বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

টি-২০ বিশ্বকাপে স্বপ্নভঙ্গ

কষ্টেসৃষ্টে চলমান টি-২০ বিশ্বকাপের সুপার-১২ টিমের অন্তর্ভুক্ত হলেও সেমিফাইনালের প্রতিযোগিতা থেকে পয়েন্ট তালিকায় সর্বনিম্ন স্থান নিয়ে প্রথমেই বিদায় নিয়েছে বাংলাদেশ। নিজেদের গ্রুপের পাঁচটি ম্যাচেই বাংলাদেশ পরাজিত হয়েছে। শ্রীলঙ্কা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে মোটামুটি খেললেও ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে বাজেভাবে হেরেছে। অথচ এমন একটা অসত্য ধারণা (হাইপ) সৃষ্টি করা হয়েছিল, যাতে অনেক ক্রীড়ামোদীর ধারণা হয়েছিল যে বাংলাদেশের সেমিফাইনালে খেলার সম্ভাবনা উজ্জ্বল। এমনকি ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে বিশ্বকাপ জিতেও যেতে পারে। মিরপুর ও চট্টগ্রামের মাঠে তৈরি করা নিম্নমানের পিচে খেলে বিদেশি দলের বিরুদ্ধে আমাদের দলের বিজয়ও এ ধারণা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে।

আমাদের সামনের কথা ভেবে এগিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশ ক্রিকেট ব্যবস্থাপনা ও দল পুনর্গঠনের প্রকৃষ্ট সময় এখন। ক্রিকেট খেলা কেবল শহর নয়, গ্রামগঞ্জেও সম্প্রসারিত হয়েছে। বাংলাদেশের অনেক কিশোরই এখন ক্রিকেট তারকা হওয়ার স্বপ্ন দেখে। আমাদের সামনে তাই দুটি পথ খোলা আছে। হয় আমরা সেসব কিশোরের স্বপ্নের সারথি হতে পারি অথবা তাদের স্বপ্নভঙ্গের কারণ হতে পারি।

খেলায় হারজিত আছে

খেলায় হারজিত আছে, তাহলে বাংলাদেশ দলের পারফরম্যান্স নিয়ে এত কথা কেন? প্রথম কারণটি হলো এ আসরে নতুন খেলতে আসা দেশ স্কটল্যান্ড, নামিবিয়া, এমনকি পাপুয়া নিউগিনির ভালো পারফরম্যান্স। উল্লেখ্য, প্রথম রাউন্ডের খেলায় বাংলাদেশ স্কটল্যান্ডের কাছে পরাজিত হয়। সমমানের টিম শ্রীলঙ্কা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ মোটামুটি ভালো খেলে। দ্বিতীয় কারণটি আগেই বলা হয়েছে। বিশ্বকাপ শুরুর প্রাক্কালে সৃষ্ট হাইপ। তৃতীয় কারণটি হলো, খেলোয়াড়দের ম্যাচ–পরবর্তী মন্তব্য, এমনকি খেলোয়াড়দের পরিবার ও সাবেক খেলোয়াড়দের বিতর্কে জড়িয়ে পড়া—আঘাত, ব্যথানাশক নিয়ে তাঁরা খেলেন, আয়নায় দেখার পরামর্শ, ২০১৯ সালে বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স ইত্যাদি অনাহূত মন্তব্য। আঘাত, ব্যথানাশক নিয়ে খেলে না, এমন কোনো টিম আছে বলে আমার জানা নেই। চতুর্থ কারণটি হলো, বিসিবির নেতৃত্ব নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই স্বৈরাচারী মনোভাব, পঞ্চপাণ্ডবের উত্থান, দলীয় রাজনীতির প্রভাব ইত্যাদি অভিযোগ। সর্বশেষ কারণটি হলো, দলে মেয়াদোত্তীর্ণ খেলোয়াড়দের এখনো ধরে রাখা।

কেন এমন হলো

টি-২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের সমস্যার কথা প্রথম আঁচ করতে পারি, যখন দলের পাওয়ার হিটার তামিম ইকবাল টি-২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দল থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন। নতুনদের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হলেও বুঝতে পারি, ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়’। পাকিস্তানের শোয়েব মালিক আরও অনেক প্রবীণ খেলোয়াড় হলেও সে দেশের নির্বাচকেরা তাঁকে বাদ দেননি। তিনি দলে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করেছেন। বিশ্বকাপ কোনো এক্সপেরিমেন্ট নয় যে এখানে পরীক্ষিত খেলোয়াড়দের বাদ দিতে হবে। এর আগেও বিদেশে খেলতে গিয়ে খেলোয়াড় ও টিম ম্যানেজমেন্টের সদস্যদের ক্যাসিনো–কাণ্ডের সংবাদ আমাদের বিচলিত করেছিল।

সামনের পথ

যাহোক, অতীতকে তো আর শোধরানো যাবে না। আমাদের সামনের কথা ভেবে এগিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশ ক্রিকেট ব্যবস্থাপনা ও দল পুনর্গঠনের প্রকৃষ্ট সময় এখন। ক্রিকেট খেলা কেবল শহর নয়, গ্রামগঞ্জেও সম্প্রসারিত হয়েছে। বাংলাদেশের অনেক কিশোরই এখন ক্রিকেট তারকা হওয়ার স্বপ্ন দেখে। আমাদের সামনে তাই দুটি পথ খোলা আছে। হয় আমরা সেসব কিশোরের স্বপ্নের সারথি হতে পারি অথবা তাদের স্বপ্নভঙ্গের কারণ হতে পারি। তাই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। তা না হলে আমাদের ভাগ্যে জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়ার পরিণতি অপেক্ষা করছে।

কী করতে হবে

অনেকে মনে করেন, বিসিবির প্রধানসহ নির্বাচকমণ্ডলীর সব সদস্যকে পদত্যাগ করতে হবে। তাঁরা যদি বাংলাদেশের ক্রিকেটকে সত্যিই ভালোবাসেন, তাহলে তাঁরা নিজেরাই ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগ করবেন, নয়তো তাঁদের অপসারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নতুন একজন বিসিবিপ্রধান নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, (ক) নতুন বিসিবিপ্রধানকে একজন সাবেক খেলোয়াড় অথবা বিশিষ্ট ক্রিকেট সংগঠক হতে হবে। (খ) দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বের ব্যক্তি হতে হবে। খেলার মাঠে রাজনীতিবিদেরা বড়ই বেমানান। (গ) নতুন বিসিবিপ্রধানের বিসিবিকে দেওয়ার মতো মেধা ও পর্যাপ্ত সময় থাকতে হবে। বর্তমান সভাপতির মতো একাধারে সাংসদ, ব্যবসায়িক ব্যক্তিত্বসহকারে ‘থ্রি ইন ওয়ান’ হলে চলবে না। তৃতীয়ত, কোচ নির্ধারণপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে হবে। দরিদ্র আফগানিস্তান দলের প্রধান কোচ বিশিষ্ট খেলোয়াড় ল্যান্স ক্লুজনার আর ৯০০ কোটি টাকা আমানতধারী বিসিবির কোচ রাসেল ডমিঙ্গো, এটা মেনে নেওয়া যায় না। স্থানীয় কোচদের উৎসাহিত করতে হবে। উল্লেখ্য, সম্প্রতি ভারতের সাবেক কৃতী খেলোয়াড় রাহুল দ্রাবিড়কে দেশটির দলের প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরেক কৃতী খেলোয়াড় রবি শাস্ত্রীর কাছ থেকে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। চতুর্থত, দেশে অনুষ্ঠিত ক্রিকেট খেলায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাকে মাথায় রেখে পিচ তৈরি করতে হবে। সবশেষে মেয়াদোত্তীর্ণ খেলোয়াড়দের তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি জানিয়ে সসম্মানে বিদায় জানাতে হবে।

ক্রিকেট, আন্তর্জাতিক মণ্ডলে আমাদের একমাত্র উপস্থিতি, আমাদের শিশু–কিশোরদের স্বপ্নের, জাতির ভালোবাসার প্রতীক। আমরা আশা রাখতে চাই, অব্যবস্থাপনা, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, অযোগ্যতা ও দলীয়করণ করে আমাদের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা কেড়ে নেবেন না!

মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সাবেক সচিব ও অধ্যাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন