করোনার ভয়ংকর ভাইরাস বিজ্ঞানী ও সাধারণজনের কোনো ধারণারই তোয়াক্কা করছে না। বোঝা গেছে, এটি প্রচলিত মৌসুমি রোগ নয়, আমাদের পূর্বাভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে না। এই পনেরো মাসে বিশ্বজুড়ে এর প্রকোপ তরঙ্গের মতো ওঠানামা করেছে। তবে প্রথম দুটি ঢেউ সামলানোর পরে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র বিধিনিষেধসহ টিকা প্রদানের গতি বাড়িয়ে সুফল পেয়েছে। মনে হয়, ইউরোপ এবং ধনী দেশগুলো টিকার সাহায্যে করোনার পরবর্তী ঢেউ সামলাতে পারবে। মাথায় অবশ্য রাখতে হবে, এ ভাইরাসের পরিবৃত্তির (মিউটেশন) এবং ব্যত্যয় ধরন (ভেরিয়েন্ট) তৈরির ক্ষমতার কথা। এ বাস্তবতা মোকাবিলার জন্যও বিজ্ঞানীদের গবেষণার দিকে নজর রাখতে হবে। করোনা অতিমারি থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করতে হলে আন্তর্জাতিক সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া অন্য পথ নেই—কারও পক্ষেই একা সফল হয়ে টেকা সম্ভব নয়।
একথা ঠিক, করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রিত রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেকের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। পনেরো মাসের মধ্যে এই প্রথম গ্রামে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যেও রোগটি ছড়ানোর খবর মিলছে। এটি অবশ্যই ভয়ের খবর, তবে বিপদে ভয় নয়, সাবধানতা ও যথার্থ ব্যবস্থা নেওয়াই হলো কাজ। বিশেষজ্ঞ না হলেও পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু কথা বলা যায়। সেভাবে বলতে পারি, এত দিনে এ রোগ সম্পর্কে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে: ১. করোনা মৌসুমি রোগ নয়, ২. অনবরত পরিবৃত্তি ও নতুন নতুন ধরন তৈরির জন্য এ ভাইরাস বিপজ্জনক, ৩. টিকা একে নিয়ন্ত্রণে সক্ষম এবং ৪. বিজ্ঞানীদের পরবর্তী নির্দেশনা পর্যন্ত মাস্কসহ অন্য বিধানগুলো মানতে হবে। এ হলো ব্যক্তি ও সমাজ পর্যায়ে জানা ও মানার বিষয়।
রাষ্ট্রের জন্যও কিছু বার্তা দিয়েছে কোভিড-১৯ অতিমারি। যথা ১. চিকিৎসাব্যবস্থার সামর্থ্য ও দক্ষতা বাড়াতে কাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি, এর মধ্যে পর্যাপ্ত আইসিইউ ও অক্সিজেন সরবরাহ অন্যতম; ২. টিকা, অক্সিজেনসহ জরুরি কিছু চিকিৎসাসামগ্রীর সম্ভাব্য চাহিদা দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে মেটানোর সামর্থ্য অর্জন প্রয়োজন; ৩. আপৎকালে স্বাস্থ্য খাতে নিয়োগের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্রতী দল প্রস্তুত রাখতে হবে; ৪. আপৎকালে দরিদ্র ও আকস্মিক বিপদগ্রস্ত পরিবারে ওষুধসহ খাদ্য সরবরাহ চালু করার মতো ত্রাণসামগ্রীর মজুত ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা লাগবে; ৫. সাধারণভাবে খাদ্য-পুষ্টির ব্যাপারে জনসচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি; ৬. আপৎকালে সরকারি বিধিনিষেধ মানা ও মানানোর জন্য সরকারি বাহিনীর পাশাপাশি সহায়ক স্কাউট-গাইডসহ বিভিন্ন সংস্থার তরুণ-তরুণী ছাত্রছাত্রীদের ব্রিগেড তৈরি রাখা প্রয়োজন; ৭. সমগ্র জনগোষ্ঠীকে দ্রুত টিকার আওতায় আনতে হবে এবং সে জন্য বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকতে হবে।
করোনাকালে সবচেয়ে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির শিকার শিক্ষা খাত। এ সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যে আংশিক বা নিয়ন্ত্রিতভাবে খোলার সিদ্ধান্ত দেয়নি, সরকার তার পেছনে নিশ্চয় নানা বিবেচনা কাজ করেছে, তাদের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন নেই। কিন্তু সবদিক বিবেচনা করলে মনে হয়, রোগের আশু বিপদের কাছে উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের ব্যক্তিত্ব, মানস ও শারীরিক বিকাশে বন্দিজীবনের নেতিবাচক ভূমিকার দীর্ঘমেয়াদি বিপদ যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। জনসংখ্যা বিবেচনায় আমাদের দেশে করোনা সংক্রমণ এবং এতে মৃত্যুর হার মারাত্মক পর্যায়ে এখনো যায়নি, যদিও সীমান্তবর্তী কোনো কোনো জেলায় এখন সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, মৃত্যুও আগের চেয়ে বেশি হচ্ছে। অবশ্য কোনো মৃত্যুও কাম্য নয়, কিন্তু যখন একটি নেতিবাচক পরিস্থিতিতে অনির্দিষ্ট দীর্ঘদিনের জন্য থাকতে হচ্ছে, তখন ক্ষতির তুলনামূলক বিচার করতেই হবে।
সার্বিক বিচারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বিচার বন্ধ রাখা নাকি বিচার-বিবেচনা করে মানচিত্রে সংক্রমণ-ঢেউয়ের নিম্নগামিতার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা ইউনিয়ন/পৌর এলাকায় ওই সময় খোলার ঝুঁকিটুকু নেওয়া ভালো হয় কি না, সে বিচার আমরা করিনি। কিন্তু করা জরুরি, কেননা অনলাইন ও টিভির শিক্ষার সীমাবদ্ধতা, অসম্পূর্ণতা ও ক্রমেই অকার্যকর হয়ে পড়ার বাস্তবতা বিবেচনায় নিতেই হবে। শিক্ষাবিশেষজ্ঞরা বলেন, শিশু ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা থেকে ব্যাপক শিক্ষা নেয়। বন্দিজীবনে তা সম্পূর্ণ বাদ না পড়লেও বহুলাংশে বাদ পড়েছে যে তাতে সন্দেহ নেই। অার বন্দিজীবন দীর্ঘায়িত হলে শিশুদের মন সজীবতা হারায় এবং নানা বিষয়ে তারা যে আগ্রহ হারাতে থাকে, তা-ও নিশ্চয় বাবা-মায়েরা ঠেকেই শিখছেন। আদতে শিশু থেকে তরুণ, এমনকি বয়স্কদেরও এতে মানসিক এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের চরম ক্ষতি হচ্ছে। করোনার মতো এ থেকেও তো সুরক্ষা প্রয়োজন। বাস্তবে অবশ্য আমরা দেখছি, জনগোষ্ঠীর একটি বিপুল অংশ শিশুদের নিয়েই বাইরে যাচ্ছে, কিশোর-তরুণদের মধ্যেও অনেকে ঘরে আটকে থাকছে না, কেউ কেউ বিপজ্জনকভাবে ভিড়ের মধ্যেও যাচ্ছে।
বিগত পনেরো মাসের কথা যদি ভাবি, তাহলে দেখব, এ বছরের দ্বিতীয় ঢেউটির ধাক্কার আগে এক বছরে শিক্ষার্থী পর্যায়ে আক্রান্তের হার ছিল নগণ্য। তবে খোলার ক্ষেত্রে দুটি বাধা বরাবর রয়েছে: ১. কম বয়স্করা নিজে আক্রান্ত না হলেও ভাইরাসের বাহক হতে পারে, যা বাড়ির বয়স্ক সদস্যদের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে; ২. শিক্ষক ও অভিভাবকদের টিকার আওতায় না এনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলায় বিপদ হতে পারে। কিন্তু পরিস্থিতি যখন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা ও বিকাশের ক্ষেত্রে থাবা বাড়িয়েছে, তখন বোধ হয় আরও জটিল বা দোষদর্শী (ক্রিটিক্যাল) ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। এ সংকট জীবন না জীবিকা, বর্তমান না ভবিষ্যৎ—এমন সরল বিন্যাসে নিষ্পত্তিযোগ্য নয়, আরও জটিল, সপুঙ্খ ভাবনার প্রয়োজন।
যে বছরটি চলে গেছে, সেই সময়ে পরিবর্তমান পরিস্থিতিকে কীভাবে কাজে লাগানো যেত, সে কথায় আর যাব না। তবে সুযোগ কাজে লাগানোর সাহস ও প্রস্তুতি চাই। অনেকেই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমতার কথা বলে থাকেন, কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কেবল বহুধাবিভক্ত নয়, এখানে রয়েছে শিক্ষাপ্রাপ্তির মানে ও সরকারি ব্যয়ে চরম বৈষম্য; আর ঢালাওভাবে বলা যায়, এ ক্ষেত্রে গ্রামের স্কুল-কলেজ শহরের গুলোর তুলনায় পিছিয়ে আছে। বরং এ সময়ে গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকলে তাতে স্বাভাবিক সমতা তৈরি হতো। এদিকে কওমি মাদ্রাসা বন্ধ করা হয়েছে অতি সম্প্রতি, তা–ও হেফাজতের তাণ্ডবের প্রতিফল হিসেবে। তার মানে অবশ্য এ নয় যে সব মাদ্রাসা বন্ধ রয়েছে, মফস্বলে ও গ্রামেগঞ্জে বহু মক্তব-মাদ্রাসাই খোলা।
এ পর্যায়ে কেবল বলব, দেশের বিকাশকালীন বয়সের জনগোষ্ঠী যেহেতু অনেক বড়, তাই তাদের পরিচর্যার গুরুত্ব বিবেচনা করে বিষয়টির আরও গভীরে গিয়ে সবদিক খতিয়ে প্রতিকারমূলক কিছু ব্যবস্থার কথা ভাবা জরুরি। মোটামুটি একটা নিরাপদ অবস্থানে পৌঁছতে হলে অন্তত ৭০ শতাংশ বা প্রায় ১২ কোটি মানুষকে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন। সবাই বুঝি, এ কাজ সময়সাপেক্ষ। গণমাধ্যমে দেখেছি, সরকারের পরিকল্পনা হলো মাসে ২৫ লাখ টিকা দেওয়া। তাতে ১২ কোটি মানুষকে টিকা দিতে চার বছর প্রয়োজন।
এদিকে বছর পেরিয়ে গেলে যাঁরা এখন টিকা নিয়েছেন, তাঁদের নতুন করে নেওয়ার প্রয়োজন হবে না? বর্তমান টিকা কত দিন কার্যকর থাকবে, তা তো স্পষ্ট নয়। করোনা সংক্রমণ প্রশমিত হলে স্কুল পর্যায়ে ছাত্রসংখ্যার ভিত্তিতে পুরো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের দুই, তিন, চার ভাগে ভাগ করে প্রতি দলকে সপ্তাহে তিন দিন তিন ঘণ্টার জন্য স্কুলে আনা যায়। বেশি ছাত্র হলে আড়াই ঘণ্টার পর্বে দিনে দুই দল করে সপ্তাহে ছয় কর্মদিবসকে দুই পালায় ভাগ করা যায়। এভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষার্থীদের ঘরের বাইরে আনা এবং সমবয়সীদের সাহচর্যে কাটানোর ব্যবস্থা করা যায়।
পরিবর্তিত বাস্তবতায় ১৩ জুন থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ঘোষণা বাস্তবায়িত হবে না। সরকারের সদিচ্ছা আবারও অনিশ্চয়তায় ঢাকা পড়ল। এই বাস্তবতায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা না খোলা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবেই গণ্য এবং আলোচিত হওয়া উচিত, নয়তো ভবিষ্যতে জাতিকে গুরুতর খেসারত দিতে হবে। বর্তমানে আমরা সংক্রমণ বাড়ার ঝুঁকিতে আছি, তবে আবার বলব, সংক্রমণ প্রশমিত-নিয়ন্ত্রিত হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কীভাবে খোলা যায়, তার পরিকল্পনা এখনই করতে হবে। অঞ্চলভেদে, স্কুলভেদে অর্থাৎ এলাকার সংক্রমণ পরিস্থিতি এবং স্কুলের অবকাঠামো ও ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতের ভিত্তিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে খোলার বিষয়ে সুপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দুর্যোগের মধ্যে জাতির ভবিষ্যৎ বিবেচনায় শিক্ষাঙ্গনে কঠিন দায়িত্ব পালনের জন্য শিক্ষক-অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রস্তুতি নিতে হবে। এ কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মতোই জাতীয় কর্তব্য।
● আবুল মোমেন কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক