বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পাঁচ বছর আগেও ভারতের মাথাপিছু জিডিপি বাংলাদেশের চাইতে ৪০ শতাংশ বেশি ছিল। এরপর পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে ভারতের চাইতে অনেক বেশি হয়েছে। মাথাপিছু জিডিপির বিচারে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে বহু আগেই ছাড়িয়ে গেছে, এবার ভারতকে ছাড়িয়ে গেল। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল অভিহিত করেছেন। মহামারির মরণ ছোবল সত্ত্বেও বিশ্বের যে কয়েকটি দেশ গত দেড় বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে ধনাত্মক রাখতে সক্ষম হয়েছে, বাংলাদেশ তার অন্যতম। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, মহামারি সত্ত্বেও ২০২০ সালে বৈধ চ্যানেলে প্রবাসী রেমিট্যান্স ২৩ শতাংশ বেড়ে ২১ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে গেছে। ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২১ সালের আগস্টে ৪৮ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

কিন্তু চমকপ্রদ উন্নয়ন সত্ত্বেও এই ৫০ বছরে বাংলাদেশ অনৈতিকতার একটি বেড়াজাল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারেনি। আজ আমি এই বেড়াজালকে আলোচনার সামনে নিয়ে আসতে চাই। মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত বাংলাদেশের প্রথম সরকার বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ ঘোষণা করেছিল। রাষ্ট্রের চারটি মূলনীতির দ্বিতীয়টিই ছিল সমাজতন্ত্র। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ওয়েলথ এক্স’-এর প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ২০১২ সাল থেকে ২০১৭—এই পাঁচ বছরে অতি ধনীর সংখ্যাবৃদ্ধির বিচারে বাংলাদেশ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেছে। ওই পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ৩০ মিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদের মালিক অতি ধনীর সংখ্যা বেড়েছে বার্ষিক ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ হারে। দেশের আয় এবং সম্পদের এহেন পুঞ্জীভবন-উদ্ভূত আয়বৈষম্য বাংলাদেশের রাজনীতিকে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের’ নিকৃষ্ট নজির হিসেবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরছে।

জিয়াউর রহমানের শাসনামলে কাটাছেঁড়ার শিকার হলেও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চারটি মূলনীতির মধ্যে ২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে আবারও সমাজতন্ত্র পুনঃস্থাপিত হয়েছে। ২০১১ সালে সংসদে পাস হওয়া সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন মহাজোট সে রায়কে সংবিধানে ফিরিয়ে আনলেও সরকার এখনো ‘মুক্তবাজার অর্থনীতির’ মৌতাতে মেতে রয়েছে। ২০০১-২০০৫—ওই পাঁচ বছরে পাঁচবার বাংলাদেশ দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন করেছিল। এবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন করল ধনকুবেরের সংখ্যাবৃদ্ধির দৌড়ে।

এসব ‘রবার ব্যারন’ সৃষ্টির জন্য কি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম আমরা? একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আয়বৈষম্য এভাবে বাড়তেই পারে না, যদি শাসকেরা সমাজতন্ত্রকে ‘বাত্ কা বাত্’ বানিয়ে না ফেলে! আমি দৃঢ়ভাবে বলছি, সরকারের এহেন ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজমপ্রীতি’ অসাংবিধানিক ও অনৈতিক।

দ্বিতীয়ত, ‘দুর্নীতির প্রতি জিরো টলারেন্স’ নীতিকে শুধুই গলাবাজির রাজনীতির বাত্ কা বাত্ হিসেবে ব্যবহার করায় দেশের রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি গত এক যুগে সর্বনাশা ও সর্বব্যাপ্ত স্তরে পৌঁছে গেছে। দুর্নীতিতে বাংলাদেশ পাঁচবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত। ২০০১ সালে সরকারে ক্ষমতাসীন ছিল আওয়ামী লীগ। আর ২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ক্ষমতাসীন ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট। ২০০৭-০৮ সালে সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুর্নীতিবাজদের ‘প্রবল ঝাঁকি’ দেওয়ায় বাংলাদেশের ভাগ্যে দুর্নীতির বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ আর না জুটলেও আমাদের অবস্থান এখনো দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন এবং বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ১৫টি দেশের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে।

২০০৭-০৮ সালের সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতি দমন কমিশন যে প্রবল গতিশীলতা অর্জন করেছিল, সে জন্য স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দুর্নীতিবাজ ও পুঁজি-লুটেরা রাজনীতিক এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে ত্রাহি ত্রাহি রব উঠেছিল। দুদকের পাশাপাশি মেজর জেনারেল মতিনের নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী শক্তিশালী জাতীয় কমিটিও রাজনীতিবিদ ও রাঘববোয়াল ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রবল ত্রাসের সঞ্চার করেছিল ওই সময়। দুঃখজনক হলো, ২০০৯-২০২১ সালে দুদককে আর তেমন কার্যকর করা যায়নি। ‘দুর্নীতির প্রতি জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করে দুর্নীতি দমনে নিষ্ক্রিয়তা কি অনৈতিক নয়?

তৃতীয়ত, সরকারের সাম্প্রতিক সব বাজেটে কালোটাকা সাদা করার ব্যবস্থা বহাল রাখা হচ্ছে এবং কালোটাকার মালিকদের জন্য নতুন নতুন সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হচ্ছে। সৎ করদাতারা এ দেশে ১০ থেকে ২৫ শতাংশ কর দিয়ে থাকেন, অথচ অসৎ কালোটাকার মালিক মাত্র ১০ শতাংশ কর দেবে—এটা কি অনৈতিক নয়? বর্তমান অর্থমন্ত্রী দুর্নীতিবাজ কালোটাকার মালিকদের সক্রিয় মদদ প্রদানে কোনো রাখঢাক করছেন না। কালোটাকাকে ‘মেইন স্ট্রিমে’ নিয়ে না এলে নাকি এই টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাবে! এই সুবিধা ঘোষণার আসল কারণ হলো, প্রধানত দুর্নীতিবাজ আমলা ও রাজনীতিবিদদের জন্য সম্ভাব্য দুর্নীতি দমনের জাল থেকে পলায়নের পথ খুলে দেওয়া।

দেশের সংবিধানের ২০ (২) ধারা বলছে, ‘রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসাবে কোনো ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না’। অতএব মার্জিনখোর রাজনীতিবিদ, ঘুষখোর আমলা এবং মুনাফাবাজ/কালোবাজারি/চোরাকারবারি/ব্যাংকঋণ লুটেরা ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের শাস্তিবিধান না করা হলে সেটা কি অনৈতিক ও অসাংবিধানিক পদক্ষেপ হবে না?

চতুর্থত, দেশে খেলাপি ব্যাংকঋণ নিয়ে একটা ‘পাতানো খেলা’ চলছে। সমস্যার প্রকৃত রূপটি সরকার, ব্যাংকার এবং ঋণখেলাপি সবারই জানা আছে। সমস্যার সমাধানের উপায় সম্পর্কেও এই তিন পক্ষের সবার স্পষ্ট ধারণা আছে। কিন্তু জেনেশুনেই সরকার সমাধানের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করছে না। বরং বর্তমান অর্থমন্ত্রী ঋণখেলাপিদের জন্য নতুন নতুন সুবিধা বাস্তবায়ন করে চলেছেন! এই ঋণখেলাপিদের প্রায় সবাই ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’, যাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন যে তাঁরা ঋণ ফেরত দেবেন না। কারণ, তাঁদের রাজনৈতিক প্রতিপত্তি এবং আর্থিক প্রতাপ দিয়ে তাঁরা শুধু ব্যাংক খাত নয় বরং রাষ্ট্র পরিচালনাকারী প্রায় সব বিভাগকেই দখল করে ফেলেছেন।

গত ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখের নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের ৬১ দশমিক ৭ শতাংশই ব্যবসায়ী। করোনাভাইরাস মহামারি আঘাত হানার পর গত দেড় বছর আর কোনো ঋণগ্রহীতাকে খেলাপি ঘোষণা করা হচ্ছে না। তাই এই অনৈতিক পাতানো খেলা এখন মারাত্মক পর্যায়ে চলে গেলেও সংকটের প্রকৃত মাত্রা জানা যাচ্ছে না।

সবশেষে বলছি, ২০১৮ সালের নির্বাচনী প্রচারের পর্যায়ে যে সত্যটা ফুটে উঠেছিল, তা হলো দেশের অর্থনৈতিক অর্জনগুলোর কৃতিত্ব দিয়ে জনগণ মহাজোটকেই নির্বাচনে বিজয়ী করতে যাচ্ছে। কিন্তু তারা জনগণের নাড়িস্পন্দন ধরতে পারল না। ফলে বাংলাদেশের নির্বাচন ও গণতন্ত্র আবারও জালিয়াতির দুষ্টচক্রে বন্দী হয়ে গেছে। এই দুষ্টচক্র থেকে বের হতে চাইলে উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট এসব অনৈতিকতার জাল আমাদের ছিড়তে হবেই।

ড. মইনুল ইসলাম অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক।

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন