বিজ্ঞাপন

অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড হোমস প্রফেসর ইয়ং জেনের দীর্ঘদিনের সহকর্মী। নতুন ভাইরাসের জিন মানচিত্র নিয়ে ফোনে আলোচনা হয়। দুজনেই একমত, এটা হয়তো সার্স জাতীয় ভাইরাস, শ্বাসনালি দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। প্রফেসর হোমস এই জিন মানচিত্র ইন্টারনেটে প্রকাশ করার প্রস্তাব করেন। কয়েক মিনিট ভেবেই প্রস্তাবে সম্মতি দেন ডক্টর ইয়ং জেন। ২০২০ সালের ১১ জানুয়ারি গবেষকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় করোনাভাইরাসের জিন মানচিত্র।

এটাই হয়তো আধুনিক বিজ্ঞান ইতিহাসের অন্যতম সেরা সিদ্ধান্ত। কেন? মানুষের শরীরে ভাইরাস শনাক্ত ও ভ্যাকসিন তৈরি জিন মানচিত্র ছাড়া সম্ভব নয়। ভাইরাসের নতুন রূপ শনাক্ত করার জন্য প্রয়োজন প্রথম দিকের ভাইরাসের নির্ভুল জিন মানচিত্র। শত্রুকে শনাক্ত ও পরাস্ত করতে তার শরীরের গঠন জানা একান্ত জরুরি। জিন মানচিত্রের মাধ্যমে ভাইরাসের অতি সূক্ষ্ম শারীরিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য জানা যায়।

বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েলকাম ট্রাস্টের প্রধান জেরেমি ফারারের মতে, এই মানচিত্রের দ্রুত প্রকাশ গণস্বাস্থ্য রক্ষায় একটা দারুণ পদক্ষেপ ছিল। ২০ বছরে জিন মানচিত্র তৈরির প্রযুক্তিতে অগ্রগতি হয়েছে অবিশ্বাস্য। শুরুটা হয়েছিল ২০০৩ সালে। মানব শরীরের জিন মানচিত্র তৈরিতে সময় লেগেছিল ১৩ বছর। খরচ হয়েছিল দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি। ২০০৮ সালে খরচ কমে দাঁড়ায় এক মিলিয়ন ডলারে। ২০১৭ সালে ৯০০ আর এখন ৩০০ ডলার বা আরও কম। সময় লাগে এক থেকে দুদিন।

করোনাভাইরাসের জিন মানচিত্র প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই ভ্যাকসিন তৈরিতে নেমে পড়েন অক্সফোর্ডের বিজ্ঞানী সারা গিলবার্ট আর তাঁর দল। এর আগে ইবোলা আর মার্সের ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা করেছিলেন সারা। ২০১৪ সালে প্রথম ধাপের পরীক্ষা শুরু করার পর ইবোলার প্রকোপ কমে যায়, ফলে পরীক্ষা আর এগোয়নি। মার্সের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। ভ্যাকসিনের পরীক্ষার জন্য সাধারণের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার স্বাভাবিক সংক্রমণ দরকার। অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগান সারা। দেরিতে ভ্যাকসিন তৈরি শুরু করার ফলটা তিনি জানতেন। অন্যরাও বসে থাকেননি। ফাইজার, বায়োএনটেক, মডার্না ও আরও অনেকে মাঠে নামে। ফাইজার আমেরিকান কোম্পানি, কর্ণধার গ্রিক। বায়োএনটেক জার্মান কোম্পানি, প্রতিষ্ঠাতা তুর্কি বংশোদ্ভূত জার্মান দম্পতি। বায়োএনটেকের ভ্যাকসিনের প্রধান ক্যাটালিন কারিকো, হাঙ্গেরিয়ান আমেরিকান।

কোনো রকম সাহায্য ছাড়া আমরা মাত্র ছয় ফুট ওপরে উঠতে পারি। কিন্তু ৫০০ মানুষ নিয়ে লন্ডন থেকে সিডনি উড়ে যেতে পারি ২৪ ঘণ্টায়, তিন দেশের অসংখ্য মানুষের সমন্বিত উদ্যোগে তৈরি আধুনিক বিমানে করে

একটা ভ্যাকসিন বাজারে আনতে সময় লাগে ১০ থেকে ১৫ বছর। খরচ ন্যূনতম এক বিলিয়ন ডলার বা তারও বেশি। ১০০টি পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিন থেকে মাত্র ৬-৭টি ভ্যাকসিন কার্যকর হয়। ম্যালেরিয়া জীবাণু শনাক্ত হয় ১৮৮০ সালে, এখনো ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়নি। চিকেন পক্সের প্রথম দেখা মেলে ১৯২১ সালে, ভ্যাকসিন আসে ১৯৮১–তে।

করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে মহাযুদ্ধ। বিজ্ঞানের এক মহোৎসব। দেশ, জাতি, ধর্ম–বর্ণ একাকার। ফলাফল? এক বছরের মধ্যে একাধিক টিকা। ৯১টি টিকা মানবদেহে পরীক্ষাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ২৭টির পরীক্ষা শেষ পর্যায়ে। এর মধ্যে রয়েছে একাধিক নতুন প্রযুক্তির টিকা, যা কিনা অন্য টিকা তৈরির সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে। এগুলো সম্ভব হয়েছে অসংখ্য বিজ্ঞানীর সমন্বিত প্রচেষ্টায়। আধুনিক বিজ্ঞানের যেকোনো আবিষ্কারের পেছনে একাধিক মানুষের বহু বছরের শ্রম থাকে।

মানুষের বিবর্তন নিয়ে কাজ করেন হার্ভার্ডের প্রফেসর জো হেনরিক। তাঁর মতে, লাখ লাখ বছর ধরে পৃথিবীতে মানুষের টিকে থাকা এবং এগিয়ে চলার মূলে রয়েছে সমন্বিত বুদ্ধিমত্তা আর সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আমাদের একক মানসিক ও শারীরিক ক্ষমতা খুবই নগণ্য। বড় বিড়াল, যেমন ধরেন বাঘ–সিংহ আমাদের একা পেলে নিমেষেই কাবু করে দিতে পারে। কিন্তু একসঙ্গে অনেক মানুষ থাকলে বাঘ-সিংহ মোকাবিলা করা যায়।

জন্মের পর বছরের পর বছর মানবশিশু মায়ের ওপর নির্ভরশীল। অপর দিকে প্রাণিকুলে জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই স্বাবলম্বী হয়ে ওঠা প্রাণী ও পাখির সংখ্যা একাধিক। কোনো রকম সাহায্য ছাড়া আমরা মাত্র ছয় ফুট ওপরে উঠতে পারি। কিন্তু ৫০০ মানুষ নিয়ে লন্ডন থেকে সিডনি উড়ে যেতে পারি ২৪ ঘণ্টায়, তিন দেশের অসংখ্য মানুষের সমন্বিত উদ্যোগে তৈরি আধুনিক বিমানে করে।

ইউভাল নোয়া হারারি খ্যাতনামা চিন্তাবিদ। মানুষের বিবর্তনের ইতিহাস নিয়ে নামকরা কিছু বই লিখেছেন। তাঁর মতে, নিরবচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপে একজন মানুষ ও একটি শিম্পাঞ্জিকে রাখা হলে মানুষের থেকে ওই দ্বীপে শিম্পাঞ্জির টিকে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। মাটিতে খাবার না পেলে শিম্পাঞ্জি গাছে উঠে খাবার সংগ্রহ করতে পারবে। এক গাছে না পেলে আরেক গাছে অনায়াসে বিচরণ করতে পারে। একজনের জায়গায় দুজন মানুষ হলে ওই দ্বীপে মানুষের টিকে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে। অনেকসংখ্যক মানুষ একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করতে পারে। পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বিত বুদ্ধিমত্তা পৃথিবীতে আমাদের টিকে থাকার, এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। একাকী আমরা অতি তুচ্ছ, বড় অসহায়।

ড. সুব্রত বোস প্রবাসী বাংলাদেশি এবং বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন