default-image


ছোটবেলা থেকে জেনে আসছি, অর্থনীতির বইয়ে পড়ে আসছি, বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। আমার বিশ্বাস দেশের মানুষও এত দিন সেটাই জেনে আসছে। ২০১৮ সালের মার্চে সরকার এবং সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকে অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে জানতে পারলাম, মাত্রই উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য বিবেচিত হয়েছে বাংলাদেশ! সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সম্প্রতি জাতিসংঘ জানিয়েছে, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের জন্য চূড়ান্তভাবে যোগ্যতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। পাঁচ বছর পর এই উত্তরণ কার্যকর হবে। এটিকেই বাংলাদেশ সরকারের শীর্ষমহল, সংবাদমাধ্যম এবং অর্থনীতিবিদদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি অর্জনের জন্য চূড়ান্তভাবে যোগ্যতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ।

এখন প্রশ্ন হলো, এত দিন আমরা যে জেনে আসছি, আমাদের বইগুলোতে যে লেখা আছে, জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় যে বাংলাদেশের নাম আছে, এমনকি আইএমএফের (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল) ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকের তালিকাতেও যে বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আছে, সেটি কি তাহলে ভুল?

বিজ্ঞাপন

অর্থনীতির শিক্ষার্থী হিসেবে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি এবং বিস্ময়ের সঙ্গে জেনেছি, বাংলাদেশ ১৯৭৪ সাল থেকেই একটি উন্নয়নশীল দেশ। বর্তমানেও তাই আছে।জাতিসংঘের শ্রেণিকৃত তিনটি বৃহত্তর গ্রুপ, উন্নত অর্থনীতি, রূপান্তরিত অর্থনীতি ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশ ১৯৭৪ সাল থেকেই শেষোক্তটির অন্তর্ভুক্ত আছে।

আমরা যদি এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশ গঠনের পটভূমি লক্ষ করি তাহলে দেখব, ১৯৬৪ সালে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সম্মেলনের (আঙ্কটাড) প্রথম অধিবেশনে সদস্য দেশগুলো প্রতিটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য উপযুক্ত বা সমান সুযোগসহ টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতকরণের কার্যকর উপায় হিসেবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে অপেক্ষাকৃত স্বল্প উন্নতদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছিল। সেই লক্ষ্যে ১৯৭১ সালে প্রথম ২৫টি উন্নয়নশীল দেশকে এলডিসি ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করে। পরে ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে এই এলডিসি নামের বিশেষ গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত হয়।

এই বিশেষ গ্রুপটির বৈশিষ্ট্য হলো, তারা বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র এবং অর্থনৈতিক ও কাঠামোগতভাবে ভঙ্গুর। জাতিসংঘ এসব দেশকে আর্থিক এবং বাণিজ্যিকভাবে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে থাকে, যাতে তারা নিজেদের অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে একসময় এই গ্রুপ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। যেটিকে জাতিসংঘ বলছে গ্র্যাজুয়েশন ফ্রম এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ। জাতিসংঘের তথ্যমতে, একটি দেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হতে পারবে কি না তা তিনটি সূচক—মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—দিয়ে নির্ধারিত হয়।

তাহলে প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কী ঘটছে? একটি ছোটগল্পে প্রশ্নটির উত্তর খোঁজা যাক। এক গ্রামে এক শিক্ষক ছিলেন। প্রথম শ্রেণিতে তাঁর ক্লাসে কিছু ছাত্র পড়ালেখায় বেশ ভালো, নিয়মিত এবং মনোযোগী; আর কিছু ছাত্র পড়ালেখায় ভালো তবে কিছুটা অনিয়মিত। এ ছাড়া কিছু ছাত্র আছে যারা অনিয়মিত, অমনোযোগী; পড়ালেখাতেও তারা অনেক পিছিয়ে। শেষের এই ছাত্রদের সহযোগিতার জন্য তিনি ‘পিছিয়ে পড়া ছাত্র’ নামে একটি ছোট গ্রুপ করলেন। এই ছাত্রদের তিনি অনেক সময় দিতেন, নিয়মিত পড়ালেখার খোঁজখবর নিতেন, বই-খাতাও কিনে দিতেন।

কিছুদিন পর শিক্ষক দেখলেন, এই গ্রুপের কেউ কেউ পড়ালেখায় ভালো করছে, ক্লাসেও নিয়মিত আসছে। একদিন এ রকম এক ছাত্রকে শিক্ষক জানালেন, ‘পিছিয়ে পড়া’ গ্রুপ থেকে তার গ্র্যাজুয়েশন হয়েছে। ছাত্রটি খুশি মনে বাসায় ফিরে বাবা মাকে খবরটা জানাল। সন্তান প্রথম শ্রেণিতে ওঠার মর্যাদা লাভ করায় পর দিন শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করে ছাত্রটির বাবা কৃতজ্ঞতা জানালেন। শিক্ষক হেসে জানালেন, তাঁর ছেলে তো আগে থেকেই প্রথম শ্রেণিতে পড়ত, ওদের প্রতি একটু বিশেষ যত্নবান হতে তিনি শুধু আলাদা একটি ছোট গ্রুপ করে দিয়েছিলেন, যাতে ক্লাসের অন্য ছাত্রদের সঙ্গে পড়ালেখায় ওরা তাল মিলিয়ে চলতে পারে।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষকটির মতো জাতিসংঘও বাংলাদেশকে এলডিসি নামের একটি বিশেষ গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতির মাধ্যমে বাংলাদেশ আজ সেই স্বল্পোন্নত দেশ থেকে গ্র্যাজুয়েশন লাভের যোগ্যতা অর্জন করেছে। ফলে এলডিসি নামের যে স্ট্যাটাস বা কালিমা আমাদের কপালে জাতিসংঘ জুড়ে দিয়েছিল, সেটির অবসান হতে যাচ্ছে মাত্র। কিন্তু এই উত্তরণকে উন্নয়নশীল দেশের ঐতিহাসিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচনা করা কতটা যুক্তিসংগত, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। কেননা, আদতে বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশ ছিল, আছে এবং পাঁচ বছর পর এলডিসি থেকে বের হয়েও উন্নয়নশীলই থাকবে।

এরপরও যদি কেউ এটিকে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি অর্জন বলে মনে করেন, তাহলে বিষয়টি হবে এই গল্পটির মতো। একজন মানুষ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ওয়ার্ড থেকে আইসিইউতে নেওয়া হলো। কদিন বাদে অবস্থার একটু উন্নতি হলে তাকে আইসিইউ থেকে আবার ওয়ার্ডে আনা হলো। খুশি হয়ে সে ফোন করে সবাইকে জানাচ্ছেন, তাঁর আইসিইউ থেকে ওয়ার্ডে উত্তরণ ঘটেছে।

ড. ফরিদ খান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক
[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন