বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
ওএমএস সেবা বাড়ানো, রেশন কার্ড দেওয়া বা ফ্যামিলি কার্ডে স্বচ্ছতা—এমন অনেক পরামর্শই সুফল আনতে পারে। তবে সবকিছুর চেয়ে বেশি কার্যকর হয় সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য বিপণনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি মানুষের মানবিক দৃষ্টি

নিউমার্কেট এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর আ স ম ফেরদৌস আলমের নির্দেশে সেদিন ট্রাকটি নির্ধারিত স্থানে পৌঁছানোর পর সিদ্ধান্ত বদলে নেওয়া হয়েছিল অন্য জায়গায়। প্রথম আলোর ২১ মার্চের একটি প্রতিবেদন জানাচ্ছে, কাউন্সিলর বলেছেন, সম্প্রতি নিউমার্কেটের ১ নম্বর গেট, আইয়ুব আলী কলোনিসহ কয়েকটি জায়গায় টিসিবির পণ্য দেওয়া হয়েছে। আরও বেশি প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছানোর কথা বিবেচনা করেই সেদিন বাকুশাহ মার্কেটের আশপাশে ট্রাক রাখার সিদ্ধান্ত হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ সিদ্ধান্ত কেন ঘটনাস্থলে ট্রাক পৌঁছানোর পর নিয়ে থাকেন? উত্তর আসবে, সুষম বণ্টনের চেষ্টা। একই জায়গায় বারবার গেলে একই পরিবার সুযোগ বেশি পাচ্ছে আর কেউ কেউ ট্রাকের খবরই পাচ্ছেন না। আবার স্থানীয় দোকানদারদের সঙ্গে ডিলারদের বোঝাপড়া হয়, এ কারণে চুরি করে টিসিবির পণ্য বিক্রির সুযোগ থাকে। এসব বিবেচনায় ট্রাক দাঁড়ানোর স্থান বদলানো হয় শেষ মুহূর্তে। কিন্তু আসলে ব্যাপারটি এতই সরল?

নীলক্ষেত আবাসিক এলাকার কোয়ার্টারের ভেতর ট্রাক ঢুকিয়ে গেট বন্ধ করে পছন্দের মানুষের কাছে পণ্য বিক্রির অভিযোগ এসেছে এ মাসের শুরুর দিকে। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতার ছাপ দেওয়া ভোটারদের জন্য বারবার আইয়ুব আলী কলোনির ভেতর কেন ট্রাক যায়, তা–ও জিজ্ঞাসা ছিল সেদিনের লাইনে দাঁড়ানো ক্ষুব্ধ নারীদের। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে টিসিবির পণ্যের জন্য ইস্যুকৃত কার্ডের ৪০০ জনের কাউকেই চেয়ারম্যান চেনেন না বলে প্রতিবেদন হয়েছে। এ অভিযোগগুলোর সঙ্গে শেষ মুহূর্তে স্থান পরিবর্তনের সম্পর্ক আছে কি না, প্রশ্ন আসতেই পারে।

সুষম বণ্টনের কথা বলে আকস্মিক জায়গা বদলালে বাসেদ মিয়ার মতো মানুষদের চৈত্রের এই দুপুরে সামান্য টাকা সাশ্রয়ের জন্য একই এলাকায় সাত থেকে আট কিলোমিটার ঘুরপাক খেতে হয়। সময়মতো ট্রাকটি না পৌঁছালে অপেক্ষারত মানুষের জীবনে সকাল থেকে বিকেল হয়ে যায়। ২৮ মার্চ রাজধানীর রামপুরায় টিসিবির পণ্য পৌঁছেছিল বেলা সাড়ে তিনটায়। হাড়হাবাতে হয়ে যাওয়া সেসব মানুষের সময় ও পরিশ্রমের মূল্যের কোনো পরিমাপক নেই আমাদের কাছে।

এবার যোগ হয়েছে ছোলা আর খেজুর কিনতে বাধ্য করার রেওয়াজ। সে মূল্যও কমবেশি ওঠানামা করছে। ৭২০ টাকা নিয়ে একটি প্যাকেজ কিনতে এসে ক্রেতা শুনছেন আজকের প্যাকেজের মূল্য ৭৯০ টাকা। বাড়ি ফেরার রিকশাভাড়া যোগ করেও মিলতে চায় না হিসাব। আদতে গোটা জীবনের হিসাবই মেলে না এসব মানুষের। আর তো টিসিবির প্যাকেজের পণ্যের দাম! টিসিবির মুখপাত্র হুমায়ূন কবির বলেছেন, কোনো পরিবেশক বা প্রতিনিধি যদি জোর করে ক্রেতাদের কাছে বেশি পরিমাণে ছোলা ও খেজুর প্যাকেজ করে বিক্রি করেন, সেটা অন্যায়। এমন বক্তব্য শুনে আমাদের ভালো লেগেছে। তবে পরমুহূর্তেই চলতি পথে দেখা দৃশ্য, পথের মধ্যে
ছেঁড়া পার্সটা উল্টে শেষ পাঁচ টাকার কয়েনটিও যোগ করছেন নারী।

কয়েক ঘণ্টা পর পণ্য হাতে পান মানুষ। ততক্ষণে মূল্য সাশ্রয়ের স্বস্তি জীবনের প্রতি ব্যক্তিগত অভিসম্পাতের কাছে পরাজিত। প্রায় ১৪ কেজির পণ্য নিয়ে দুপুর রোদে হাঁটতে হাঁটতে শ্রান্ত হয়ে পথের মধ্যেই বসে পড়ছেন নারীরা। সঙ্গে থাকা বিদ্যালয়ফেরত স্কুলপোশাক গায়ে শিশুসন্তানটি অনুভব করে, অঙ্ক বইয়ে ছাপা কোনো সংখ্যা দিয়েই সম্ভব নয় এ জটিল অঙ্কের সমাধান। ক্লান্ত মায়ের হাত ধরে বাড়ি ফিরে যাওয়া সেই শিশুর কাছে ভবিষ্যতের জন্য কেমন প্রত্যাশা করা যায়? ২৭ মার্চ রাজধানীর মহাখালী ওয়্যারলেস গেট এলাকায় প্রথম শ্রেণির ছাত্রী তাহিরা ইসলাম পথের পাশেই পড়তে বসেছিল। এ ছবি মানসিক শান্তি নষ্ট করতে যথেষ্ট। তাহিরার মা আড়াই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিলেন টিসিবি পণ্যের জন্য। শিশুটি কখনো খেলছে, কখনো বই খুলে পড়েছে। খবরটি আমরা দেখেছি। কিন্তু মুক্তা আক্তার আর তাঁর মেয়ে তাহিরার বাড়ি ফেরার সময়ের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে জানা সম্ভব হয় না আমাদের।

মানুষের এ অপেক্ষার মূল্য নির্ধারণের, তাঁর মানসিক অভিঘাত মাপার কোনো যন্ত্র নেই। এ দৃশ্য এখন রাজধানী এবং পুরো দেশের। যদি এক মাসে টিসিবির পণ্যের জন্য অপেক্ষারত সব মানুষের সময়ের যোগ দেওয়া যায়, তবে কত লাখ ঘণ্টার অপেক্ষার হিসাব হবে, তা ধারণার বাইরে। ৮ হাজার ৭৬০ ঘণ্টায় এক বছর হলে এসব মানুষের অপেক্ষার মোট সময় হয়তো হবে কয়েক বছর।

ওএমএস সেবা বাড়ানো, রেশন কার্ড দেওয়া বা ফ্যামিলি কার্ডে স্বচ্ছতা—এমন অনেক পরামর্শই সুফল আনতে পারে। তবে সবকিছুর চেয়ে বেশি কার্যকর হয় সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য বিপণনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি মানুষের মানবিক দৃষ্টি। সেটি পরামর্শ দিয়ে কতটা সম্ভব সন্দেহ আছে। জবাবদিহির আওতায় আনা গেলে ভালো। তবে বাসেদ মিয়ার জায়গায় যদি দায়িত্বরত ব্যক্তিরা নিজেকে দাঁড় করিয়ে দেখতে পারেন, যদি ভাবতে পারেন মহাখালীর টিসিবির লাইনের পাশে বই নিয়ে বসে থাকা তাহিরার জায়গায় নিজের সন্তানকে, তাহলে হয়তো দুমুঠো অন্নের জন্য মানুষের এতটা পথ হাঁটার যন্ত্রণা কিছুটা কমে।

সাদিয়া মাহ্‌জাবীন ইমাম জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, প্রথম আলো

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন