বিজ্ঞাপন

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ৫০ বছর বয়সী শতাধিক গাছ রাতারাতি কেটে ফেলেছে গণপূর্ত বিভাগ। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই উদ্যানের ওপর মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়েরও এখতিয়ার রয়েছে। যেহেতু সেখানে রয়েছে স্বাধীনতা স্তম্ভ, ৭ মার্চের মঞ্চের চিহ্নিত স্থান, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের স্মারক, শিখা অনির্বাণ ইত্যাদি। তো, কী করে সেখানে এমন স্মৃতিবিধ্বংসী বৃক্ষনিধন চলতে পারল?

মানুষ গাছ দেখলে দেখে প্রাণ, কিন্তু মুনাফার চোখ দেখে শুধু কাঠ কিংবা গাছের তলার জমি। জীবিত গাছ টাকা দেয় না, মৃত গাছের দাম আছে। ফাঁকা জমি যতই সৌন্দর্য বাড়াক, তা থেকে টাকা আসে না। টাকা আসে হোটেল-রেস্টুরেন্টের মতো অর্থকরী জিনিস থেকে।

কিন্তু এ কথা কে কাকে বোঝাবে যে, এই শহরের ফুসফুসে যথেষ্ট অক্সিজেন যায় না; যেতে দেওয়া হয় না। তাই উদ্যান নিয়ে ব্যবসা করা অন্যায়। তা ছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশে শিশুপার্কে খাবারের দোকান আছে, টিএসসিতে খাবারের দোকান আছে। উদ্যান কি খাওয়াদাওয়ার স্থান? পাশের রমনা পার্কের দিকে দেখুন।

দ্বিজেন শর্মার মতো নিসর্গপ্রেমী ও পরিবেশবিদেরা পার্কটির বাণিজ্যিকায়ন ঠেকিয়েছেন বলে কী সুন্দর মনোরম পরিবেশ সেখানে। তা ছাড়া মন্ত্রীপাড়া ও সচিব ও বিচারকদের আবাসের কাছাকাছি হওয়ায় তাঁরাও এর পরিবেশ নষ্ট হতে দেননি। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী উদ্যান তো অভিজাত নয়। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসেও এটা জনতার ময়দান ছিল, এখনো এটা সাধারণ মানুষের পদচারণের জায়গা।

শাহবাগ এলাকাকে ঢাকার নবাবেরা বাগিচার মতো করে সাজিয়ে রেখেছিলেন। আর আজকের নবাবেরা জায়গাটিকে নিষ্প্রাণ করে ফেলেছেন। তরুণেরা একসময় চারুকলার সামনের জায়গায় আড্ডা দিত। ভালোবেসে জায়গাটার নাম দেওয়া হয়েছিল ছবির হাট। নতুন চিত্রকরেরা সেখানে ছবি বিক্রি করতেন, উঠতি গায়ক-গায়িকারা গান করতেন। আরও ভেতরে বসত লালনপ্রেমীদের গানের আসর। লিটল ম্যাগাজিনের লেখকেরা, প্রতিবাদী কর্মীরা, বিখ্যাত আড্ডারুরা এখানে ভাব বিনিময় করতেন।

করোনা মহামারির বহু আগে ‍পুলিশ দিয়ে সেসব উৎখাত করা হয়েছে। যারা জুটি, তারা না হয় রেস্টুরেন্টে গিয়ে দেখা করবে, কিন্তু তরুণ লেখক-সাহিত্যিকেরা কোথায় যাবে? এসব করে কীভাবে আমরা আশা করি যে এই শহরে নতুন কবি, নতুন চিন্তা, নতুন প্রাণের জোয়ার আসবে?

এদিকে উন্নয়নের রোগ কিছুই আগের মতো থাকতে দিচ্ছে না। কমলাপুর রেলস্টেশন ভেঙে ফেলা হবে, ভেঙে ফেলা হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ভবন। সবকিছু নতুন করতে করতে আমরা কি আর আমরা থাকব?

পুরোনো জায়গা, বয়সী বৃক্ষ, উদ্যান দেখে দেখে যেসব শিশু-কিশোর-তরুণ এই শহরে বড় হয়েছে, তারা কি তাদের শিশুদের নিয়ে গিয়ে দেখাতে পারবে যে দেখো, আমার ছোটবেলায় এখানে বেড়িয়েছিলাম, এখানে এসে আনন্দ পেয়েছিলাম! প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের যোগাযোগ, স্মৃতির মিল, অভিন্ন জায়গা-নিসর্গ কিংবা গাছের জন্য মায়া বলে কিছু থাকবে না? ভাঙা-গড়া চলতেই থাকবে?

এভাবে চললে সংস্কৃতির মেলবন্ধন বলে কিছু থাকবে না। এক প্রজন্ম আরেক প্রজন্মের আবেগ স্পর্শ করতে পারবে না। সময়ের সংযোগ হিসেবে পুরোনোকে তাই জমিয়ে রাখতে হয়। সব দেশে নগর ব্যবস্থাপনায় এদিক খেয়াল রাখা হয়। আমরা শুধু খেয়াল রাখি, কী করে নতুন স্থাপনা বানানো যায়। স্থাপনা টাকা দেয়, কিন্তু অক্সিজেন দেয় বৃক্ষ।

দ্বিজেন শর্মা একদল পরিবেশপ্রেমী নিয়ে ১২ বছর আগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কী করা যাবে আর কী করা যাবে না, তার একটা নকশা করে দিয়েছিলেন। সেটা বের করে দেখা হোক। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাস্টারপ্ল্যান খতিয়ে দেখা হোক।

দরকার পড়লে চার কোনায় চারটি খাবারের দোকান থাকতে পারে, তবে সেগুলোও হতে হবে অস্থায়ী। পাশাপাশি ওসমানী উদ্যানও যে উন্নয়নের ‘গোসসা নিবারণী পার্ক’ তৈরির নামে দীর্ঘ আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ করে রাখা হয়েছে উদ্যানটি। পুরো পার্ক টিন দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে; তার বিহিত হোক।

দেশের অনেক হর্তাকর্তা যখন দেশে বাড়ি বানান, কিংবা বিদেশে আস্তানা গাড়েন, তখন তো বৃক্ষশোভিত আবাসই পছন্দ করেন। কিন্তু বাক্স-বাক্স বাসাবাড়িতে থাকা আমজনতা উদ্যানের গাছের ছায়ায় মন জুড়াতে গেলে তাঁদের চোখ টাটায় কেন? উদ্যানকে দয়া করে উদ্যানের মতো থাকতে দিন, মাননীয় প্রশাসন।

ফারুক ওয়াসিফ: লেখক ও সাংবাদিক।
[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন