default-image

পাহাড়ে এখন একটু একটু শীত শুরু হয়েছে। এমন মিষ্টি শীতের এক রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে দূর পাহাড়ের ওপার থেকে বাঁশি ও ঢোলের বাজনা শুনে যে কেউ ভাবতে পারে, ম্রো পাহাড়ে উৎসব লেগেছে! সেদিন যাঁরা ওই ম্রো পাহাড়ে আগুন্তুক বা পর্যটক ছিলেন, তাঁদের কাছে সেদিনের বাঁশির সুর আর ঢোলের বাজনা থেকে আনন্দ না বেদনা খসে খসে পড়ছে, তা বোঝার কথা নয়।

ইতিমধ্যে অনেকেই জেনে গেছেন সেদিনের বাঁশির সুরে কী ছিল। বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ে প্রায় ৮০০–১০০০ একর জমি দখল করে ‘ম্যারিয়ট’ নামে একটি পাঁচ তারকা হোটেল ও অ্যামিউজমেন্ট পার্ক স্থাপন করা হবে। এই বিশাল এলাকাজুড়ে রয়েছে ম্রো পাড়াবাসীদের শত বছর ধরে সংরক্ষিত পাড়া, বন, শ্মশানভূমি, জুম পাহাড়, বনজ ও ফলদ বাগান।

এখানে জনবসতি এলাকার মধ্যে কাপ্রুপাড়া, দোলাপাড়া ও এরাপাড়া সরাসরি উচ্ছেদের শিকার হবে। একইভাবে মার্কিনপাড়া, লংবাইতংপাড়া, মেনসিংপাড়া, রিয়ামানাইপাড়া ও মেনরিংপাড়া উচ্ছেদ হুমকির মুখে থাকবে।

বিজ্ঞাপন

যে ম্রো পাহাড়ে একটাও প্রাইমারি স্কুল নেই, একটা জুনিয়র হাইস্কুল পর্যন্ত নেই, সেখানে ‘পাঁচ তারকা হোটেল’ কী জিনিস, সেটা স্থানীয়দের পক্ষে, বিশেষত যাঁরা শহুরে পরিবেশ থেকে দূরে থাকেন তাঁদের বোঝার কথা নয়।

তবে তাঁরা যতই অক্ষরজ্ঞান শূন্য হোন না কেন, তাঁদের কাছে এটা পরিষ্কার যে এই তারকাখচিত হোটেল তাঁদের রুটিরুজি, পায়ের তলার মাটি আর বাপ-দাদার রেখে যাওয়া বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন জুম পাহাড় কেড়ে নেবে। হ্যাঁ, অন্তরের এই ডাকই পাঁচ তারকার মতন ক্ষমতাধরদের সঙ্গে তাঁদের অসম লড়াইয়ের মূল শক্তি।

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের দ্বারপ্রান্তে এসেও ম্রো সম্প্রদায়কে যদি এখনো একটি প্রাইমারি স্কুল, একটি জুনিয়র হাইস্কুলের দাবি জানাতে হয়, চিৎকার করে সে কথা বলতে হয়, তাহলে এ লজ্জা ওই সম্প্রদায়ের নয়। এ লজ্জা সরকারের, এ ব্যর্থতা রাষ্ট্রের।

ম্রোদের পিঠ আজ পাহাড়ে ঠেকে গেছে। তাই নিজেদের অস্তিত্বের জন্য তারা, যাকে বলে আবালবৃদ্ধবনিতা পথে নেমে এসেছে। অস্তিত্ব সংকটের গিরিখাদে দাঁড়িয়েও শান্তিপ্রিয় ম্রোরা সহিংসতার পথ নয়, বেছে নিয়েছে কালাচারাল শোডাউনের মতন অহিংস প্রতিবাদের পথ। যে বাঁশির সুর আর ঢোলের আওয়াজ এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে আনন্দের মূর্ছনা তুলত, আজ সেই বাঁশির সুর কেন বিষাদে ছেয়ে গেল? কতটা গভীর বেদনা আর কষ্ট হলে সুরেলা বাঁশিও নীল হয়ে যায়? নীল কষ্টে ভরা বাঁশির এ কান্নার আওয়াজ কি আপনারা শুনতে পান?

পাহাড় কেটে বিলাসবহুল হোটেল নির্মাণ, হোটেলের শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারীর বাসস্থান নির্মাণ, পাহাড়ের ঝিরি বা ঝরনায় বাঁধ দিয়ে কৃত্রিম লেক বানিয়ে পর্যটন স্পটের সৌন্দর্য বাড়ানোর চেষ্টা করা হলে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্য সেটা মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধের ফলে জলে ডোবা মানুষগুলো ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে একটুখানি শুকনো জমির খোঁজে যে যার মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। ফলে তারা পরিবার থেকে, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বংশানুক্রম ধরে চলে আসা পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন চিরতরে হারিয়ে ফেলে। তেমনি এ তারকাখচিত ‘ম্যারিয়ট হোটেল’ ম্রোদের যে শুধু ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে তাদের শত বছরের সামাজিক বন্ধন ছিন্নভিন্ন করে দেবে তা–ই নয়, এর নীলাভ আলোর নীল বিষ ম্রোদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষ ছড়িয়ে দেবে।

বড়সড় সমাবেশ হয়েছে বলে আজ সবাই জানে, ম্রোদের ভিটেমাটি কেড়ে নিয়ে সেখানে পাঁচ তারকা হোটেল নির্মিত হচ্ছে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে কখনো সদম্ভে, কখনো নীরবে পাহাড়িদের, এই ম্রোদের ভিটেমাটি কেড়ে নিয়ে রিসোর্ট, রাবার বাগান, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, সে খবর কজনই বা রাখেন। আরেক দিকে রাতের আঁধারে অজানা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যত জেনেও কেউ কেউ হচ্ছেন দেশান্তরী।

চিম্বুকে ম্যারিয়ট হোটেল নির্মাণ কেন্দ্র করে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ও বান্দরবান জেলা পরিষদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের খবরও কোনো কোনো পত্রিকায় এসেছে। পার্বত্য চুক্তি লঙ্ঘন করে বান্দরবান জেলা পরিষদকে পাশ কাটিয়ে এ নির্মাণকারী গ্রুপের পক্ষে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।

তবে বান্দরবান জেলা পরিষদ যদি এ বিষয়ে একেবারেই ওয়াকিবহাল না হয়ে থাকে বা সিকদার গ্রুপের দাবি অনুযায়ী বান্দরবান জেলা পরিষদের ৮ শতাংশ শেয়ার থাকার বিষয়টি যদি ডাহা মিথ্যা হয়ে থাকে, তাহলে জেলা পরিষদ কেন এখনো এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না বা হোটেল নির্মাণের কাজ বন্ধ করে দিচ্ছে না? আমাদের সবার প্রশ্ন এখানেই।

বিজ্ঞাপন

পাহাড় কেটে বিলাসবহুল হোটেল নির্মাণ, হোটেলের শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারীর বাসস্থান নির্মাণ, পাহাড়ের ঝিরি বা ঝরনায় বাঁধ দিয়ে কৃত্রিম লেক বানিয়ে পর্যটন স্পটের সৌন্দর্য বাড়ানোর চেষ্টা করা হলে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্য সেটা মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। ২০১৭ সালের চট্টগ্রাম ও তিন পার্বত্য জেলার ভয়াবহ ভূমিধসের ঘটনার পরও কি আমাদের পরিবেশ রক্ষা নিয়ে শিক্ষা হবে না?
আজ তরুণ প্রজন্মের চোখে আমরা প্রতিবাদের আগুন দেখছি। আগামীকাল সেই আগুন সারা ম্রো পাহাড়ে স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়লে এর দায় কে নেবে?

এ মুহূর্তে একটি কবিতার কয়েকটি লাইন বারবার মনে ভেসে বেড়াচ্ছে, ‘ঝর্ণা-পাহাড়-জঙ্গল। কত পথ ভেঙে দেখা ভ্রাতৃপ্রতিম পাহাড়িদের সাথে। ...এখনো তারা শোষকের কপটতা-প্রতারণা শেখে নাই।...পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে যায় মুরং মেয়ে ... কবে তার কাঁধে শোভা পাবে রাইফেল একখানি।’ কোনো একসময় ক্লান্ত এক বিপ্লবীর কল্পনার চোখে যে চিম্বুক পাহাড় ভেসে উঠেছিল, আজ কল্পনার সেই অচেনা চিম্বুকই কি সত্যি হতে চলেছে।

উত্তরে সাজেক, দক্ষিণে চিম্বুক—পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামই যেন ভূমিখেকো, মুনাফালোভী ও ক্ষমতাসীনদের কাছে জিম্মি হয়ে আছে। স্থানীয় অধিবাসীদের একের পর এক গ্রাম থেকে উচ্ছেদ করে পর্যটনের বিকাশ ঘটিয়ে কার উন্নয়ন টেকসই করা হচ্ছে?
না, আর কোনো সংঘাত নয়। আমাদের একটাই চাওয়া, শান্তিপ্রিয় ম্রোরা যেন বাপ-দাদাদের রেখে যাওয়া পাহাড়ের গায়ে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে তাদের বংশপরম্পরায় যাপিত নিরিবিলি জীবন কাটাতে পারে। তাই অচিরেই পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণ প্রকল্প বাতিল করা হোক। ম্রো পাহাড়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হোক।


ইলিরা দেওয়ান হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক
ilira.dewan@gmail.com

মন্তব্য পড়ুন 0