির্বাচন ২০১৮ সালে।
আট রাজ্য নিয়ে গঠিত উত্তর-পূর্বাঞ্চল নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও ছিল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি। কিন্তু সেই ঘাঁটি এখন ভেঙে চুরমার। সব জায়গাতেই পদ্মফুলের (বিজেপির নির্বাচনী প্রতীক) রমরমা। আসাম, অরুণাচল প্রদেশ ও মণিপুর কংগ্রেস থেকে ছিনিয়ে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিজেপিশাসিত সরকার। বিজেপিরই বন্ধু সরকার রয়েছে সিকিম ও নাগাল্যান্ডে। দুই কংগ্রেসশাসিত রাজ্য মেঘালয় ও মিজোরাম ছিনিয়ে নিতেও বদ্ধপরিকর বিজেপি। একই সঙ্গে ত্রিপুরা থেকেও কমিউনিস্টদের উৎখাতের হুংকার দিয়েছেন হিন্দুত্ববাদী নেতারা।
আর সেই কারণেই হিন্দুত্ববাদীদের দল হিসেবে পরিচিত বিজেপি উত্তর-পূর্ব ভারতে নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে চেষ্টায় কোনো কসুর করছে না। ইতিমধ্যে নাগাল্যান্ড, মিজোরাম ও মণিপুরের বিজেপির নেতারা আগাম জানিয়ে দিয়েছেন, ক্ষমতায় এলেও গোহত্যা বন্ধ নৈবচ। ত্রিপুরা প্রদেশ বিজেপির সভাপতি বিপ্লব দেব আরও এক ধাপ এগিয়ে বলছেন, গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলেই বিজেপি গোহত্যা নিষিদ্ধ করার বিপক্ষে।
আসলে বিজেপির নেতারা বহু আগেই বুঝেছেন, মিশ্র জনবসতির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে হিন্দুত্বের কার্ড খেলে আর লাভ হবে না। আসাম বাদ দিলে বেশির ভাগ রাজ্যেই খ্রিষ্টান ভোট বড় ফ্যাক্টর। এই অঞ্চলের ২৫টি ভারতীয় লোকসভা আসনের মধ্যে আসামের সদস্যসংখ্যা ১৪। বাকি ৭টি রাজ্যের মোট সদস্যসংখ্যা ১১। আসামে বিজেপির জয়ের পেছনে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন সাবেক কংগ্রেস নেতা হীমন্ত বিশ্বশর্মা। কংগ্রেস আমলে রাজ্যের বেশ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন তিনি। বর্তমানে আসামের অর্থ ও শিক্ষামন্ত্রী হীমন্ত বিশ্বশর্মার হাত ধরে গঠিত হয় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় গণতান্ত্রিক জোট বা নেডা। এই নেডার ছাতার তলাতেই আঞ্চলিক দলগুলোকে নিয়ে এসে বাজিমাত করে চলেছে বিজেপি। জোট রাজনীতিতে পিছিয়ে পড়েছে কংগ্রেস।
হীমন্তের হাতযশে ভোটে জিতে না হোক, কংগ্রেসিদের ভাগিয়ে এনে অরুণাচল প্রদেশেরও ক্ষমতা দখল করে বিজেপি। অনেক নাটকের পর এখন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তথা কংগ্রেস নেতা দোরজি খান্ডুর ছেলে পেমা খান্ডু বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী। এই রাজ্যে ভোট অবশ্য ২০১৯-এ। ভারতের লোকসভার সঙ্গেই ভোট হবে। তবে ২০১৪-তে প্রবল মোদি হাওয়াতেও কংগ্রেসই জিতেছিল চীন সীমান্তবর্তী রাজ্যটিতে। তবে ঘর ধরে রাখতে পারেনি।
মণিপুর নির্বাচনেও হীমন্ত বিশ্বশর্মাকে দায়িত্ব দিয়ে বিজেপির জয়জয়কার। অথচ সেখানেও সংখ্যালঘুরাই ছিলেন বেশি। মণিপুরে ৪১ দশমিক ৩৯ শতাংশ হিন্দু। মুসলিম ভোটার ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। সঙ্গে রয়েছেন ৪১ দশমিক ২৯ শতাংশ খ্রিষ্টান ভোটারও। এহেন ধর্মীয় অবস্থানেও শুধু উন্নয়নের স্লোগান আর শক্তিশালী নির্বাচনী কৌশলের মাধ্যমে জয় হাসিল করেছে বিজেপি।
সামনের ভোট অবশ্য বেশ কঠিন। তিনটিই খ্রিষ্টান অধ্যুষিত রাজ্য। জনসংখ্যার বিচারে হিন্দুরা সেখানে সংখ্যালঘু। নাগাল্যান্ডে হিন্দু রয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। মুসলিম আরও কম। ২ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অন্যদিকে খ্রিষ্টান রয়েছে ৮৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ৬০ সদস্যের নাগাল্যান্ড বিধানসভায় বিজেপির সদস্য না থাকলেও তাদেরই বন্ধু নাগা পিপলস পার্টির নেতৃত্বে ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স অব নাগাল্যান্ড বা ড্যান ক্ষমতায় আছে। এবার অবশ্য বিজেপি নিজের দলের প্রার্থীদেরও জেতাতে সচেষ্ট। জোট থাকলেও পদ্ম ফোটানোর চেষ্টায় কসুর করছেন না তাঁরা।
কংগ্রেসশাসিত মেঘালয়ে পদ্ম ফোটেনি কখনোই। খ্রিষ্টানরা এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ। ৭৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ। ৪ দশমিক ৪০ শতাংশ মুসলিম। আর হিন্দু মাত্র ১১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। তবু মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী মুকুল সাংমাকে শক্ত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন বিজেপির নেতারা। এখানে তাঁদের প্রচারের মূল অস্ত্র দুর্নীতি। কংগ্রেস আমলে দুর্নীতি আর দলীয় কোন্দলকে পুঁজি করতে চায় বিজেপি।
৮৭ দশমিক ১৬ শতাংশ খ্রিষ্টান অধ্যুষিত মিজোরামে বিজেপির স্লোগান উন্নয়ন। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অনুন্নয়নের অভিযোগ তুলে নির্বাচনী বৈতরণি পার হতে চাইছেন বিজেপির নেতারা। মিজোরামে হিন্দু মাত্র ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ, মুসলিম ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। তবে বৌদ্ধ রয়েছেন ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ। মিজোরামের সমাজ অনেকটা পরিচালিত হয় চার্চের নির্দেশিত পথে। তবু মিজোরাম দখলের স্বপ্নে বিভোর বিজেপি।
বিজেপি সূত্রের খবর, উত্তর-পূর্ব ভারতে তাদের আসল লক্ষ্য এবার ত্রিপুরা। টানা ২৪ বছর ধরে ত্রিপুরায় ক্ষমতায় রয়েছে সিপিএম। বিরোধী দলের ভূমিকায় এতকাল ছিল কংগ্রেস। কিন্তু তৃণমূলের উত্থানে কংগ্রেস ভাঙনের শিকার। তৃণমূলও নিজেদের ঘর ধরে রাখতে ব্যর্থ। রাজ্যের বিরোধীদের পরিস্থিতি বোঝাতে সম্প্রতি সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক বিজন ধর তৃণমূল কংগ্রেসকে কংগ্রেসের ‘ট্রানজিট ক্যাম্প’ বলে বর্ণনা করেন। একাধিক সাবেক মন্ত্রী, বিধায়ক, এমনকি প্রদেশ কংগ্রেস বা তৃণমূল সভাপতিও রয়েছেন এই দলে। তাই প্রবীণ কংগ্রেস নেতা তাপস দে বিজেপিকে ‘ডাম্পিং গ্রাউন্ড’ বলে বর্ণনা করেছেন।
এই ডাম্পিং গ্রাউন্ডকে হাতিয়ার করেই ত্রিপুরায় জিততে মরিয়া বিজেপি। প্রতি মাসে গড়ে একজন করে সর্বভারতীয় নেতা-মন্ত্রী আসছেনই। সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে বিজেপি নেতারাই দাবি করছেন, কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএর ১০ বছরে মাত্র ১৭ জন
মন্ত্রী ত্রিপুরায় এসেছেন। আর নরেন্দ্র মোদির তিন বছরে ৩৯ জন মন্ত্রী ত্রিপুরায় এসে চাঙা করেছেন সংগঠনকে।
বিজেপি নেতাদের পাশাপাশি সংঘ পরিবারের হিন্দিভাষী লোকজনেরও আসা-যাওয়া বেড়ে গেছে ত্রিপুরায়। বাড়ি বাড়ি ঘুরে তাঁরা হিন্দুত্বের বাণী প্রচার করছেন বলে অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। প্রসঙ্গত, কমিউনিস্টশাসিত ত্রিপুরায় ৮৩ দশমিক ৪০ শতাংশই হিন্দু। মুসলিম রয়েছেন ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। খ্রিষ্টান ৪ দশমিক ৩৫ এবং বৌদ্ধ ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ।
ধর্মীয় এই সমীকরণের পাশাপাশি ত্রিপুরায় রয়েছে জাতি ও উপজাতির বিন্যাস। ত্রিপুরা বিধানসভার ৬০টি আসনের মধ্যে ২০টি সংরক্ষিত তফসিলি উপজাতীয়দের জন্য। আর তফসিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত আরও ১০টি। দেখা গেছে, এই ৩০টির মধ্যে বেশির ভাগই সিপিএম জেতে। এবার সংরক্ষিত আসনেও নিজেদের শক্তিতে লড়তে চায় বিজেপি।
তবে বিজেপির উত্থানে চিন্তিত নয় ক্ষমতাসীন সিপিএম। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘চিন্তার কিছু নেই। কাজের নিরিখেই মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে ভোট দেবেন। মানুষের প্রতি আমাদের আস্থা আছে।’
বিজেপির বিজয় রথ আটকাতে সচেষ্ট কংগ্রেসও। সম্প্রতি উত্তর-পূর্ব ভারতের কংগ্রেস নেতাদের নিয়ে দিল্লিতে বৈঠক করেন কংগ্রেস সহসভাপতি রাহুল গান্ধী। বৈঠকে মেঘালয় ও মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী ছাড়াও অন্যান্য রাজ্যের কংগ্রেস নেতারা উপস্থিত ছিলেন। রাহুল গান্ধী দলীয় নেতাদের দলকে চাঙা করতে রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণের পরামর্শ দেন বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন ত্রিপুরা প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি বীরজিত সিনহা।
তরুণ চক্রবর্তী: প্রথম আলোর িত্রপুরা প্রতিনিধি।