default-image

করোনা নিয়ে আমাদের অনেকেই পাস্ট টেন্সে (অতীত কাল) কথা বলা শুরু করেছিলেন। করোনার ‘সময়ে’ আমরা অমুক করেছি, তমুক করেছি ধরনের কথাবার্তা। যেন করোনা অতীত হয়ে গেছে। আসলে আমরা অনেকেই ধরে নিয়েছিলাম যে করোনা চলে গেছে। টিকা দেওয়া শুরু হওয়ার পর করোনা নিয়ে আমাদের যেটুকু ভয়ডর ছিল, তা-ও কেটে গিয়েছিল। একটি টিকা নিয়ে আমরা অনেকে ভেবেছি, আর সমস্যা নেই। এসবের ফলই সম্ভবত আমরা এখন পেতে শুরু করেছি। সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

গত ডিসেম্বরে যুক্তরাজ্যে করোনাভাইরাসের একটি নতুন ধরনের সন্ধান মিলেছিল। আর জানুয়ারি মাসেই বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের সেই ‘যুক্তরাজ্য ধরনের’ সন্ধান পাওয়া যায়। অবশ্য সরকার সেটা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে মার্চ মাসের ১০ তারিখে। যুক্তরাজ্য ধরনটির সংক্রমণ ক্ষমতা অনেক বেশি। সে কারণেই দেশে সংক্রমণ বেড়েছে—এমন কোনো গবেষণালব্ধ তথ্যপ্রমাণ এখনো হাজির নেই। তবে কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে যুক্তরাজ্য ধরনের ভাইরাসের সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে সবাই বলেছেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলায় আমরা যে অবহেলা দেখাতে শুরু করেছি, সংক্রমণ বাড়ার সেটাই সবচেয়ে বড় কারণ। এখন প্রতিদিন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। আইসিইউতে আবার সিটের সংকট দেখা দিয়েছে। তবে সংক্রমণ বাড়ার হার অব্যাহত থাকলে বিপদ শুধু এখানেই আটকে থাকবে না, আরও বড় এবং ভিন্ন বিপদের ভয়ও আছে। অন্তত বিশেষজ্ঞরা তা-ই মনে করছেন।

মিউটেশনের মাধ্যমে ভাইরাস তার চরিত্র বদলায়। ফলে ভাইরাসের নতুন নতুন ধরনের উদ্ভব ঘটে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এরই মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের করোনাভাইরাসের সন্ধান মিলেছে। যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিল ‘ধরন’ হিসেবে কিছু করোনাভাইরাসের কথা আমরা জেনেছি। যেগুলো এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রেও নতুন ধরন পাওয়ার কথা শোনা গেছে। ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে (কোভিড ১৯ ভাইরাস ইন বাংলাদেশ: রিসার্চাস ফাইন্ড ৩৪ ইউনিক মিউটেশনস) বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গত বছরের (২০২০) এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে করোনাভাইরাস ৪৬০৪ দফা মিউটেটেড বা পরিবর্তিত হয়েছে। পরিবর্তিত এই ভাইরাসের মধ্যে ৩৪টির মধ্যে এমন জিনগত ভিন্নতা রয়েছে যেগুলোর সঙ্গে বিশ্বের আর কোনো পরিবর্তিত ধরনগুলোর মিল নেই। মালয়েশিয়ার মনাস বিশ্ববিদ্যালয়র সঙ্গে যৌথভাবে বাংলাদেশের কয়েকজন গবেষকের গবেষণা থেকে এই তথ্য মিলেছে। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের ৩৭১টি জেনম সিকোয়েন্সিংয়ের ফলাফল বিশ্লেষণ করে তাঁরা এই ফলাফল পেয়েছেন। এই ৩৪টি নতুন জিনগত ধরন একান্তভাবেই তাঁদের ভাষায় ‘বাংলা মিউটেশনের’ ফল।

বিজ্ঞাপন
আমাদের দেশে এখন যে টিকা দেওয়া হচ্ছে তা দক্ষিণ আফ্রিকা বা নতুন কোনো ধরনের ক্ষেত্রে একইভাবে কার্যকর না-ও হতে পারে। টিকা নিয়ে তাই শতভাগ স্বস্তির কোনো সুযোগ নেই। আর প্রথম দফা টিকা নিয়ে তো একেবারেই নয়।

আমরা দেখছি একদিকে সংক্রমণ বাড়ছে, অন্যদিকে আক্রান্তদের জটিলতাও বাড়ছে। হাসপাতালের আইসিইউগুলোতে আসনের সংকট এর সাক্ষ্য দিচ্ছে। এই পরিস্থিতির জন্য করোনাভাইরাসের এই ৩৪টি নতুন জিনগত ধরন, যুক্তরাজ্যের ধরন অথবা অন্য কোনো নতুন ধরন—যেকোনো কিছুই দায়ী হতে পারে। ব্রাজিল বা দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনগুলোকে বেশি ভয়ংকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনটি ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশে পাওয়া গেছে বলে কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। তবে সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার করেনি। আমাদের দেশে এখন যে টিকা দেওয়া হচ্ছে তা দক্ষিণ আফ্রিকা বা নতুন কোনো ধরনের ক্ষেত্রে একইভাবে কার্যকর না-ও হতে পারে। টিকা নিয়ে তাই শতভাগ স্বস্তির কোনো সুযোগ নেই। আর প্রথম দফা টিকা নিয়ে তো একেবারেই নয়। প্রথম দফা টিকা নেওয়ার ১ মাস পরও করোনা সংক্রমিত হওয়ার বেশ কিছু দৃষ্টান্ত রয়েছে বলে একজন বিশেষজ্ঞ নিশ্চিত করেছেন। করোনার বিপদ যে আমাদের সামনে আগের মতোই হাজির আছে তা বোঝা যাচ্ছে।

করোনা পরিস্থিতির কারণে ‘স্বাস্থ্যবিধি’ হিসেবে আমরা যেসব নিয়মকানুন মানতে শুরু করেছিলাম, সেখানে যে ঢিলেমি দেখা দিল তার কারণ কি শুধু টিকা? সম্ভবত তা নয়। যে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমাদের বছরখানেক সময় পার করতে হয়েছে, তা আমাদের মধ্যে একধরনের ফ্যাটিগ তৈরি করেছে। আমরা এমন একটি পরিস্থিতি থেকে নিজেদের মুক্ত করার পথ খুঁজছিলাম। টিকা দেওয়া শুরু হওয়ার পর আমরা অনেকেই সেই সুযোগটি নিয়েছি; আমরা মাস্ক পরা কমিয়ে দিয়েছি, হাত ধোয়ার ব্যাপারে অসচেতন হয়েছি, আড্ডা মেলামেশা বাড়িয়ে দিয়েছি, দূরত্ব বাজায় রাখার বিষয়টি উপেক্ষা করতে শুরু করেছি। আর তখনই আমরা দেখলাম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে।

এই সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় বিপদটি হচ্ছে সংক্রমণ যত বাড়বে ভাইরাস তত মিউটেটেড বা পরিবর্তিত হওয়ার সুযোগ পাবে। এবং এই প্রক্রিয়ায় কোনো একটি শক্তিশালী ধরন তৈরি হতে পারে। যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল বা দক্ষিণ আফ্রিকা ধরনের মতো যদি কোনো ‘বাংলাদেশ ধরন’ তৈরি হয়, তখন আমরা কী করব? যুক্তরাজ্যে করোনাভাইরাসের নতুন ধরন পাওয়া যাওয়ার পর ইউরোপজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল এবং যুক্তরাজ্য ইউরোপ থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ভারতসহ বিশ্বের ৪০টি দেশ যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বিমান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিল। এমন একটি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার শক্তি-সামর্থ্য কি আমাদের আছে? এই নতুন ধরনের ক্ষেত্রে যদি বর্তমান টিকা কাজ না করে, তবে নতুন টিকার প্রয়োজন পড়বে। এখন যাঁরা টিকা নিচ্ছেন সেটা তখন কোনো নিরাপত্তা দেবে না।

আমরা সত্যিই এক বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছি। এই ঝুঁকি ঠেকানোর পথ সংক্রমণ ঠেকানো। একজন ব্যক্তি হিসেবে আপনার-আমার মূল কাজটি হচ্ছে আমরা নিজেরা যাতে সংক্রমিত না হই, সেই চেষ্টা খুবই জোরের সঙ্গে চালিয়ে যাওয়া। আমাদের মধ্যে যতই করোনা পরিস্থিতির কারণে নিয়মনীতি মেনে চলা নিয়ে ফ্যাটিগ আসুক আরও অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য আমাদের স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মেনে চলতে হবে।

বিজ্ঞাপন
টিকা কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর আমাদের দেশের জনগণের মধ্যে যেমন আইন মানতে ঢিলেমি দেখা যাচ্ছে, তেমনি সরকারও যেন বিষয়টি ছেড়ে দিয়েছে। সংক্রমণ ঠেকাতে অফিস-আদালতে, বাজার বা শপিং মলে, রাস্তায় কিংবা যানবাহনে যে স্বাস্থ্যবিধি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল তা এখন আর কার্যকর নেই।

বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এই পরিস্থিতি কয়েক বছর চলতে পারে। কারণ, বৈশ্বিক মহামারিতে কোনো দেশের শুধু নিজেকে নিরাপদ রাখার সুযোগ নেই। কোনো দেশ তার সব নাগরিকদের টিকা দিয়েও পুরোপুরি বিপদমুক্ত থাকতে পারবে না, যদি বিশ্বের কোনো অংশে সংক্রমণ চলতে থাকে এবং ভাইরাস পরিবর্তিত হয়ে শক্তিশালী হতে থাকে। টিকা যখন বিশ্বের সব অংশে দেওয়া শুরু হবে, সংক্রমণ যখন সবখানেই কমতে থাকবে, তখনই ঝুঁকি কমতে থাকবে। এর আগপর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রস্তুতি আমাদের থাকতে হবে।

একটি দেশের নাগরিকদের মধ্যে সবাই স্বেচ্ছায় স্বাস্থ্যবিধি মনে চলবেন, এমন আশা করা যায় না। এমনকি আইন মেনে চলতে অভ্যস্ত সভ্য দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রেও তা হয় না। জনগণকে আইন মানাতে হয়। টিকা কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর আমাদের দেশের জনগণের মধ্যে যেমন আইন মানতে ঢিলেমি দেখা যাচ্ছে, তেমনি সরকারও যেন বিষয়টি ছেড়ে দিয়েছে। সংক্রমণ ঠেকাতে অফিস-আদালতে, বাজার বা শপিং মলে, রাস্তায় কিংবা যানবাহনে যে স্বাস্থ্যবিধি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল তা এখন আর কার্যকর নেই। টিকা দেওয়ার পাশাপাশি সংক্রমণও যে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, সেই বাস্তবতাকে সরকার কতটা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে, সেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

যুক্তরাজ্য ধরনের খবর জানার পর ভারতসহ অনেক দেশ যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ফ্লাইট বন্ধ করলেও বাংলাদেশ তা করেনি। ফ্লাইট চালু রেখে যুক্তরাজ্য থেকে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টিনে রাখার কথা বলা হয়েছিল। এই কোয়ারেন্টিন নিয়ে চলছে চরম বিশৃঙ্খলা। হোটেল থেকে পালিয়ে যাওয়া বা কোয়ারেন্টিনে থেকে হোটেলে বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজনের খবরও সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের যুক্তরাজ্য ধরনের সন্ধান মিলেছে জানুয়ারি মাসে আর সরকার তা প্রকাশ করেছে মার্চ মাসে। সরকারের এই আচরণের যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা কী? মানুষকে সতর্ক ও সচেতন করার জন্য হলেও তো এসব তথ্য প্রকাশ করা উচিত। বাংলাদেশে দক্ষিণ আফ্রিকার ধরন পাওয়ার কথা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা হয়নি।

বিশ্বের অনেক দেশ নতুন করে লকডাউনে যাচ্ছে। বাংলাদেশের পক্ষে হয়তো অর্থনৈতিক বিবেচনায় এমন কিছু করা কঠিন। কিন্তু করোনার ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে না পারলে আমাদের সামনে যে বড় বিপদ আসতে পারে, তাকে অস্বীকার করার সুযোগ আছে কি? প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি কার্যকর করা, জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বাধ্য করা, বা বিদেশফেরতদের কোয়ারেন্টিন কঠোরভাবে নিশ্চিত করার মতো মৌলিক দিকগুলো কেন উপেক্ষিত থাকবে?

এ কে এম জাকারিয়া প্রথম আলোর উপসম্পাদক

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন