বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সপ্তাহ না ঘুরতেই চট্টগ্রামে আইনজীবী স্বামীর নির্যাতনে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। ২০ ডিসেম্বর প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, চট্টগ্রামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে স্নাতকপড়ুয়া মাহমুদা খানম ওরফে আঁখি স্বামীর নির্যাতনে নিহত হয়েছেন। দুই বছর আগে এক আইনজীবীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে তাঁর ওপর নির্যাতন করতেন তাঁর স্বামী আনিসুল ইসলাম। নির্যাতনের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে মাহমুদার খাদ্যনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের সমাজের উচ্চশিক্ষিত ও অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণিতে নারীর ওপর সহিংসতা ও নির্দয়তার এ রকম ঘটনা বেড়ে চলেছে। ২০১১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক রুমানা মনজুরের দুই চোখ নষ্ট করে দিয়েছিলেন তাঁর স্বামী হাসান সাইদ। রুমানা তখন কানাডায় উচ্চশিক্ষা নিচ্ছিলেন। কিন্তু তাঁর স্বামী সেটা মেনে নিতে পারেননি। স্ত্রীর বিদেশে উচ্চশিক্ষা আটকাতে চোখ নষ্ট করে দিয়েছিলেন। রুমানার ওপর এ নৃশংসতা দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছিল। পরবর্তীকালে অন্ধত্ব রুমানার ঘুরে দাঁড়ানোর কিংবা নতুন জীবন শুরু করার ক্ষেত্রে বাধা হতে পারেনি। বরং হার না মানা রুমানা যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা সত্যিই অনুসরণীয়।

অর্থনৈতিক সচ্ছলতা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা রক্ষণশীলতা, গোঁড়ামি কিংবা নৃশংসতার মনোবৃত্তি থেকে আমাদের মুক্ত করতে পারছে কি? এমনকি ইফতেখারদের মতো যাঁরা কানাডার মতো গণতান্ত্রিক, সহনশীল ও বহুত্ববাদী সমাজের সংস্পর্শে আসার সুযোগ পাচ্ছেন, তাঁরাও তাঁদের রক্ষণশীল মূল্যবোধ বদলাতে পারছেন না। একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসেও এলমা, আঁখি কিংবা ইভানাদের প্রাণ হারাতে হচ্ছে নারীকে অধীন করে রাখার সেই চিরাচরিত লৈঙ্গিক রাজনীতির শিকার হয়ে।

যদিও রুমানার মতো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ আর সবার ক্ষেত্রে ঘটে না। যেমন ঘটেনি এলমা বা আঁখির ক্ষেত্রে। কিংবা ঢাকার স্কলাস্টিকা বিদ্যালয়ের ক্যারিয়ার গাইডেন্স কাউন্সেলর ইভানা লায়লা চৌধুরীর ক্ষেত্রে। ইভানার ব্যারিস্টার হওয়ার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু বাস্তবে ‘মিসেস ব্যারিস্টার’ হয়েই ব্যারিস্টার স্বামীর ক্রমাগত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে ভেতরে-ভেতরে মরে যেতে যেতে শেষে ছাদ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে থেমে যায় তাঁর জীবন। স্বামী বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িত। একটা কন্যাশিশু আছে। সামাজিক চাপ ও পারিবারিক সম্মান রক্ষায় জোড়াতালি দিয়ে কোনো রকমে সংসার টিকিয়ে রাখার তবু ক্ষীণ আশা। কিন্তু শেষ আশাটুকুও একসময় নিভে যায়। নিজের ভেতরে এই নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি মৃত্যুর কিছুদিন আগে তাঁর এক শিক্ষককে লিখেছিলেন, ‘সম্ভাব্য তালাকের চিন্তায় আমার ভেতরটা চুরমার হয়ে যাচ্ছে। আমার খুব খারাপ লাগছে। আমার মা-বাবা সহ্য করতে পারবেন না। তাঁদের দুজনেরই বয়স হয়েছে। নানা রকম শারীরিক জটিলতা আছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এলমা কিন্তু এই যন্ত্রণাটুকুও কাউকে জানানোর সুযোগ পাননি। তাঁর ফুফাতো বোন রেহানা সুলতানার বরাতে প্রথম আলো জানায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়েছিলেন এলমা। তাঁদের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। বিয়ের পর তাঁকে কানাডায় নেওয়া, ছোট বোনের লেখাপড়ার দায়িত্ব নেওয়াসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ইফতেখার। তাই খুব অল্প দিনের পরিচয়েই তাঁকে বিয়ে করেন এলমা। কিন্তু বিয়ের পর তাঁকে আর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগই করতে দেওয়া হতো না। এমনকি ইফতেখার যে ঢাকায় এসেছেন, সে খবরও জানতেন না তাঁর স্বজনেরা। হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁরা খবর পান। সেখানে গিয়ে তাঁরা জানতে পারেন, এলমাকে যখন আনা হয়েছে, তাঁর আগেই তিনি মারা গেছেন।

১৮ ডিসেম্বর ডেইলি স্টার–এর প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, ‘চলতি বছরের এপ্রিলে বিয়ের পর এলমা ঢাকার বনানীতে শ্বশুরবাড়িতে থাকতে শুরু করেন। তখন থেকেই তাঁকে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকদের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ির ইচ্ছার বিরুদ্ধে তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। এ কারণে তাঁকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। মেয়েটিকে যে পরিমাণ লাঞ্ছনা, নির্যাতন ও বাধা সহ্য করতে হয়েছিল তা অকল্পনীয়। বিয়ের পরের মাসগুলো এলমাকে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হতো। তাঁর সহপাঠী ও বন্ধুদের ভাষ্য, বিয়ের পর মেয়েটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে, শ্বশুরবাড়ি থেকে সঙ্গে একজন পাহারাদার দিয়ে দেওয়া হতো। তাঁর সহপাঠীরা আরও অভিযোগ করেছেন, এলমার ফোন প্রায়ই বন্ধ পাওয়া যেত কিংবা ফোন দিলে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা ধরত। এ জন্য তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যেত না।’

শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের (৩৮ শতাংশ) দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি বাংলাদেশের। জিডিপিতে নারীর অবদান ২০ শতাংশ। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর এই অংশগ্রহণ বাংলাদেশের সমাজের রক্ষণশীলতার ভিত্তিভূমি ভেঙে দিচ্ছে। একই সময়ে আবার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে হত্যাকাণ্ড কিংবা আত্মহত্যায় বাধ্য করা, ধর্ষণসহ নারীর প্রতি সহিংসতা সমাজের সব স্তরে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। নারীর ওপর সহিংসতার প্রতিনিধিত্বকারী ওপরের ঘটনাগুলোর কোনোটিই তাৎক্ষণিক নয়। দিনের পর দিন ধরে চলা সহিংসতা ও নির্যাতনের ফলাফল। এ হত্যা আর আত্মহত্যা প্ররোচনায় স্বামীদের সঙ্গে পরিবারের অনেকেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। তাঁরা জেনেও নীরব থেকেছেন কিংবা নির্যাতনে সহযোগিতা ও প্রশ্রয় দিয়েছেন।

এলমা, আঁখি, ইভানার প্রতি যে অকল্পনীয় নির্দয়তা তা ঘটেছে উচ্চশিক্ষিত পরিবারে। শিক্ষা ও জীবনের সুযোগবঞ্চিত সমাজের নিচের তলায় অনেক কারণেই সহিংসতার শিকার হন নারীরা। কিন্তু শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবারে যখন এ ধরনের নির্দয় ঘটনা নিয়মিত ঘটতে থাকে, তখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে মানসিক পরিবর্তন কতটা ঘটছে, গুরুত্বপূর্ণ সেই প্রশ্ন সামনে চলে আসে। অর্থনৈতিক সচ্ছলতা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা রক্ষণশীলতা, গোঁড়ামি কিংবা নৃশংসতার মনোবৃত্তি থেকে আমাদের মুক্ত করতে পারছে কি? এমনকি ইফতেখারদের মতো যাঁরা কানাডার মতো গণতান্ত্রিক, সহনশীল ও বহুত্ববাদী সমাজের সংস্পর্শে আসার সুযোগ পাচ্ছেন, তাঁরাও তাঁদের রক্ষণশীল মূল্যবোধ বদলাতে পারছেন না। একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসেও এলমা, আঁখি কিংবা ইভানাদের প্রাণ হারাতে হচ্ছে নারীকে অধীন করে রাখার সেই চিরাচরিত লৈঙ্গিক রাজনীতির শিকার হয়ে।

পুরুষতান্ত্রিক এ রাজনীতি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে যখন সমাজে এমন ধারণা পাকাপোক্ত হয়ে উঠছে যে ক্ষমতার (রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক) কেন্দ্রে থাকলে কোনো অপরাধই অপরাধ নয়। দেশব্যাপী আলোড়ন তোলা নারী নিপীড়নের ঘটনার তদন্ত ও বিচার সে প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে আসছে।

মনোজ দে প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন