বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ভোট জালিয়াতি নিরীক্ষণ করার সব উপাদান বর্তমানে ব্যবহৃত ‘ডিজিটাল’ ভোটার লিস্টে রয়েছে। সেটি কাজে লাগানো যেত, যদি নির্বাচন কমিশন জালিয়াতির অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখার ইচ্ছা রাখত। যেসব ভোটকেন্দ্র বা বুথে জালিয়াতি ঘটেছে, সেটি প্রমাণ করতে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সেখানকার ভোটারদের ডিজিটাল স্বাক্ষর দৈবচয়নের মাধ্যমে এবং ব্যবহৃত ব্যালট পেপারগুলোর নিরীক্ষণই প্রমাণ দিতে যথেষ্ট। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রদত্ত ভোটের পরিসংখ্যানের সত্যতা যাচাই হয়ে যায় তখন। এ পদ্ধতি অবলম্বন করতে আইনে সামান্য সংযোজন করে কমিশনের ক্ষমতায়ন করা যেত। বর্তমান কমিশন সেদিকে যায়নি। বরং তারা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ২০০৭-২০১১-এ প্রার্থীদের যোগ্যতা-অযোগ্যতা নিয়ে সংযোজিত ধারাগুলো শিথিল অথবা বাতিল করে নির্বাচনে পরিচ্ছন্নতা আনার যে সব প্রয়াস নেওয়া হয়েছিল, সেগুলো থেকে সরে আসার ‘বৈপ্লবিক’ উদ্যোগ নিয়েছে বলে আমরা জানতে পারছি। যার প্রমাণ, আরপিও ধারা ১২(১)(এম) তে যেখানে ব্যাংকঋণ পরিশোধ করার কথা ছিল মনোনয়নপত্র দাখিল করার সাত দিন আগে। সে শর্ত গত নির্বাচনের আগে পরিবর্তন করে এক দিন আগে করা হয়েছে। এ উপধারা যে উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল, তা পরিবর্তন করে এত সহজতর করার কী কারণ থাকতে পারে, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশের পরপর দুটি কমিশন নির্বাচনী ব্যবস্থাপনাকে যেভাবে দুর্বল করে গেছে এবং যাচ্ছে, তার প্রতিফলন দেখা গেল হালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কমিশনের কোনো কর্তৃত্ব এবং দায়িত্ব ছিল কি না, সে বিতর্ক পুরোনো হয়ে গেছে। এর আগে স্থানীয় নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে যে ব্যর্থতার পরিচয় কমিশন দিয়েছে, তাতে শুধু জনসাধারণই নয়, খোদ কমিশনের ভেতর থেকেও নানা ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

একইভাবে এবার নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক মাস আগে আরপিওকে ২০০৭-২০০৮-এর পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা চলছে বলেও আমরা জানতে পারছি। এর মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে বিদায়ী কমিশন। পরিবর্তন আনছে ধারা ১২(১)(এন) উপধারাতেও। ওই উপধারাতে যুক্ত ছিল সরকারি সার্ভিস বিল (পানি, বিদ্যুৎ এবং টেলিফোন বিল) বকেয়া থাকলে মনোনয়নপত্র দাখিল করার সাত দিন আগে সেটি পরিশোধ করতে হবে। অন্যথায় প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা করা হবে এমনকি ফাঁকফোকর গলে তিনি যদি নির্বাচিতও হয়ে যান। সেখানে মনোনয়নপত্র দাখিল করার এক দিন আগে সরকারি সার্ভিস বকেয়া বিল পরিশোধ করতে হবে—এমন পরিবর্তন সুপারিশ করা হয়েছে।

নির্বাচন সুষ্ঠু করতে ২০০৭-২০০৮ সালে শরিকদের সঙ্গে তিন দফা আলোচনার মাধ্যমে গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তা শুধু দেশেই নয়; বিদেশেও প্রশংসিত হয়েছিল এবং প্রায় ১০ বছর সেগুলো কার্যকর ছিল। এসবই আইনে রূপান্তরিত হয় ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ও সরকারি দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে। এখন ন্যায্যতই প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচন কমিশন কার স্বার্থে অথবা কোন যুক্তিতে সেটিতে এখন পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। এখন এমন কী হলো বা কার স্বার্থ রক্ষায় নির্বাচন কমিশন এমন পরীক্ষিত ও প্রশংসিত পরিবর্তনগুলোকে অকার্যকর করার সুপারিশ করছে। এগুলোর মাধ্যমে শাসক দল সুষ্ঠু নির্বাচন ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থীর কথা বলে আসছে। তার বিপরীতে শরিকদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই এখন এসব অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়ে আরপিও দুর্বল করছে। একই সঙ্গে যেখানে বর্তমান অবস্থায় কমিশনের হাত শক্ত করা দরকার, সেখানে তারা নিজেদের যেভাবে দুর্বল করে যাচ্ছে, তাতে আগামী কমিশন নিয়োগের পর থেকেই হোঁচট খাবে বলে মনে হয়।

বাংলাদেশের পরপর দুটি কমিশন নির্বাচনী ব্যবস্থাপনাকে যেভাবে দুর্বল করে গেছে এবং যাচ্ছে, তার প্রতিফলন দেখা গেল হালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কমিশনের কোনো কর্তৃত্ব এবং দায়িত্ব ছিল কি না, সে বিতর্ক পুরোনো হয়ে গেছে। এর আগে স্থানীয় নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে যে ব্যর্থতার পরিচয় কমিশন দিয়েছে, তাতে শুধু জনসাধারণই নয়, খোদ কমিশনের ভেতর থেকেও নানা ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। এরই ধারাবাহিকতায় নির্বাচন যে নির্বাসনে চলে গেছে, তা হালের ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকটি ঘটনায় প্রতিফলিত হয়েছে। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি ঘটনায় মনে হয় যে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন সত্তা এখন বিপর্যয়ের মুখে, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কয়েকটি নির্বাচনী এলাকা থেকে যে তথ্য এবং ভিডিও চিত্র পাওয়া গেছে, তাতে প্রমাণিত যে নির্বাচন কমিশনের অনেক মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা নিজেরাই কমিশনের এখতিয়ার হতে বাইরে জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা প্রভাবিত অথবা তাদের আদেশে কাজ করছেন। এর মাধ্যমে নির্বাচনের বদলে সংসদ সদস্য কর্তৃক মনোনীত ব্যক্তিকে এককভাবে নির্বাচিত করার উদ্যোগে সায় দিয়েছেন তিনি। এখন ইলেকশন নয়, সিলেকশন করতে হচ্ছে কথিত রিটার্নিং কর্মকর্তাদের। এমন একটি ঘটনার কথা শোনা যায় নেত্রকোনার কোনো এক ইউনিয়ন থেকে। হয়তো এসব নির্বাচনের এমনই প্যাটার্ন তৈরি হচ্ছে, ইতিমধ্যে হয়েও গেছে।

এসব তথ্যসহ আরও কৌশলের কথা প্রকাশিত হচ্ছে অহরহ। এখানে মুখ্য ভূমিকায় নির্বাচন কমিশন নয়, স্থানীয় সাংসদ এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীরাই নির্বাচনের নিয়ন্ত্রক। এ অবস্থার কারণ নির্বাচন কমিশনের নিষ্ক্রিয়তা। এ ধারার মধ্যে আগামী নির্বাচন কমিশনের দুর্গম পথে হাঁটতে হবে। কারণ, ক্রমেই নির্বাচনের অর্থ বদলাচ্ছে। এর সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব কমিশনের, এটা তাদেরই ব্যর্থতা।

l ড. এম সাখাওয়াত হোসেন নির্বাচন বিশ্লেষক, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং এসআইপিজির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো (এনএসইউ)

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন