বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দলীয় প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করতে শুধু একে-৪৭ ব্যবহার করেই ক্ষান্ত হবেন না বলে যিনি হুমকি দিয়েছেন, তিনি একটি খুনের মামলার আসামি। নাম আবদুল্লাহ আল মামুন। চার মাস জেল খেটে এখন জামিনে আছেন। পদাধিকার বলে এই ‘ডেসপারেডো’ কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। আর যিনি লড়াই করে থানাকে হটানোর মুরোদ ফাটিয়েছেন, তিনি কুষ্টিয়া জেলা যুবলীগের সভাপতি রবিউল ইসলাম।

এঁদের চেয়ে আরও ‘ডেডিকেটেড’ মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আফজাল হোসেন মোল্লা। ইউপি নির্বাচনে নৌকার বিপক্ষে ভোট দিলে কারও বেঁচে থাকার অধিকার নেই, এমন আজরাইলবাদী হুমকি এসেছে তাঁর কাছ থেকে। মাদারীপুর-৩ আসনের সাংসদের পক্ষ থেকে তিনি ঘোষণা দেন, ‘সে রোববার থেকে স্টিমরোলার চালাতে বলবে, আপনারা চালাবেন। আমি থাকব, আমার কাছে দুইডা অস্ত্র লইয়া…নৌকার বিরুদ্ধে ভোট দিলে কারও বাঁচন নাই।’ বিরোধী ভোটারদের নাহয় বাঁচন নাই, কিন্তু তা তো হবে ভোটের দিন। তার আগেই ইউপি নির্বাচন উপলক্ষে মুহুর্মুহুভাবে আওয়ামী লীগের কর্মীরাই পরস্পরকে খুন করছেন। এক নরসিংদীতেই এক সপ্তাহে নিজ দলীয় সদস্যদের সংঘর্ষে প্রাণ গেছে ছয়জনের।

আমাদের প্রশ্ন অন্যখানে। সারা দেশের জেলায় জেলায় আওয়ামী লীগের ছত্রচ্ছায়ায় যেসব নেতার উত্থান ঘটছে তাঁরা কি নেতা নাকি মাস্তান সর্দার? একসময় জেলাভিত্তিক কিছু গডফাদারের নাম শোনা যেত। এখন বন্দুকবাহিনীর মালিক হওয়া এসব গডফাদার বা মাস্তান সর্দারের সংখ্যা ডজন ছাপিয়ে শত’র ঘর পার হয়েছে। আফগানিস্তানে কিংবা আফ্রিকার কোনো কোনো দেশে রাষ্ট্র ভেঙে যাওয়ার সময় অঞ্চলভিত্তিক মাফিয়া লর্ডদের আবির্ভাব হয়েছিল। পশ্চিমা গণমাধ্যমে এদের বলা হতো ‘যুদ্ধবাজ’ নেতা।

কুষ্টিয়ার যুবলীগ সভাপতি নিজেকে জেলার ‘লর্ড’ হিসেবে ঘোষণাও করেছেন। তাঁর জবানিতেই শুনুন, ‘আমি রবিউল, আমি কুষ্টিয়া জেলার মাস্তান, আমাকে কুষ্টিয়া জেলা মাস্তানির সার্টিফিকেট দিয়েছে। খোকসা থেকে দৌলতপুর পর্যন্ত (জেলার দুই প্রান্ত) যত লোক আছে, যত মাস্তান আছে, আমার হাতে চলে।’ চাইলেই তিনি যেকোনো কিছু করতে পারেন হয়তো। তবে আরেকজন তা করে দেখিয়েছেন। গত ৩১ অক্টোবর কক্সবাজারের পৌর মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমানকে হত্যাচেষ্টা মামলার প্রধান আসামি করার বিরুদ্ধে তাঁর কয়েক হাজার অনুসারী শহরের প্রধান সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। শহর চার ঘণ্টার জন্য অচল হয় এবং মেয়রের কর্তৃত্বাধীন পৌরসভা আরও বহুক্ষণ সেবা দেওয়া বন্ধ রাখে। কক্সবাজার বাংলাদেশের সবচেয়ে আন্তর্জাতিকায়িত শহর। একে তো পর্যটন নগরী বলে প্রচুর বিদেশি এখানে আসেন, তারপরও রোহিঙ্গাদের সর্ববৃহৎ শরণার্থীশিবিরের কারণে জাতিসংঘসহ শত শত বিদেশি সংস্থার দপ্তর রয়েছে এখানে। সেই শহরও এক পৌর মেয়রের কাছে জিম্মি হয়ে যেতে পারে!

উদাহরণগুলো থেকে এই উপসংহারে আসা আমার উদ্দেশ্য নয় যে, কোথায় আইনের শাসন, কোথায় নির্বাচন, কোথায় ভোটাধিকার, কোথায় ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন, কোথায় নাগরিকের ন্যূনতম অধিকার? এসব নিয়ে আহাজারি করা আমার উদ্দেশ্য নয়। বাংলাদেশের মানুষ এমন হুমকি, এমন প্রকাশ্য দস্যুতা, এমন করে ভোটাধিকারের বিলুপ্তি দেখে অভ্যস্ত। কে আর কী বলবে? রবিউল তো বলেই দিয়েছেন, ‘প্রশাসন আমাদের। পুলিশ আমাদের। সরকার আমাদের।’ অতএব দেশটাও তাঁদের। তাঁদের বাইরের কারওরই নয়। বাকি জনগণের অবস্থা: পরের জায়গা পরের জমি, ঘর বানায়া আমি রই, আমি তো এই ‘দেশের’ মালিক নই।

আমাদের প্রশ্ন অন্যখানে। সারা দেশের জেলায় জেলায় আওয়ামী লীগের ছত্রচ্ছায়ায় যেসব নেতার উত্থান ঘটছে তাঁরা কি নেতা নাকি মাস্তান সর্দার? একসময় জেলাভিত্তিক কিছু গডফাদারের নাম শোনা যেত। এখন বন্দুকবাহিনীর মালিক হওয়া এসব গডফাদার বা মাস্তান সর্দারের সংখ্যা ডজন ছাপিয়ে শত’র ঘর পার হয়েছে। আফগানিস্তানে কিংবা আফ্রিকার কোনো কোনো দেশে রাষ্ট্র ভেঙে যাওয়ার সময় অঞ্চলভিত্তিক মাফিয়া লর্ডদের আবির্ভাব হয়েছিল। পশ্চিমা গণমাধ্যমে এদের বলা হতো ‘যুদ্ধবাজ’ নেতা। দুর্নীতি ও দুঃশাসন সীমা ছাড়িয়ে গেলে এদের আবির্ভাব হয় বলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের গবেষকেরা বলেন। দুর্বৃত্তায়িত অর্থনীতি ও বন্দুকবাজ নেতারা মিলে জনপদকে তখন দুঃসহ বানিয়ে ফেলে।

একে-৪৭-এর হুমকি আসছে। গত কয়েক বছরের কিছু খবরের শিরোনাম দেখা যাক। ‘দোকানে বিক্রি হচ্ছে উজি পিস্তল’ (প্রথম আলো, ২৮ অক্টোবর ২০২০)। ‘মডেল পিয়াসার হাতে উজি পিস্তলের ছবি ভাইরাল। চেয়ারম্যানের দেহরক্ষীর পিস্তল হাতে ছবি ভাইরাল’ (যুগান্তর, ৫ জুলাই ২০২১), ‘সাধারণ মানুষের হাতে মিলিটারি গ্রেডের অস্ত্র, উদ্বিগ্ন পুলিশ’ (বাংলা ট্রিবিউন, ২৯ অক্টোবর ২০২০), ‘ইসি সচিব চান শটগানধারী দেহরক্ষী, (যদিও পিস্তলধারী রয়েছে তাঁর)’ (প্রথম আলো, ৫ ডিসেম্বর ২০১৮)। এ রকম অজস্র ঘটনা আছে। অস্ত্র অনেকেই রাখেন এখন। কেউ দেখান, কারওটা বেরিয়ে পড়ে, অন্যরা সময়মতো দেখাবেন বলে যত্ন করে রেখে দিয়েছেন।

এসব অস্ত্রের ক্রেতাদের মধ্যে অধিকাংশই ক্ষমতাসীন রাজনীতির লোক। থানা পর্যায়ের নেতা থেকে শুরু করে মাঝারি গোছের নেতারাও আছেন অস্ত্রের মালিকানায়। এমনকি বিচারক, শিক্ষক, আমলারাও আছেন মারণাস্ত্রের মালিকানায়। এসবই দুর্গ মানসিকতার লক্ষণ। কোনো গোষ্ঠী যদি বিশ্বাস করে যে তারা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বা অস্ত্রবাজি ও বলপ্রয়োগ ছাড়া তাদের টিকে থাকার উপায় নেই, তখন তারা নিজেদের আলাদা করে ফেলে। প্রশাসন ও অস্ত্রবাজির দুর্গ গড়ে তোলে নিজেদের চারপাশে।

এই দুর্গ মানসিকতার প্রথম লক্ষণ হলো বেসরকারি অস্ত্রধারী গোষ্ঠী বা বাহিনীর উদয়। শুরুর দিকে এটা চলে ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের মাধ্যমে। পরে আরও বড় আকারে রাজনৈতিক বন্দুকবাজ পোষার প্রচলন ঘটায়। তখনই দেখা যায় যুদ্ধবাজ নেতা বা ওয়ারলর্ডদের আবির্ভাব। আমাদের দেশে অনেক লর্ডের আবির্ভাব হয়েছে সত্য, কিন্তু ওয়ারলর্ড দেখা যায়নি। দুর্গ মানসিকতা ও অস্ত্রে ভক্তি না কমলে সেই পথ আরও চওড়া হতে পারে।

ফারুক ওয়াসিফ লেখক ও সাংবাদিক।
[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন