default-image

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের খুব কাছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা স্মরণে একটি ভাস্কর্য স্থাপিত হয়েছে। ১ ফেব্রুয়ারি, যেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে ভাস্কর্যটি উন্মোচিত হয়, সেদিন পশ্চিম আফ্রিকার টোগো থেকে একদল রাজনৈতিক কর্মী এসেছিলেন নিজ দেশে রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির দাবি নিয়ে। তাঁদের লক্ষ্য ছিল জাতিসংঘের ঠিক উল্টো দিকে র্যালফ বাঞ্চ পার্কে সমবেত হওয়া। হঠাৎ নজরে এল মাতৃভাষা ভাস্কর্যটি। তাঁরা সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়লেন, সঙ্গে আনা প্ল্যাকার্ড তুলে ধরলেন, যাঁর যাঁর দুই হাত আকাশের দিকে
মেলে ধরলেন।
আমরা যাঁরা সেখানে সমবেত হয়েছিলাম, তাঁদের বুঝতে কষ্ট হলো না, এই বিদেশি মানুষগুলো কীভাবে এই ভাস্কর্যের ভেতরে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের বার্তাটি নির্ণয়ে সক্ষম হলো। যে দেশের বা যে জনগোষ্ঠীরই হোক না, সব প্রতিবাদই অন্তর্গতভাবে অভিন্ন। সে চলতি নিয়মকে প্রত্যাখ্যান করে, সে ভিন্নমত প্রকাশ করে, সে সংহতি খোঁজে। সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষাভাষী ও ভিন্ন জনপদের মানুষ হলেও টোগোর এসব প্রতিবাদী মানুষের পক্ষে একুশের প্রতীকবহ এই ভাস্কর্যের ভেতর সংহতির আশ্বাস খুঁজে নিতে কষ্ট হয়নি।
একুশের আসল শক্তি তার এই প্রতীকময়তা। একুশ বাঙালিকে আন্দোলিত করে, তার ভেতরে সে প্রতিবাদ ও বিজয়ের সন্ধান পায়, এই দিন তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় প্রতিটি বিজয়ের পেছনে আছে কঠোর আত্মত্যাগ।
দেশের বাইরে আমি প্রথম একুশ উদ্যাপন করি ১৯৭৪ সালে, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যতম প্রজাতন্ত্র ইউক্রেনের খারকফ শহরে। সেখানে তখন আমরা ছাত্র, সদ্য স্বাধীন একটি দেশের প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের পরিচয় লড়াকু হিসেবে। সিদ্ধান্ত হলো আমরা একুশ উদ্যাপন করব এবং ঢাকায় যেভাবে একুশের প্রথম প্রহরে ফুল দেওয়া হয়, আমরাও সেভাবে ফুল দিয়ে একুশকে বরণ করে নেব। সেখানে একুশের মিনার নেই, আছে লেনিন স্মৃতিস্তম্ভ। ঠিক হলো, ঠিক মধ্যরাতে আমরা ফুল নিয়ে হাজির হব শহরের কেন্দ্রে সেই লেনিন স্মৃতিস্তম্ভে।
কথাটা বলা যত সহজ, করা ততটা নয়। ফেব্রুয়ারি মাসে খারকফে প্রচণ্ড শীত, চারদিকে কঠিন জমাটবাঁধা বরফ। অন্য সমস্যা, মধ্যরাতের পর যানবাহন পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ৪০ বছর আগের খারকফ ঘুমকাতুরে এক মফস্বলীয় শহর ভিন্ন অন্য কিছু ছিল না। কেউ কেউ একুশের দিনের বেলায় ফুল দেওয়ার কথা ভাবলেন, কিন্তু বুদ্ধিমন্তদের সেসব উপদেশ কাজে লাগল না। ফেব্রুয়ারিতে তাজা ফুল মেলা কঠিন, মিললেও তার দাম বিস্তর।
আমরা সদ্যাগত ছাত্র, পকেটে রেস্ত নেই। ঠিক হলো কাগজের ফুল নিয়ে যাব। আমাদের সঙ্গে যুক্ত হলো বছর দুয়েক ওপরের ক্লাসে পড়ুয়া এক রুশ বন্ধু। সেই শহরে আমরা তখনো নতুন, আমাদের চেয়ে পথঘাট তার বেশি ভালো চেনা, পুলিশ ঝামেলা করলে তার পক্ষে বুঝিয়ে বলাও সহজ হবে। তার পিছু পিছু মাঝরাতের বেশ আগেই আমরা ট্রামে চড়ে রওনা হলাম।
এ কথাগুলো লেখার সময়, এত বছর পরেও, আমি শিহরিত হচ্ছি। আমরা জনা বারো ছাত্রছাত্রী, সঙ্গে সেই রুশ বন্ধু, শীত রাতের ট্রামে আমরা ভিন্ন অন্য কোনো যাত্রী নেই। প্রথমে ভেবেছিলাম বেশ মজার একটা ব্যাপার, কেমন উৎসব উৎসব আমেজ। অথচ ট্রামে ওঠার পর আমাদের কারও মুখে কথা নেই, সবাই যেন নিঃশব্দে কোনো স্মৃতি হাতড়ে বেড়াচ্ছি। একুশ যেন এক পবিত্র অর্জন, এই বিদেশ-বিভুঁইয়ে তাকে আগলে রাখার দায়িত্ব কেবল আমাদের। একটি পুরো দেশের মানুষ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। বলছে, এই পবিত্র অর্জন যেন খোয়া না যায়।
খারকফ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে লেনিন স্তম্ভ। অধিকাংশ সরকারি আনুষ্ঠানিকতার জন্য এই চত্বরকেই বেছে নেওয়া হয়, এখানেই অক্টোবর বিপ্লবের কুচকাওয়াজ হয়, বিদেশিরা এলে একবারের জন্য হলেও এখানে আসবেন, নবদম্পতিরা বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সবার আগে এখানে আসেন ফুলের অর্ঘ্য নিয়ে। একুশের অর্ঘ্য নিয়ে আমরাও সেখানে।
ট্রাম থেকে নামলাম, তখনো মধ্যরাত হয়নি। দূর থেকে দেখা যায় ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনকে, এক হাত বুকের কাছে, অন্য হাত ঊর্ধ্বাকাশে, যেন তর্জনী উঁচিয়ে আমাদের উদ্দেশে নির্দেশ দিচ্ছেন। সেই নির্দেশের অর্থ বুঝি না, কিন্তু এ কথা বুঝতে আমাদের কষ্ট হয় না যে তাঁর সলক্ষ্য সস্নেহ দৃষ্টি আমাদের ওপরও রয়েছে। কিছু সময় আমরা সেই চত্বর ঘুরে দেখি, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আমরা ছাত্র, কিন্তু কাছ থেকে এই স্মরণিক স্তম্ভ কখনো খুঁটিয়ে দেখা হয়নি। গ্রানাইট শিলায় তৈরি, আলো-আঁধারে তা দেখে দৃষ্টি আনত হয়, মনের দৃষ্টিতে দেখি অন্য এক স্মৃতিস্তম্ভ, ঢাকার শহীদ মিনার।
মধ্যরাতের আগেই আমরা এক লাইন করে দাঁড়িয়ে পড়ি, সবার পেছনে সেই রুশ বন্ধু। চারদিকে জমাট বরফ, যদিও স্মৃতিস্তম্ভের আশপাশে প্রতিদিন সযত্নে সব বরফ ছেঁচে ফেলা হয়েছে। কনকনে শীত, হাড়ে কাঁপুনি ধরিয়ে দেয়। এক বন্ধু বললেন, জুতা পায়ে ফুল দিলে শহীদদের স্মৃতির অবমাননা করা হবে। আমরা তার যুক্তি মেনে নিই, জুতা সরিয়ে শুধু পশমি মোজা পায়ে দাঁড়াই। আমি জানি না এমন সাহস কোত্থেকে পেয়েছিলাম, হয়তো তারুণ্যের ঔদ্ধত্য। এক বন্ধু গান ধরলেন ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো’। বাকি সবাই তার সঙ্গে গলা মেলালাম। চারদিকে নিস্তব্ধ আকাশ চিরে সেই গান ভেসে যায়। আকাশ তো একটাই, আমরা হয়তো আশা করেছিলাম ইথারে সেই গান ভেসে যাবে তার উৎসমূলে। আমি হলফ করে বলছি, সেই রাতে আমরা কেউ শীতের দাপট অনুভব করিনি, বরং বুকের ভেতর এক ভিন্ন উষ্ণতার অভিজ্ঞতা পেয়েছি।
একুশের এই শক্তি আমরা বারবার দেখেছি। এই নিউইয়র্কে প্রতিবছর ‘মুক্তধারা’র আমন্ত্রণে সেই মধ্যরাতে গেছি ফুল নিয়ে| এখানে আমরা আর ছাত্র নই, মাঝ বয়সী কর্মজীবী, গৃহস্থ। পরের দিন কাজ, সেসব অগ্রাহ্য করে কেউ তাজা গোলাপ, কেউ টিউলিপ নিয়ে কার্ডবোর্ড দিয়ে বানানো এক প্রতীকী শহীদ মিনারের সামনে ফুল দিয়ে নিজের ভালোবাসা জানিয়ে এসেছি। মনে পড়ছে এক ভীষণ তুষারঝরা হাড় কাঁপানো মধ্যরাতের কথা। ট্যাক্সিচালক এক যুবক স্ত্রী ও শিশুকন্যাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। দূর থেকে শহীদ
মিনারের কার্ডবোর্ডটি দেখিয়ে সেই শিশুকন্যাকে বুকে জড়িয়ে কী আগ্রহে কোথায়, কেন এসেছেন, তার ব্যাখ্যা করছেন। শিশুকন্যাটি
কী বুঝেছিল জানি না, কিন্তু আমি নিশ্চিত, বাবা যে গর্ব ও বিশ্বাসে তাকে একুশের গল্প বলছিলেন, তার ছিটেফোঁটা আনন্দ তাকেও ভরিয়ে তুলেছিল।
এই গর্ববোধ কোত্থেকে আসে? আমি খুব নিশ্চিত নই, অনুমান করি একুশের ভেতর আমরা শুধু বায়ান্নর একটি ঘটনাকে দেখি না, অথবা মাতৃভাষার অধিকার নিয়ে আমাদের বিজয়ের কাহিনি স্মরণ করি না, একুশের প্রতীকময়তার ভেতর দিয়ে বাঙালির অব্যাহত সংগ্রামের রচিত গাথা আমরা দেখি। শহীদ মিনারের সূর্যগোলকে আমরা এক নতুন প্রভাতের আমন্ত্রণ পাই। সেই প্রভাত আসে না, তবু আমরা এই মিনারের কাছে এসে আমাদের স্বপ্নের বিবরণ জানিয়ে যাই। অন্য কেউ না হোক, এই মিনার জানে, আগামীকাল আসবে, যে আগামীকালের আলো আমাদের সব ক্লেদ, সব বর্জ্য ধুয়ে–মুছে নেবে।
তাহলে কী করে ভুলব ভায়ের রক্ত রাঙানো সেই স্বপ্ন প্রভাতের কথা?
হাসান ফেরদৌস: যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি।

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন