default-image

প্রথমেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমানকে খাস দিলে ধন্যবাদ জানাই যে তিনি খাদ্যসংকটে থাকা মানুষগুলোর কথা চিন্তা করেছেন। যে দেশে সবাই তেলা মাথায় তেল দিতে অভ্যস্ত, সে দেশে অভুক্ত, নিরন্ন মানুষের কথা তিনি ভেবেছেন এবং সংবাদ সম্মেলন করে দেশবাসীকে জানিয়েও দিয়েছেন।

প্রতিমন্ত্রী মহোদয় আমাদের সুখবর দিয়েছেন, ‘কেউ খাদ্যকষ্টে থাকলে ৩৩৩ নম্বরে ফোন করলে তাঁকে তালিকাভুক্ত করে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে। কাউন্সিলরদের বলেছি, যে যেখানে থাকুন না কেন খাদ্যকষ্টে থাকলে তাঁকে এনআইডির ভিত্তিতে খাদ্যসহায়তা দিতে হবে।’

ইতিমধ্যে ৯৯৯ টেলিফোন নম্বরটি বেশ পরিচিতি পেয়েছে। যেকোনো নাগরিক বিপদে পড়লে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে প্রতিকার চাইতে পারেন। টেলিফোন পেলে ৯৯৯-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা  প্রয়োজন অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ বা অ্যাম্বুলেন্স সেবা প্রদানকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিকারও মিলেছে।
ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ৩৩৩ নম্বরে টেলিফোন করলে ওয়ার্ড কাউন্সিলররা খাদ্য পৌঁছে দেবেন বলে জানিয়েছেন। আমাদের ওয়ার্ড কাউন্সিলররা কত ব্যস্ত, তা কি তিনি জানেন?

বিজ্ঞাপন

কোথাও ক্যাসিনো কারবার হয়েছে, তার সঙ্গে কাউন্সিলররা জড়িত, খাল দখল, মাঠ দখল, রাস্তা দখল ইত্যাদির সঙ্গেও তাঁদের নাম আসছে। তাহলে টেলিফোন পাওয়ামাত্র কারা অভাবী মানুষকে খাদ্য পৌঁছে দেবেন?

লকডাউনের কারণে যাঁরা খাদ্যসংকটে আছেন, তাঁদের অনেকের কাছে মোবাইলও নেই। কীভাবে কাকে ফোন করতে হয়, তা-ও জানেন না অনেকে। প্রতিমন্ত্রী আইডি কার্ড দেখে খাদ্য দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু এই ঢাকা শহরের অভাবী মানুষের বড় অংশই ঢাকার ভোটার নন। তাঁরা গ্রামের ভোটার। পেটের দায়ে, জীবিকার টানে ঢাকা শহরে বাস করলেও তাঁরা বহিরাগত। আউটসাইডার। মাননীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলররা আবার ভোটার ছাড়া কাউকে শনাক্ত করেন না।

বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গিয়ে যেসব শ্রমিক কাজ করেন, সেসব দেশের মানুষ তাঁদের মিসকিন ভাবেন। একইভাবে গ্রাম থেকে কাজের সন্ধানে আসা গরিব মানুষগুলোকেও ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দারা মিসকিনের চেয়ে বেশি কিছু ভাবেন না। অনেক এলাকায় গৃহকর্মী, নিরাপত্তারক্ষী ও গাড়ির চালকদের লিফট ব্যবহার করতেও দেওয়া হয় না। ‘জমিদারি প্রথা’ এখনো বহাল আছে।

২৫ এপ্রিল ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মানবিক সহায়তার যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তা দেখে ভিরমি খাওয়ার অবস্থা। তিনি বলেছেন, কর্মহীন হয়ে পড়া দরিদ্র মানুষকে মানবিক সহায়তা দিতে সরকার এ পর্যন্ত ৫৭৪ কোটি ৯ লাখ ২৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এতে প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ পরিবার (নাকি ব্যক্তি!) উপকৃত হবে।

আমি অঙ্কে কাঁচা। কোটি-লাখের হিসাব কখনো মেলাতে পারি না। হাতের কাছে থাকা ক্যালকুলেটার দিয়ে অঙ্ক কষে দেখলাম, প্রতি পরিবার ৪৬২ টাকা ৯০ পয়সা করে পাবে। এক পরিবারে যদি সদস্যসংখ্যা পাঁচজন থাকে, জনপ্রতি পাবে ১০০ টাকারও কম। এটাই যদি গরিব মানুষের জন্য দিলদরাজ সরকারের মানবিক সাহায্য হয়, তাহলে সাহায্যের নামে মশকরা কোনটা?

সেই সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী সাধারণ ত্রাণ হিসেবে নগদ ১২১ কোটি ও ভিজিএফের জন্য ৪৭২ কোটি টাকা দেওয়ার হিসাবও দিয়েছেন। বড় সিটি করপোরেশনগুলোকে ৫৭ লাখ এবং ছোট সিটি করপোরেশনগুলোকে ৩২ লাখ করে টাকা দেওয়ার কথা বলেছেন।
এসব সহায়তা সব বছরই দেওয়া হয়। ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দেওয়া হয়। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দেওয়া হয়।

আমাদের জিজ্ঞাসা হলো, করোনাসংকটের কারণে কাজ হারানো মানুষকে কতটা বাড়তি সহায়তা দিল গরিববান্ধব সরকার?

বিজ্ঞাপন

ত্রাণ প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী কয়েক দিন আগে কর্মহীন মানুষকে আর্থিক সহায়তা দিতে সাড়ে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা কত? সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বাধীন পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন দাবি করেছে, লকডাউনের কারণে ৫০ লাখ পরিবহনশ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। নৌপরিবহন বন্ধ থাকায় আরও কয়েক লাখ। এ ছাড়া দিন আনা দিন খাওয়া মানুষের সংখ্যাও কম নয়। তাঁদের জন্য মাত্র সাড়ে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ।

গত বছরের মে মাসে সরকার ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারকে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিলেও প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী ৩৬ লাখ পরিবারকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তালিকা জটিলতার কারণে বাকিরা সহায়তা পাননি। এটি মাসিক সহায়তা নয়। এককালীন সহায়তা। গত বছর যাঁরা এই সহায়তা পেয়েছেন, এ বছরও পাবেন আশা করা যায়। অর্থাৎ দুটি দফায় প্রতি হতদরিদ্র পরিবার পাবে ৫ হাজার টাকা।

কিন্তু এই তালিকার বাইরে যাঁরা থাকবেন, যাঁরা গত ৫ এপ্রিল থেকে কাজ হারিয়ে ঘরে বসে আছেন, তাঁরা কী করবেন? করোনার আগেই ২১ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত। কমপক্ষে সাড়ে তিন কোটি । ব্র্যাক ও পিপিআরসির গবেষণা অনুযায়ী ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ নতুন করে গরিব হয়েছে। সব মিলিয়ে সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ছয় কোটি। বাংলাদেশ হলো অতি দ্রুত ধনী হওয়া এবং অতি দ্রুত গরিব হওয়ার দেশ।

এর আগে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল, করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ কোনো সরকারি সহায়তা পাননি। এক-তৃতীয়াংশ সামান্য সহায়তা পেয়েছেন। ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এই অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে বলেছিলেন, দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ সহায়তা না পেলে দেশে বিক্ষোভ হতো। বিক্ষোভ কেন হয়নি, তিনি ভালো করেই জানেন। সুস্থ ও স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকলে তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা বুঝতেন তত ধানে কত চাল। ভারতে কৃষকেরা দোর্দণ্ড প্রতাপশালী মোদি সরকারকে নাকানি-চুবানি খাইয়ে দিয়েছিলেন।

তা ছাড়া বাংলাদেশে একদম বিক্ষোভ হয়নি, তা সত্য নয়। গত বছর সাধারণ ছুটির সময় গণপরিবহনসহ বিভিন্ন খাতের শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেছেন। এপ্রিলে লকডাউন শুরু হওয়ার পর গণপরিবহনের শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেছেন। দোকান কর্মচারী ও হকারেরা বিক্ষোভ করেছেন। রাইড শেয়ারিংয়ের চালকেরা বিক্ষোভ করেছেন। যাঁরা রাস্তায় নামতে পেরেছেন, সরকার তাঁদের কিছু কিছু দাবি মেনেও নিয়েছে।

কিন্তু যাঁরা সমাজের একেবারে প্রান্তিক অবস্থানে আছেন, যেমন গৃহকর্মী, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, মুটেমজুর তাঁদের বিক্ষোভ করারও সামর্থ্য নেই। তাঁদের জন্য প্রতিমন্ত্রী দয়াপরবশ হয়ে পরিবারপ্রতি ৪৬২ টাকা এবং জনপ্রতি ১০০টাকার কম বরাদ্দ করেছেন। হতদরিদ্র মানুষের প্রতি জনদরদি সরকারের উপযুক্ত বরাদ্দই বটে!

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন